”খুব শক্ত প্রশ্ন। তা এটা তোমার মাথায় এল কী করে?”
”ওপরে একটা দিদি এসেছে, ছবি আঁকে। সে রাস্তার ছবি এঁকে এনেছে, বলল রাস্তায় গাড়ি-ঘোড়া চলছে। আমি কিন্তু একটাও ঘোড়া দেখতে পেলাম না। জিজ্ঞেসা করলুম ঘোড়া কোথায়?….”
”আমি লাল ঘুঁটি নেব।” কথাটা বলেই তুষারের একবার মনে পড়ল কণাকে। মেয়েটা এখন কোথায়? বাড়ি ফিরতে না পারলে কোথায় রাতটা কাটাতে পারে?…যদি ট্রেন ইতিমধ্যে চালু হয়ে গিয়ে থাকে? কে জানে হতেও পারে! একবার স্টেশনটা ঘুরে এখানে আসা উচিত ছিল।
”তুমি কেন লাল নেবে? লাল নিয়ে তো মা খেলে; তুমি হলদে নাও।…দিদিটা আমার ছবি আঁকছিল, নিয়ে আসব?”
”না,…তুমি সবুজ তাহলে আমি নীল, আমি আগে চালব।”
”আমি কিন্তু নিজের ঘর নিজে গুণব, তুমি গুণে দেবে না। কাল মা গুণে দিচ্ছিল আর ঘর চুরি করছিল, আমি ধরে ফেলেছি।”
”আচ্ছা, আচ্ছা, তোমারটা আমি গুণে দেব না।”
হঠাৎই তুষারের মনে হল কণা তো ছবিই আঁকে আর হিমু কথিত উপরে আসা একটা দিদি’ সেও ছবি আঁকে। অদ্ভুত মিল! তবে উপরে মানে বাসনের দোকানদার পালবাবুদের সঙ্গে কণার পরিচয় থাকার কোনো সম্ভাবনাই নেই, শুভার সঙ্গে বইয়ের দোকানদার ছাড়া কলকাতার অন্য দোকানদারদের পরিচয় ঘটার কথা নয়। কণা এখন কোথায়? রাতটা কোনো ছেলের সঙ্গে যদি…?
চিন্তাটা কী করে মাথায় আসতে পারল? তুষার নিজের প্রতি তীব্র বিতৃষ্ণা জাগাতে চাইল। এগুলোই, এইরকম চিন্তাগুলোই অশুচি করে দেয়। কণার নিজস্ব একটা শরীর নিজস্ব একটা মন তৈরি হয়েছে, প্রকাশের জন্য ব্যস্ততা সে দেখায় না। চারুকলার ছাত্রী, রুচি শোভনতার একটা পর্যায়ে পৌঁছেছে।
”বাবা তুমি অনেকক্ষণ চাল দিচ্ছ না।”
”তুমি আমার হয়ে দিয়ে দাও।”
কণা হাল্কা বা চপল নয়। তবে চিনুর মতো সাহস দেখাবার জোর ওর নেই। কণা নিরাপদ ঘর, আশ্রয়ে থেকে বড় হয়েছে, বাবা মা আছে। চিনুর এসব কিছুই ছিল না, কোন্নগরের বাড়ি থেকে কাকারা ওকে তাড়িয়েই দিয়েছে।
”ঠিক গুনছ তো?”
”আমি মা’র মতো চুরি করি না।”
”এভাবে গুরুজনদের সম্পর্কে বলতে নেই।”
প্রেসারকুকারে স্টিম বেরোবার শব্দে রান্নার শেষ পর্যায়ের সঙ্কেত ভেসে এল। এরপর ভাত বসবে। পিছনের বাড়ির একতলায় রেডিয়ো চলছে। তুষার কানপেতে ভাসাভাসা শুনল, আজ রাতে প্রধানমন্ত্রীর বাসভবনে প্রয়াত ইন্দিরা গান্ধীকে আনা হয়েছে। তার আর শুনতে ইচ্ছে হল না। আজ দেশের জীবনে একটা ভয়ঙ্কর দিন, তার জীবনে সুখের দিন…সম্ভবত। তুষার ঠোঁট মুচড়ে ‘আমি কি করতে পারি’ ধরনের হালছাড়া হাসি হাসল।
অন্ধকার ঘরে মেঝেয় মাদুরের উপর কম্বল-চাদর দিয়ে তৈরি বিছানায় শুয়েছিল তুষার। একটাই তোষক, চিনু চেয়েছিল কিন্তু সে তোষকটা নিতে চায়নি। তাহলে হিমু কিসে শোবে? এক সময় চিনু তক্তপোশ থেকে নেমে এল।
”হিমু ঘুমিয়েছে?”
