তুষার দুজনেরই মুখের দিকে তাকিয়ে হাসল মাত্র। ঘর থেকে বেরোবার সময়ই মনে পড়ল চিনুর কথা। সে থমকে গেল।
ঠাকুরপুকুরে ইস্টার্ণ ইন্ডিয়া ইলেকট্রিক্যালসের লাইটিং প্রজেক্ট ডিভিশনে টাইপিস্ট। সেখান থেকে হেঁটে ফিরতে হবে নাথেরবাগানে। কত মাইল? ওকে ফিরতেই হবে নয়তো হিমু একা থাকবে।
”আচ্ছা ঠাকুরপুকুর থেকে নর্থ ক্যালকাটা কত মাইল?” তুষার ঘুরে দাঁড়িয়ে প্রশ্ন করল।
”বলতে পারব না, আমার কোনো আইডিয়াই নেই। ঠাকুরপুকুর তো বেহালা ছাড়িয়ে, তাই না?”
”হ্যাঁ।”
”মাইল দশ, অত কি হবে? এর বেশি যে নয় এটা বলতে পারি।”
জি এম-এর ঘরের দরজাটা দেখা যাচ্ছে। দু’জন বেরিয়ে এল। অফিসের অন্য ঘরগুলো প্রায় ফাঁকা। রাস্তায় হাঙ্গামা হচ্ছে। বেহালা, তারাতলা আলিপুর ওসব অঞ্চলেও শিখ আছে। তুষারের মাথার মধ্যে বার দুই ঝিমঝিম করল। চিনু তাহলে হেঁটেই বা আসবে কী করে? বিশৃঙ্খল পরিস্থিতিতে হিংস্র খুনি কিছু মানুষের মধ্যে দিয়ে একা মেয়ে মানুষের হেঁটে আসাটা বিপজ্জনকই। ওকে এখুনি একটা টেলিফোন করা দরকার।
ইন্টার্নাল টেলিফোন বড়বাবুর টেবলে। রিসিভার তুলে অপেক্ষা করল অপারেটরের ‘হ্যালো’ শোনার জন্য। সাড়া পেল না।
”তুষার বৃথাই ফোন করছ, অপারেটরের বারাসাতে বাড়ি, অনেকক্ষণ সে চলে গেছে। ডাইরেক্ট লাইন আছে জি-এম-এর ঘরে, ওখান থেকে করো।”
”রায়দা আপনি এখনো যে যাননি?”
”আরে আমি তো থাকি চোরবাগানে, হেঁটে আর কতক্ষণই বা, কুড়ি মিনিট!”
জি এম-এর ঘরের দরজা ফাঁক করে সে দেখল তিনি ফোনে কথা বলছেন। ভ্রূ কোঁচকানো, কলমটা টেবিলে ঠকঠক করে যাচ্ছেন। সুভাষ একটা চেয়ারে সোজা হয়ে বসে।
”কী ব্যাপার তুষারবাবু?”
”একটা ফোন করব স্যার, খুব জরুরী।”
”ও ইয়েস, ভাগ্য পরীক্ষা করে দেখুন নাম্বার পান কিনা।”
সুভাষের পিছন দিয়ে টেলিফোনটার কাছে যেতে হল। তখন সে দেখতে পেল ফাইলটা ওর কোলে। চিনুর অফিসের ফোন নম্বরটা তার জানা। ডায়াল করেই সে ‘খুট’ শব্দটার জন্য স্নায়ুগুলো তীক্ষ্ন করে রাখল।
হয়েছে। তুষার নিশ্বাস ছাড়ল। তারপরই ও’ধারে ঘণ্টা বাজার শব্দ।
”হ্যালো, আমি একটু মিসেস সেনগুপ্ত..চিন্ময়ী সেনগুপ্তর সঙ্গে কথা বলতে চাই…হ্যাঁ ধরছি, বলুন ওর হাজব্যান্ড ফোন করছে।”
জি এম মাথা নিচু করে টাইপ করা চিঠি পড়ছেন, সুভাষ সোজা সামনের দিকে তাকিয়ে। তুষার দেয়ালে টাঙানো ভারতবর্ষের ম্যাপটার দিকে চোখ রেখে দাঁড়িয়ে রইল। চটপট কথা শেষ করতে হবে।
”হ্যালো বলুন, খুঁজে পাচ্ছেন না? বেরিয়ে গেছে নাকি?” তুষার শুনতে পেল চেঁচিয়ে লোকটি বলছে, ‘চিন্ময়ীদি কি বেরিয়ে গেছেন?’, তারপরই ”ধরুন এসে গেছেন।”
”হ্যালো, হ্যাঁ বলো?”
