আধ ঘণ্টা পর তুষার প্রথমবার থামল। ডান পায়ের কড়ে আঙুল জ্বালা করছে ঘষা লেগে। জুতো মোজা খুলে আঙুলটা পরীক্ষা করল। হয়তো পরে জুতো হাতে নিয়ে হাঁটতে হবে। এই সময় তার মনে হল চিন্ময়ীর কথাটায় তার রাজী হয়ে যাওয়াই ভালো ছিল। রাস্তায় উত্তেজনা, বিহ্বলতা বা শোকের প্রকাশ রয়েছে কিন্তু মেয়েদের হাঁটা-চলার পক্ষে বিপজ্জনক কিছু তার চোখে পড়েনি। ওকে বরং বললে পারত ‘শহীদ মিনারের নিচে অপেক্ষা করছি তুমি চলে এসো।’ এই কথাটা সে চিন্ময়ীকে প্রথম বলেছিল বারো বছর আগে। তারপর শুধুই বলত, ‘তাহলে কাল ওয়েট করব, সাড়ে পাঁচটায়।’ পরে বলত, ‘কাল আসছি।’
এখন ভুলেই গেছে শহীদ মিনারটাকে। ওদিকে আর তার যাওয়াই হয় না চিন্ময়ী ঘরভাড়া নিয়ে সংসার পেতে বসার পর থেকে। অফিস ছুটির পর সে সোজা চলে যায় নাথেরবাগান। তবে চিন্ময়ীকে দু’বার শহীদ মিনারটা দেখতে হয় অফিস যাতায়াতের সময়। হয়তো তখনকার সন্ধ্যাগুলোকে ওই সময় ওর কখনো কখনো মনে পড়ে। জীবনের মিষ্টি আবেগের খণ্ডগুলোকে পুঙ্খানুপুঙ্খ মনে ধরে রাখার ক্ষমতাটা মেয়েদের অদ্ভুত জোরালো।
ইন্দিরা গান্ধীর ছবি তুলে ধরে কিছু লোকের একটা মৌন মিছিল দেখে তুষারের মনে হল, এখন তার এই মহিলাটির কথাই ভাবা উচিত কিন্তু গত দু’ঘণ্টায় তার ফুরসতই হয়নি। ব্যক্তিগত সমস্যাগুলো মনকে কি সাংঘাতিক রকমের ছুট করিয়ে দেয় বহির্জগৎ থেকে। এতক্ষণ সে হিমুর কথা একবারও ভাবেনি, যেহেতু সে বিপদের বাইরে। বাড়ির কাছেই ওর কে জি স্কুল। স্কুলের আয়া ওকে পৌঁছে দিয়ে গেছে।
”এই যে এই যে, শুনছ।”
তুষার এখন মাঝের হাট ব্রিজের গড়ানে দিকে। ত্র্যস্ত হয়ে সে রাস্তার ওপারে তাকিয়ে চিন্ময়ীকে দেখতে পেল। হাত তুলে তার দৃষ্টি আকর্ষণ করছে। ওর সঙ্গে একটি মেয়ে এবং তিনটি পুরুষ। তুষারের কাছে অপ্রত্যাশিত এখানে ওকে দেখতে পাওয়া, সে অবাক হওয়ার থেকেও বেশি পেল স্বস্তি। আর তাকে এগোতে হবে না।
চিন্ময়ী প্রায় ছুটেই রাস্তা পার হয়ে এল। আবিষ্কারের মতো একটা আনন্দ ওর চোখে ঝকঝক করছে।
”বলেছিলাম না আমার জন্য অপেক্ষা করবে।” তুষার ছদ্ম বিরক্তিটা গলায় টেনে আনল। ”যদি না এখানে দেখা হয়ে যেত তাহলে কি হত ব্যাপারটা?”
