”অনেকদিন পর, তাই না?”
তুষারের বাহুতে নিজের বাহু স্পর্শ করিয়ে চিন্ময়ী বলল চোখ আধো বোজা অবস্থায় গঙ্গার দিকে তাকিয়ে। রেলিংয়ে রাখা তুষারের আঙুলে সে আঙুল ছোঁয়ালো। সব কিছুই আলতো কোমল ভাবে নবীন ভালোবাসার প্রথম অভিব্যক্তির মতো। তুষার মুঠোর মধ্যে আঙুলগুলোকে নিয়ে একবার চাপ দিয়েই রেখে দিল রেলিংয়ে। চিন্ময়ীর বাহু নিবিড় স্পর্শ দিল।
তুষার দু’পাশে তাকাল। এত নির্জনতায় আর এমন দিনে! সারা দেশ প্রথম ধাক্কা সামলে এখন বিষণ্ণতার মধ্যে নামছে। আর এমন সময়ে তারা গঙ্গার ধারে এইভাবে পাশাপাশি দাঁড়িয়ে পরস্পরের ছোঁয়া নিচ্ছে। কেউ দেখে ফেললে ভাববে কি! সে জুতো খোলার ছলে একটু সরে গেল।
”মনে হচ্ছে আঙুলের চামড়া উঠেছে ঘষা খেয়ে, জুতোটা ছোট হয়ে গেছে।”
মাঝের রেলিংয়ে পা তুলে সে ঝুঁকে মোজা খুলে আঙুলে হাত বোলাল। চিন্ময়ীও মাথা নিচু করে পায়ে আঙুল রেখে আলতো বোলাল।
”রুমালটা জড়িয়ে নাও।”
ব্যাগ থেকে সে রুমাল বার করে আবার বলল, ”এই বেঞ্চটায় বসো।”
ওরা বেঞ্চে বসল।
”বেশিক্ষণ বসলে পা ভেরে যাবে আর হাঁটতে পারবে না…এখনও মাইল তিনেক যেতে হবে।” তুষার হুঁশিয়ারি দিল। চিন্ময়ী এমনভাবে হাসল যাতে ঔদার্যের বা ক্ষমার মতো মন্থর একটা অনুভব ওর মুখে ছেয়ে এল। তুষার নিজের মধ্যে শান্ত একটা বদল ঘটার মতো কিছু হচ্ছে আঁচ করল। চিন্ময়ীর লম্বাটে মুখ, চওড়া গৌর কপালে খয়েরি টিপ, চৌকো চোয়াল, কাঁধের, চিবুকের আর বাহুর ডৌল, তুষারের কাছে আবিষ্ট হবার মতো জোরালো রেখায় তৈরি একটা ছন্দ মনে হল। ওর সারা অবয়বেই এই ছন্দটা গত বারো বছর ধরে আটকে আছে, বরং বলা যায় ধরে রেখেছে।
চিন্ময়ী রুমালটা জড়িয়ে দিচ্ছে। তুষার পূর্ণদৃষ্টিতে তার মুখের দিকে তাকিয়ে।
”অনেকদিন পর আমরা এখানে এলাম।” সে বলল, ”একইরকম আছে জায়গাটা শুধু ভিড়টাই যা নেই।”
চিন্ময়ী মুখ না তুলে বলল, ”আসতে ইচ্ছে করে কি তোমার?
অনুযোগ নয়, ব্যথিত প্রশ্ন, জানার জন্য কৌতূহল। যেন ইচ্ছে যদি করে তাহলে আগের মতো দু’জনে আসবে। কিন্তু এখন যেন একটা ক্লান্তি আর চাপ তুষার অনুভব করছে। দায়-দায়িত্ব বাড়ার জন্যই এটা হয়েছে। কেউ জানে না চিনু বা হিমুর কথা। না জানতে দেওয়ার জন্য অবিরাম একটা চেষ্টা তাকে চালু রাখতে হচ্ছে গত দশ বছর। ‘দু নৌকোয় পা রাখা’ কথাটার অর্থ সে বুঝেছে। ভারসাম্য বজায় রাখার এই পরিশ্রমটা থেকে রেহাই পাবার জন্য চিনু কতটা সাহায্য করতে পারে? ও কি বোঝে এসব?
উত্তর না পেয়ে চিন্ময়ী গঙ্গার দিকে তাকিয়ে রয়েছে। তুষার কষ্ট বোধ করল। আমিও কি বুঝি কতটা ঝুঁকি এই মেয়েটি নিয়েছে! কতটা সাহস দেখাচ্ছে?
