”হ্যাঁ। বন্ধ করে রেখেছ কেন?”
”সবাই রেখেছে। দরকার কি ঝুট ঝামেলায় পড়ে, কত বড় চাই?”
”সাত-আটশো।” বলেই তুষারের মনে হল একটু বেশিই নেওয়া যাক, ঠান্ডা পড়েছে, রাতে রেখে দিলে নষ্ট হবে না। কাল তো বনধ হবেই।
”এক কিলোর মতো আছে, চল্লিশ টাকা পড়বে।”
”সে কি! …আচ্ছা দাও, কেটে-কুটে বানিয়ে দিও।”
স্বরটা নিরাসক্ত তো বটেই উদাসীনতাও একটু বেশি দেখাচ্ছে। তুষার বুঝে গেছে দরদাম এখন বৃথা। দোকানের গা ঘেঁষে সরু গলি দিয়ে লোকটি থলিটা নিয়ে চলে গেল। বন্ধ দোকানের মধ্যে সামান্য ঝটপট আর পাখির কাতর শব্দ হল। দশ মিনিট পর সে থলিটা ঈষৎ স্ফীত অবস্থায় ফেরত পেল। নিঝুম, প্রায়ান্ধকার রাস্তা দিয়ে ফিরে আসার সময় ইন্দিরা গান্ধীকে তার মনে পড়ে। থলিটার ওজন এক কিলো হবে কিনা, এই সন্দেহটা অবশ্য তার রয়েই গেল।
হিমু খুশিতে টগবগ করছে। কথার স্রোত থাকছে না, কেউ থামাবার চেষ্টাও করল না। দু’জনে শোয়ার মতো তক্তপোশে বিছানাটা গোটানো। তাইতে মাথা রেখে তুষার পা ছড়িয়ে শুয়ে, পাজামাটা গুটিয়ে হাঁটু পর্যন্ত তোলা। অল্পদিন আগে এটা চিনু কিনেছে, এখনো সাবান-কাচাও হয়নি।
ক্লান্ত বটে কিন্তু সে অবসন্নতা বোধ করছে না। হিমুর কথা সে শুনে যাচ্ছে, নিজে বলছে কম। রকের কিনারে ছোট্ট ঘেরা জায়গায় রান্না হয়। চিন্ময়ী সেখানে কেরোসিন স্টোভের পলতে ঠিক করায় ব্যস্ত। শোবার ঘরেই ভাঁড়ার। ঘর-বার করতে হচ্ছে।
”একটা কথা বলতে ভুলে গেছি, হিমুকে এবার বড়, ভালো স্কুলে দেব।” হাতে গুঁড়ো সাবান মাখতে মাখতে চিন্ময়ী ঘরে এল। ”হোলি মাদার থেকে ফর্ম আনিয়েছি…বার্থ সার্টিফিকেট লাগবে ওর। সেটাও ওপরের বউদিকে বলেছিলাম শরৎকে দিয়ে যদি কর্পোরেশন অফিস থেকে ফর্ম আনিয়ে দেয়। কাল রাতে ফর্মটা আমায় দিল।”
”এতদিনেও বার্থ-সার্টিফিকেট করানো হয়নি? খুব দরকার ওটা। আমাদের সময় স্কুলে এসব লাগত না কিন্তু এখন বয়সের প্রমাণ সার্টিফিকেট ছাড়া কোথাও তো অ্যাকসেপ্টই করবে না।”
”তোমায় তো কবে, হিমুর সেই তিন বছর বয়সের সময়ই বলেছিলাম। তুমি বললে, সময় পাচ্ছি না কর্পোরেশনে যাবার আর অত তাড়ারই বা আছে কি, সব ভুলে গেলে?”
”দাও তাহলে।”
চিন্ময়ী হাত ধুয়ে এসে দেয়াল-তাকে রাখা একটা বইয়ের মধ্যে থেকে ফর্মটা বার করে কলম সমেত তুষারের হাতে দিল।
”হিমু বেড়াল ঘুরে বেড়াচ্ছে, তুমি ততক্ষণ রান্নাঘরে গিয়ে একটু পাহারা দাও। ঢাকনা ফেলে নয়তো মাংস খেয়ে নেবে।”
হিমু তড়বড়িয়ে ঘর থেকে বেরিয়ে গেল।
মন দিয়ে সে ফর্ম পড়ছে তখন চিন্ময়ী চাপা স্বরে বলল, ”বউদি এটা দিয়ে এ কথা সে কথার পর বলল, বাবার নাম বসাতে তোমার কর্তা রাজী হবেন কিনা জেনে নিও আগে।”
”কেন?” তুষার ঝটকা দিয়ে মুখ তুলল। ”তাহলে কি ওর বাবা নেই? এমনি এমনিই জন্মাল?”