”কিচ্ছু হত না। তোমাকে এই পথ দিয়ে তো আসতেই হবে, তাই ওরা যখন রওনা হল আমিও ওদের সঙ্গে হাঁটা দিলাম।” চিন্ময়ী উচ্ছ্বসিত স্বর হঠাৎ নামিয়ে দিয়ে, ”অফিসে লোকজন নেই, ফাঁকা, একা থাকাটা ভালো মনে হল না। তাছাড়া জানি আমি ঠিক দেখতে পাবই, হেঁটে আসতে আসতে কিন্তু নজর ঠিকই রেখেছি…কেমন পেয়ে গেলাম তো!” চিন্ময়ীকে উৎফুল্ল দেখাল এই কৃতিত্বের জন্য।
”এলাম বলেই পেলে।..ওরা দাঁড়িয়ে রয়েছে।”
তুষারকে নিয়ে রাস্তা পেরিয়ে এসে চিন্ময়ী পরিচয় করিয়ে দিল। চারজন নমস্কার করল। বাড়ি ফেরার তাগিদে আর অনিশ্চিত পরিস্থিতিতে প্রত্যেকেরই উদ্বিগ্ন মুখ। সৌজন্য দেখাতে দু’চার কথা বলেই সবাই হাঁটা শুরু করল। চারজনই চেতলা, কালিঘাট, ভবানীপুরের লোক। তারা ডানদিকের বর্ধমান রোড ধরে চলে গেল বিদায় জানিয়ে।
বেলা পড়ে আসছে। তুষারের পায়ের আঙুলে জ্বলুনি শুরু হয়েছে। কিন্তু সে ঠিক করল জুতো হাতে নেবে না। শ্রান্তির জন্য কথা বলার ইচ্ছা দু’জনেরই নেই। মাথাটাও যদি এখন সুইচের মতো কিছু একটা টিপে নিভিয়ে দেওয়া যেত, তুষার বারকয়েক এই কামনা করল। কিছুক্ষণ আগে যে খিদেটা পাচ্ছিল, সেটাও এখন পাচ্ছে না।
”হল কী, পায়ে ব্যথা?”
”হ্যাঁ।”
”একটু রেস্ট নেবে?”
”আর একটু পরে।”
”জল খাবে, ওই একটা টিউবওয়েল…আমার তেষ্টা পেয়েছে।” চিন্ময়ী এগিয়ে গেল। এক প্রৌঢ় একহাতে হাতল চালিয়ে পা ধুচ্ছিল, ওকে অপেক্ষা করতে দেখে ইশারা করল জল খেতে। তুষারও জল খেল।
”এটা তো মোমিনপুরের মোড়?” তুষার ভিজে হাত দিয়ে ঘাড় রগড়াচ্ছে।
”হ্যাঁ, এরপর একবালপুর মোড়, তারপর খিদিরপুর।” চিন্ময়ী মুখস্থের মতো বলে গেল।
”লোকটা মুসলমান।”
”তাতে কী হয়েছে?”
”কিছু না, গুলি করেছে শিখ, শুনেছ কি?”
”শুনেছি। প্রাণরক্ষা করার কথা যার, সেই কিনা প্রাণ হরণ করল…অফিসে সবাই বলছিল এটা চরম বিশ্বাসঘাতকতা।…আচ্ছা আমরা তো গঙ্গার ধার দিয়ে যেতে পারি।”
”তাই যাব, সোজা আহিরিটোলা পর্যন্ত। আজ লরি, ঠেলা রিকশা নেই, হাঁটতে বিরক্ত লাগবে না।”
এক সময় ওরা আধা-তৈরি দ্বিতীয় গঙ্গা সেতুর তলা দিয়ে এসে, ম্যান-অব-ওয়ার জেটি পার হয়ে ক্রমশ মন্থর হতে হতে অবশেষে দাঁড়িয়ে পড়ল। তখন অন্ধকার নেমেছে। রাস্তা নির্জন।
”একটু গঙ্গা দেখব।” চিন্ময়ীর অনুরোধটা খোলাখুলি মিনতিরই মতো। তুষার কথা না বলে রেললাইন পার হয়ে পাড়ের দিকে এগিয়ে গেল।
রেলিংয়ের ধারে বা ঢালু পাড়ে, গাছের নিচে বা আড়ালের বেঞ্চে যেসব জায়গাগুলো ঘন বা আবছা অন্ধকার থাকে সেখানে একজোড়া পুরুষ-মেয়েও বসে নেই। ঝালমুড়ি-বাদামের ফেলিওয়ালারাও নেই। নৌকো বাঁধা কিন্তু তাতে বেড়িয়ে আসবে বলার লোকেরা ঘাটের পথে দাঁড়িয়ে নেই। মালবাহী জাহাজে টিমটিমে আলো জ্বলছে। পঞ্চমী চাঁদ আর দূরে হাওড়া ব্রীজে মুক্তোর সারি হয়ে গেছে আলোগুলো। বাতাসে বেগ নেই। গায়ে লাগছে না বোঝা যায় না, ভাঁটা চলছে। পাড়ের ধার দিয়ে অবিরত কেঁপে বয়ে যাওয়া স্রোত এক ধরনের থেমে থাকার বিভ্রম সঞ্চার করছে, যা দেখতে তুষারের ভালো লাগছে।
