”দুর্ভাবনা হচ্ছিল তোর জন্য, ছিলিস কোথায়? তোর কলেজে গিয়েছিলাম, কাউকে তো চিনি না..রাতে ছিলিস কোথায়?”
”এক বন্ধুর আত্মীয়ের বাড়িতে। তুমি?”
”আমিও এক বন্ধুর বাড়িতে।”
কণা তার বাবার মুখ থেকে চোখ সরিয়ে নিল। জ্ঞানত সে বাবাকে মিথ্যা কথা বলতে শোনেনি, মাকেও নয়। বাবার জন্য কষ্ট বোধ করল।
”কোনো অসুবিধা হয়নি?”
”না, খুব যত্ন করেছে।”
”অবশ্য আমি ধরে নিয়েছিলাম, বন্ধুদের কারুর না কারুর বাড়িতে থাকার ব্যবস্থা তোর হবে। তবু, যা হাঙ্গামা হচ্ছিল ওটাতেই ভয় ধরে গেছল। রাস্তাটাস্তায় ঝামেলায় পড়িসনি তো?”
বাবার চোখে অকৃত্রিম উদ্বেগ আর স্বস্তি একই সঙ্গে। এই লোকটিকেই সে চেনে। জন্ম থেকে পরিচিত…কাল রাত পর্যন্তও তাই ছিল।
”আমি তো রায় অ্যান্ড ঘোষে প্রথমে গেছলাম। ওখানে ট্রাম-বাস পুড়তে দেখেছি। শেয়ালদায়, ইউনিভার্সিটির সামনে।”
”হ্যাঁ এই তো কাগজে পড়ছিলাম, তুই পড়বি?”
”এখন নয়। …তবে আমি ওসব এড়িয়ে অন্য রাস্তা দিয়ে স্টেশনে।”
ট্রেনটা ছাড়ল। তুষার ঘড়ি দেখল।
”তোর মা খুব চিন্তা করছে, আমরা দুজনেই বাড়ি ফিরিনি।”
”কেন ফিরিনি সেটা তো জেনে গেছেই, আর কোথাও না কোথাও যে রাতটায় থাকব তাও ধরে নিয়েছে। কাল কতলোক যে হেঁটে ফিরল…তুমি দেখেছ?”
”না। আমি অফিসেই তো খবর পেয়ে গেছলাম ট্রেন বন্ধ হয়ে গেছে। আর হেঁটে এতটা পথ যাওয়ার কোনো অর্থ হয় না, যদি না একান্তই খুব জরুরি ব্যাপার থাকে। যাদের কলকাতায় থাকার জায়গা নেই তারাই হন্টন দিয়েছে।”
কলকাতায় থাকার একটা জায়গা আছে বলেই বাবা বাড়ি ফেরার দরকার বোধ করেনি। হিন্দমোটর যদি হাঁটার দূরত্বের মধ্যে হত তাহলেও কি ফেরার চেষ্টা করত? বোধহয় না।
”আজ সব কিছুই বন্ধ থাকবে। কলকাতায় চারটে থানায় কার্ফু জারি হয়েছে। কংগ্রেস মিছিল বার করবে। বারো দিন রাষ্ট্রীয় শোক।”
এখন এসব কথা শুনে তার কি লাভ? আর এসব বলেই বা সময় কাটাবার কী দরকার। কলকাতায় কি হচ্ছে বা হবে সেটা দেবাই পুকুরে একটা ঢিল ফেলার বেশি কিছু নয়।
কণা পিছনের দেয়ালে মাথা ঠেকিয়ে চোখ বন্ধ করল। ছবির মতো ভেসে উঠছে চোখের সামনে…লোল চর্মের হাত ঘিরে রয়েছে একটি শুকনো ঘাড়…স্কুল বাসে একটি বালকের চোখ, উৎকট বীভৎস চীৎকার..হিমুর মুখ।
”ঘুম পাচ্ছে তোর?”