”তা নয়, একটু ঠেশ দিল আর কি। হিমু হবার পর একবার বলেছিল, ‘তোমাদের তো বিয়ে হয়নি তাহলে হিমুর পিতৃ পরিচয় কী হবে?’ বলেছিলাম ‘পিতার পরিচয়েই পরিচয় হবে।’ তাইতে তখন অনেক কথাই বলেছিল: ‘সমাজ কি তা মানবে, এখনো তো এসব দরকার হয়…বৈধভাবে বিয়ে না হলে সন্তান কি বৈধ হয়..হিমু বড় হয়ে যখন জানবে তখন ওর মনের কী অবস্থা হবে, ও তো সমাজের বাইরে হয়ে যাবে, আইনও ওকে স্বীকার করবে না’…কথা তখন বলেছিল, সেগুলোই আবার আমাকে মনে করিয়ে দেওয়া।”
তুষারের মাথাটা ঘুরে উঠল। চিন্ময়ীর দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে তার চোখের সামনে একটা কালো পর্দা মুহূর্তের জন্য ওকে আড়াল করেই সরে গেল। এই মুহূর্তটাকেই সে ভয় করে। অনেকে অনেক কথাই গত দুশো বছর ধরে বলে আসছে, আগামী পাঁচশো বছর ধরে বলবে, বলুক। কিন্তু আসল কথা, নিজের কাছে কে কতটা পরিচ্ছন্ন। প্রত্যেকেরই নিজস্ব একটা মাপকাঠি থাকা দরকার আত্মায় জমে যাওয়া ময়লা আবর্জনার হ্রাস-বৃদ্ধি মাপার জন্য। তারও একটা আছে। হিমুকেও সে একটা মাপজোকের পদ্ধতি বুঝিয়ে দেবে যাতে সে সামাজিক আস্তাকুঁড়ের ফাঁসগুলোর দ্বারা বিপন্ন হতে না পারে। কিন্তু এই মুহূর্তে সে নিজেই বিপন্ন নিজের তৈরি প্রশ্নের দ্বারা। শুভা বা চিনু, কণা বা হিমু, এদের ভালোবাসার জন্য প্রয়োজনীয় বৈধতার ছাড়পত্র তার আছে কি? পুরোহিত বা কর্পোরেশন দ্বারা সিলমোহর করা ছাড়পত্র নয়। শুচিতা, যেটা কিনা ভালোবাসার প্রধান শর্ত, সততা যার উপর কিনা শুচিতা দাঁড়িয়ে থাকে, এ দুটো জিনিসকেই সে বৈধতা বলে জানে।
”কি এতক্ষণ ধরে ভাবছ আমার মুখের দিকে তাকিয়ে?” চিন্ময়ী ঝুঁকে, কিছুটা ব্যাকুলতা ওর স্বরে। ”তুমি কি ভেবেছ আমি এসব কথা পরোয়া করি, নাকি শুনে ভয়ে মরে যাচ্ছি? ওঠো ওঠো, হিমুর সঙ্গে লুডো খেল, ও খুব ভালোবাসে।”
তুষার হাতের ফর্মটার দিকে চোখ রেখে বলল, ”কথাকে পরোয়া করো বা নাই করো, সার্টিফিকেটটাকে কিন্তু কোরো, নইলে স্কুলের গেট থেকেই বিদেয় করে দেবে।”
চিন্ময়ী বেরিয়ে যাবার আগে মুখ ভেংচে বলে গেল, ”সে বুদ্ধিটা আমার আছে।…এক ঘণ্টায় মাংস ভাত করে দেব।”
তুষার একটু অবাক হল শুধু এই ভেবে যে, এত পথ হেঁটে আসার পরও পুরণো দিনের মতো ভেংচি কাটার ক্ষমতা চিনু রাখে!
হিমু ঘরে এসেই লুডো পেড়ে বসতে বসতে বলল: ”আচ্ছা বাবা, রাস্তা দিয়ে গাড়ি-ঘোড়া যায় বলি, কেমন বলি তো? ঘোড়া তো কই যায় না তাহলেও আমরা বলি কেন? পথঘাটও বলি, কই পথে কি কোনো ঘাট আছে? ঘাট তো গঙ্গায় আছে।”