নরম, ব্যস্ততাহীন গভীর কণ্ঠস্বর। থিয়েটারের সেকেলে নায়িকাদের মতো টেনে টেনে বলা। চিনুর স্বাভাবিক ধরন-ই এটা।
”বাস তো বন্ধ, ফিরবে কী করে? হিমু একা রয়েছে।”
”আমিও তো তাই ভাবছি।” কণ্ঠস্বর দ্রুত হয়েছে এবং উদ্বিগ্ন ও তীক্ষ্ন। ”হেঁটেই যাব, আর কী করব?”
”পথটা ভালো নয়। তুমি অপেক্ষা কর, আমি গিয়ে নিয়ে আসব।”
”আবার তুমি এতটা পথ আসবে? কেন, আমি ঠিকই চলে যেতে পারব।”
”যা বলছি শোনো, এটা নর্ম্যাল টাইম নয়। যতক্ষণ না পৌঁছচ্ছি অপেক্ষা করবে।”
তুষার উত্তরের সুযোগ না দিয়ে রিসিভার রেখে দিল।
”প্রমাণ হল আপনি ভাগ্যবান।”
তুষার যথাযোগ্য হাসল। ”আপনি যাবেন কী করে?”
”হেঁটেই। কলেজে পড়ার সময় তরাইয়ে ট্রেক করেছি। তারপর আর লম্বা হাঁটা হয়নি, আজ হবে। গাড়ি তো চলতে দিচ্ছে না।”
”তুষারদা আপনি বাড়ি ফিরবেন কী করে? ট্রেন তো বন্ধ।” সুভাষ কথাটা বলে এতক্ষণে নিজেকে ঢিলে করল।
”সে কি। ঠিক জানো?”
”স্যারই বললেন।”
”হ্যাঁ। ছোটো শালার যাওয়ার কথা দিল্লি, রাজধানীতে। হাওড়া এনকোয়ারিতে ফোন করেছিলাম। জানালো, সব ট্রেনই বন্ধ, চলবে কি না বলতে পারছে না। তবে না চলার সম্ভাবনাই বেশি।”
নিজের নয়, কণার বাড়ি ফেরার চিন্তাটাই তার মাথায় দপ করে উঠল। মেয়েটা বাড়ি যাবে কী করে, তাহলে এখন করবে কী, থাকবে কোথায়? মাথাটা অসাড় হয়ে আসবে। সে প্রায় ছুটেই ঘর থেকে বেরোল, তার অফিস থেকে আর্ট কলেজ, খুব জোরে হাঁটলে পনেরো মিনিটে পৌঁছোতে পারবে এমন একটা আন্দাজ করে তুষার বারো মিনিটে পৌঁছোল।
কণা তার জন্য ফটকে দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করবে এমন প্রত্যাশা তার ছিল না। কিন্তু যাদের সে ঘোরাফেরা করতে দেখল, তারা যে কণাকে চেনে বা সে এখন কোথায় তা জানে এমন মনে হল না। কোনো মেয়েকে দেখতে পেলে বরং জিজ্ঞাসা করে ফল পাওয়া যেত কিন্তু একটি মেয়েও চোখে পড়ল না। সে একতলা, দোতলা, তিনতলা ঘুরল, ঘরে ঘরে উঁকি দিল। সব ফাঁকা। সিঁড়িতে বা ঘরে টাঙানো স্কেচ বা পেইন্টিং-এর ছবিগুলো তাকে মুহূর্তের জন্যও আগ্রহি করল না। ক্যান্টিনের বড় টেবিলটাও ফাঁকা। রাস্তা ভরে বন্যাস্রোতের মতো মানুষ হেঁটে চলেছে। পাঁচ-সাত লাখ লোকের সভা ভাঙলে এমন দৃশ্য দেখা যায়। তুষারের এখন লোক দেখার ইচ্ছে নেই। হয়তো হাওড়া স্টেশনে গেলে কণাকে ধরা যাবে। যাবে কি?
কিন্তু ট্রেন বন্ধের কথা যদি ইতোমধ্যে শুনে থাকে তাহলে কণা স্টেশনের দিকে যাবে না। তখন? তাদের কোনো আত্মীয় স্বজনের বাস কলকাতায় নেই। তুষারের দূর সম্পর্কের কেউ কেউ আছেন, কিন্তু তাদের ঠিকানা সে নিজেই জানে না, কণা জানবে কী করে! তাহলে কোনো বন্ধুর বাড়িতেই চেষ্টা করবে। বোকা মেয়ে নয়, নিজের ব্যবস্থা নিশ্চয় করে নিতে পারবে, করে নিতে পারা উচিত। যা দিনকাল! আর একবার কলেজ বাড়িটার দিকে তাকিয়ে সে দক্ষিণ দিকে হাঁটতে শুরু করল।