”তুমি তো কাছাকাছি রাস্তা দিয়েই অফিস থেকে ফেরো, নেমে পড়তে পার। গম্বুজের কাছে সেই বেঞ্চটায় আমি থাকব। কাল…না পরের বুধবার।” তুষার আশা নিয়ে তাকাল চিন্ময়ীর মুখের দিকে।
”না থাক। হিমু একা থাকে…ওর কষ্ট হয়।”
”উঠবে?”
”আর একটু।” চিন্ময়ী আলতো করে হাতের পাতা তুষারের উরুর উপর রাখল। হালকা একটা যন্ত্রণায় সে এবার বসে যাচ্ছে। চিনুর হাতের সঙ্গে একটা উষ্ণতা তার চেতনায় উঠে এসে তাকে সহজ শিথিল করে দিচ্ছে। আশ্বাস? মমতা? সহানুভূতি? সহিষ্ণুতা? মাত্র একটা মৃদু স্পর্শের আঘাতে তার আত্মকেন্দ্রিকতা ভেঙে পড়ছে। ভাঙার একটা যন্ত্রণা তো আছেই। কিছুটা ভার কিছুক্ষণের জন্য হলেও নেমে যাচ্ছে তো! আমার যে এটা দরকার কাকে কাকে তা বোঝাব, বলব? লেজারে হিসেব রাখাই কি শুধু আমার জীবন? চিন্ময়ীর হাতের উপর হাত রাখল সে। অনেকদিন পর, এইভাবে।
ওদের পিছনে রাস্তা দিয়ে একটা পুলিশের অথবা মিলিটারি ট্রাক চলে গেল। সাইকেলে দুটি লোক যেতে যেতে চিৎকার করল:
”দাদা আজকেও প্রেম চালাচ্ছেন…বাড়ি যান, বাড়ি যান।”
তুষারের প্রচণ্ড হাসি পেল এবং হেসে উঠল। এইবার একটা ফূর্তি তাকে পাচ্ছে। চিন্ময়ীও হাসছে।
”এবার সত্যিই যেতে হয়, ওপরের বউদিকে হিমু নিশ্চয় জ্বালিয়ে মারছে।”
ওরা মন্থরভাবে হাঁটতে থাকল। কুয়াশার মতো আবছা দূরের গাছ, বাড়ি। রাস্তা নির্জন। দু’জনের পদক্ষেপের ছাড়া আর কোনো শব্দ নেই। এখানেই একবার পাওয়ার কাট-এর মধ্যে হাঁটতে হাঁটতে তুষার চুমু খেয়েছিল, আচমকাই। চিনু সেটা তারিয়ে ভোগ করেও বলেছিল, ‘এমন খোলা রাস্তার মাঝে উচিত নয়।’ ‘কোথায় তাহলে উচিত?’ ‘কোথায় পাব ঘর?’ ‘তৈরি করে নিতে হবে…করবে?’ কয়েক মাস পর নাথেরবাগানে ঘর পাওয়া গেল।
”আজ ট্রেন চলছে না, তা কি জান?”
”সে কি! তুমি বাড়ি ফিরবে কী করে?”
”ফিরব না…ফুটপাথে থাকব।” তুষার ত্যারছা চোখে চিন্ময়ীর মুখ দেখার চেষ্টা করল। বিস্ময় ও দুর্ভাবনা পরপর মুখের উপর দিয়ে সরে গিয়ে এবার ঠোঁটটেপা একটা লাজুক প্রত্যাশা ফুটে উঠেছে।
”থাকবে?”
”যদি থাকতে দাও।”
চিন্ময়ী নিঃশব্দে হাসল এবং সারাক্ষণ হাসিটায় উজ্জ্বল থেকে বাড়ির দরজায় পৌঁছল। তুষারের সঙ্গে এটাই হবে তার প্রথম রাত্রিযাপন।
”একটু বাজার করার দরকার…কিন্তু সব তো বন্ধ এখন।”
”থলিটা দাও। বাজারের আশেপাশে ঠিকই পাওয়া যাবে, বাংলা বনধ হলে দেখোনি?…মুরগির দোকানটায় একবার চেষ্টা করি।”
রকের ধারে পেরেকে ঝোলান থলিটা চিন্ময়ী আনতে গেল। তুষার তখন দেখল ঘরের তালাটায় হিমু চাবি ঢোকাচ্ছে। তুষারের আন্দাজটায় ভুল হয়নি। পাটাবন্ধ মুরগির দোকানটা থেকে দশ পা দূরেই দোকানি দাঁড়িয়ে ছিল, খদ্দের বুঝে নিজেই এগিয়ে এল। ”চাই?”