”হ্যাঁ, ঘুম হয়নি।”
”আমারও। এত আচমকা, এত শকিং…শুনে বিশ্বাসই হচ্ছিল না। এমনভাবে ব্রুটালি সরিয়ে দিল!…আর আঠারো দিন পর সাতষট্টিতে পড়তেন…বুড়িই, ষোলোটা বুলেট শরীর থেকে বার করা হয়েছে।”
কণাকে চোখ বুজে থাকতে দেখে তুষার কাগজ পড়ায় মন দিল।
স্টেশন থেকে বাড়ি পর্যন্ত হেঁটে আট মিনিট। দোকানগুলো বন্ধ। রাস্তার ধারে সাদা কাগজে ঢাকা ইঁটের বেদীতে ইন্দিরার ছবি, তাতে বেলফুলের মালা, পিছনে একটা বাঁশের মাঝামাঝি জাতীয় পতাকা বাঁধা রয়েছে। একগুচ্ছ ধূপ জ্বলছে। আরো দুটি বেদীতে ইন্দিরার ছবি, মালা, ধূপ। বোঝাই যায় ব্যস্ততার মধ্যে করা। কয়েকটা বাড়ির জানলা থেকে তিনরঙা পতাকা বাঁশ বা কাঠ দিয়ে ঝোলানো হয়েছে। রাস্তায় অনেকে কাগজ পড়ছে, তাদের ঘিরে ছোট ছোট ভিড়।
”ডিম কিনে রাখা আছে, না?”
”আছে বোধহয়, পরশু তো ডিমওলা এসেছিল।”
দূর থেকেই ওরা দেখতে পেল বারান্দায় গ্রিলের পিছনে চেয়ারে বসা শুভাননাকে। রাস্তার দিকে মুখ। ওদের দেখতে পেয়ে উঠে ভিতরে চলে গেল।
”বোধহয় সারারাত মা বসে ছিল।’
তুষার উত্তর দিল না তবে কুঁকড়ে রইল। দরজা খুলে শুভাননা দাঁড়িয়ে, মুখে দুশ্চিন্তা সরে যাওয়ার রেশ লাগানো। তুষার ব্যস্ত হতে চেয়ে দ্রুত বলল, ”ট্রেন বন্ধের খবর পেয়েছ কখন?…যা হাঙ্গামা কলকাতায়, এক বন্ধুর বাড়িতে ছিলাম…এই নাও পড়ে দেখ…রাতে ঘুমোওনি তো…কণা চা করে দিচ্ছে, তুমি এবার ঘুমিয়ে নাও।
”আমি ছিলাম ক্লাশের বন্ধুর আত্মীয়ের বাড়িতে।”
শুভাননা কথা বলল না। মন্থর হেঁটে রান্নাঘরে গিয়ে ঢুকল। দুজনে ফিরে এসেছে এটাই তার কাছে যথেষ্ট। কোথায় ছিল তা নিয়ে কোনো মাথাব্যথা নেই। কণা সিঁড়ি দিয়ে উপরে উঠে গেল। ছাদের ঘরটি তার। চার বছর আগে সে এখনকার বসার, ছাত্রছাত্রী পড়াবার এবং লেখালেখির ঘরটি ছেড়ে দিয়ে উপরে গেছে। ঘরটি এখন শুভাননার দরকারেই লাগে।
ছাদের ঘর বহু বছর, অসম্পূর্ণ ছিল চারটি দেয়াল আর দরজা জানালার জন্য ফাঁকটুকু নিয়ে। ঘরের জন্য তারা দরকার বোধ করেনি। অবশেষে শুভাননাই একদিন বলল, ‘ছাদের ঘরটা এবার শেষ করা দরকার। লোকজন এলে ডাইনিংয়ে বসানো…অসুবিধে হচ্ছে।’
যে দালানটাকে ডাইনিং বলা হয় তার একপ্রান্তে শুভাননা আর কণা বড় ঘরটায় থাকে, অন্য প্রান্তে তুষারের ঘর। ছাদের ঘরটা সম্পূর্ণ করে তাকেই উপরে যেতে হবে। এতে তার আপত্তি নেই। ছাদে দাঁড়িয়ে গাছপালা পুকুর, হাঁস, ছাগল, ফুটবল মাঠ দেখা যায়। কিছুটা গ্রামের আদল যা তুষারকে অনেকক্ষণ আলস্য উপভোগে সাহায্য করে। শীতের দিনে ছুটির সকালে ইজিচেয়ারে সে অনেকবার ছাদে ঘুমিয়ে পড়েছে বই হাতে। বহু গ্রীষ্মের রাতে স্নান করে উঠে এসে অন্ধকার আকাশে তাকিয়ে থাকতে থাকতে ঘুমিয়ে পড়েছে। পাওয়ার কাট হলে কণা আর শুভাননাও ছাদে আসে বড় মাদুরটা নিয়ে।
কিন্তু ঘরটা তৈরি করে নেওয়ার চিন্তা তুষার করেনি। যে ছকটায় সংসার চলছে বরাবর তাইই থাকবে, এমন ধারণাই তার ছিল।