”হ্যাঁ, ওর ঘুম খুব গাঢ়।”
খাওয়ার পর বাসন মেজে স্নান করেছে। এটা ওর বরাবরের অভ্যাস। তুষার সেন্টের গন্ধ পেল। চিনু মাঝে-মাঝে ব্যবহার করে বাইরে কোথাও যাবার সময়।
”আজ তুমি অনেক হেঁটেছ, ক্লান্ত?” চিন্ময়ী মাথার বালিশে ভাগ নিয়ে পাশ ফিরে তুষারের বুকে হাত রাখল।
”এই মুহূর্তে নয়। তবে খাটুনিটা তোমারই বেশি হয়েছে…রান্নার।”
কনুইয়ে ভার দিয়ে চিন্ময়ী মুখটা ঝুঁকিয়ে তার ঠোঁট কামড়ে ধরল। সুগন্ধটা গলা, ঘাড় থেকে আসছে। বুকের উপর একটা তপ্ত স্পন্দিত ভার ক্রমশ উঠে আসছে। তখন তুষারের চোখের উপর, চিত হয়ে শোয়া একটা রক্তাক্ত নিস্পন্দ দেহের ছবি ঝলকে ফুটে উঠেই নিভে গেল।
চিন্ময়ীর খোঁপার মধ্যে আঙুল ভরে নির্মম মুঠিতে চেপে তুষার মনে মনে বলল, ‘রক্তটাও অবৈধভাবে…’। অতঃপর সে ঘাড় থেকে নিতম্ব পর্যন্ত হাত বোলাতে শুরু করল।
চার
”কাকা আর আপনাকে আসতে হবে না, এবার আমি নিজেই চলে যেতে পারব।”
ছানুকাকা ইতঃস্তত করছেন।
”ওই তো হাওড়া স্টেশন, শুধু তো ব্রিজটা পার হওয়া! কাকিমাকে বলবেন আমি সত্যি সত্যিই কিন্তু ছবি করব। যে কোনোদিন দুপুর নাগাদ চলে আসব।”
”খবর দিয়ে এলে ভালো হয়, রান্নাটান্না করে রাখব তাহলে।”
”কিছু করতে হবে না, যা পাব তাই খাব। আর হিমুর ড্রইং বইটা ফেরত দেওয়া হয়নি।”
হাওড়া ব্রিজের পুবে রাস্তাটা যেখানে বেঁকে পোস্তার দিক থেকে ব্রিজে উঠে গেছে ওরা সেখানে দাঁড়িয়ে কথা বলছিল। ভোর ছাড়িয়ে দিনটা এইবার ফুটে উঠবে। অন্যান্য দিনের মতই একটা সকাল। মানুষজন মন্থর গতিতে চলেছে। ভোরের ট্রেন ধরার জন্য যাত্রীভরা ট্যাক্সি, গঙ্গাস্নানে মহিলারা, থলিতে যন্তর নিয়ে রাজমিস্ত্রি, সাইকেলে কাগজের হকার আর ঠান্ডা নিথর বাতাস এবং দূরে আবছা নোঙর করা জাহাজ ও মাস্তুল। কণা হাওড়া স্টেশনে এসে দেখল ট্রেন দাঁড়িয়ে। প্ল্যাটফর্মে অল্পই লোক।
”এটা কোন ট্রেন?”
”তারকেশ্বর।”
”হিন্দমোটর ধরবে?”
”ধরবে।”
ট্রেনের সামনের দিকে হেঁটে গিয়ে লাইন পার হতে হয় তাই ট্রেনের সামনের দিকের কামরায় ওঠা তার অভ্যাস। তাকাতে তাকাতে যাচ্ছে, ট্রেন প্রায় ফাঁকাই। হঠাৎ সে থমকে দাঁড়াল। ওধারের জানলায় বাবা বসে, ঘাড় নামিয়ে খবরের কাগজ পড়ছে। কণা কামরায় উঠল।
সামনের সিটে একজন বসল। দেখার জন্য তুষার মুখ তুলেই চমকে গেল কণাকে দেখে। তারপরই হাসল।
