দিনেশ দু পয়সায় চারটে লজেন্স কিনে, একটা মুখে পুরল। শালু হাওয়ায় দুলছে। পেছনের আকাশটা নীল। কতকগুলো ঘুড়ি উড়ছে। লাটালাটি চলছে দুটো ঘুড়িতে। দিনেশ ওদের শেষ দশাটুকু দেখার জন্য রাস্তার ধার ঘেঁষে দাঁড়াল।
.ছাদে কাপড় শুকোতে দেবার সময় চীৎকার শুনেছিল মাধবী। ছাদের ধার ঘেঁষে ঝুঁকে দেখতে চেষ্টা করেছিল। শৈলদের বাড়ির উঠোনটুকু ছাড়া কিছুই দেখা যায় না। শৈলর দু’টি ছেলে সারা সময় হুটোপাটি করে। একটিকেও উঠোনে দেখা গেল না। একবার চেঁচিয়ে উঠেই শৈল থেমে গেছল।
দুপুরে খাওয়া সেরে মাধবী শৈলদের বাড়িতে হাজির হল। ছেলেগুলো শুকনো মুখে তাকাল তার দিকে। শৈল রান্নাঘরের সামনে বসে আছে। উনুন জ্বলে যাচ্ছে। খুঁচিয়ে নামিয়ে পর্যন্ত দিতে ভুলে গেছে। রান্না হয়ে গেছল, ছেলেরা খেয়ে নিয়েছে। মাধবীকে দেখে ধড়মড় করে দাঁড়াল শৈল।
-চেঁচিয়েছিলি কেন?
চুপ করে রইল শৈল। ছেলেরা গুটিগুটি কাছে এসে মুখের দিকে তাকিয়ে থাকল। মাধবীর অস্বস্তি লাগছে। চেঁচাবার কারণ একটা কিছু ঘটেছে নিশ্চয়। কিন্তু সেটা কি ধরনের। হয়ত নিকট আত্মীয় কেউ মারা গেছে। হয় বাবা নয় মা। সান্ত্বনা দিতে হবে। বাবা-মা মারা গেলে কতকগুলো বাঁধা গৎ আছে, আউড়ে যেতে হবে। আগে জেনে নিতে হয়, তাদের বয়স কত। প্রকৃতি কেমন ছিল, কি ভালবাসত, তাদের অবর্তমানে সংসারের কতখানি ক্ষতি হবে। না জানলে ঠিক বোঝা যায় না শোকটা কত গভীর।
-কি হয়েছে কি, অমন চুপ করে দাঁড়িয়ে রইলি কেন?
-উনি মরবেন বলছেন।
কথাটা বুঝতে যতটুকু সময় লাগে, তারপরই মাধবী ভেবে পেল না সে হাসবে না কাঁদবে। ছ’ ছেলের মা হয়েও শৈলর বয়স আর বাড়ল না। এখনো তাহলে ওদের ঝগড়া খুনসুটি চলে। আছে ভাল!
-মরবে, তা মরুক না! অমন কথা ওরা অনেকে বলে, তুইও গ্যাঁট হয়ে বসে থাক।
বেশ লাগছে মাধবীর এখন নিজেকে। এই ধরনের কথাবার্তায় সময় কাটাতে সুখ আছে। বছর তিরিশ বয়স শৈলর। পর পর ছ’টা বাচ্ছার পর ফরসা রঙটা ফ্যাকাশে হয়েছে। কনুই আর গলার হাড়গুলোও ঠেলে উঠেছে। তাছাড়া মুখটা মিষ্টি, গালে এখনো টোল পড়ে। বয়সে শৈল অনেক ছোট, চিনুর থেকে দুচার বছরের বড়। মাধবী ওকে একই সঙ্গে সখি আর মেয়ে ভাবতে পারে। ঠাট্টা মস্করা করা যায় আবার ধমক-ধামকও দেওয়া চলে। সেদিন ইলিশ আসায় মাধবীর সর্বপ্রথমে মনে পড়েছিল শৈলকে। ওর সংসারে অনেকগুলো পেট। দিতে হলে অনেকগুলো দিতে হয়। নিজের সংসারের জন্য রেখে দাতব্য করা উচিত। তাই মাধবী বাধ্য হয়েছিল সেদিন শৈলর নামটা ভুলে যেতে।
-আজ আপিস যায় নি?
-না।
-ছুটি নিয়েছে?
-না।
-তবে!
-আর যেতে হবে না, চাকরি গেছে।
-কবে থেকে!
-ন’দিন হ’ল। ও বলছে মরবে। আজ সকাল থেকেই বলছে ডুবে মরব, নয়তো বাসের তলায় ঝাঁপিয়ে পড়ব।
-তোর বাবা কোথায় রে?
-নিমাই জ্যাঠাদের রকে বসে আছে।
বিনিয়ে বিনিয়ে কাঁদতে শুরু করেছে শৈল। ফাঁপরে পড়ল মাধবী, এখন সে কি বলবে। কেউ মারা গেলে তবু কিছু বলা যায়, কিন্তু এই কান্না সে কি বলে সান্ত্বনা দেবে। চাকরি কেন গেল, একথা জিগ্যেস করার কোন মানে হয় না। যে ভাবেই চাকরি যাক, এখন এই কাচ্ছাবাচ্ছা নিয়ে শৈলর কি হাল হবে সেটাই বড় কথা।
শৈল কাঁদছে। মাঝে মাঝে দু একটা কথা বলছে। ছেলেরা তাকিয়ে আছে।
-তুই কি বললি?
-কি আর বলব।
-একটা মানুষ মরবে বলল, আর কিছু বললি না।
-কোন লাভ আছে?
-ক্ষতি তো আছে।
চুপ করে রইল শৈল। মাধবী আর কথা খুঁজে পাচ্ছে না। শৈলর স্বামী যদি মারা যেত তাহলে সে অনেক কথা বলতে পারত। কিন্তু মরবার ভয় দেখিয়েছে-এখনো মরেনি, সেক্ষেত্রে কি বলা যায়! মানুষটা যদি না মরে তাহলেই অবস্থাটা কি বদলাবে? গোটা সংসারটাই তো মরতে বসছে। চল্লিশ বছর বয়স হল শৈলর স্বামীর। এ বয়সে কি এমন কাজ জোটাতে পারবে। পেটে দুমুঠো ভাতই শুধু নয়, ছেলেগুলোকেও মানুষ করে তুলতে হবে। শৈলর কান্নাটা নতুন ধরনের। সান্ত্বনা দেওয়ার এখনো কোন বাঁধা গৎ তৈরী হয়নি। একটা মানুষ নয়, গোটা পরিবার মরতে বসেছে। এখনো মরেনি কিন্তু মরবেই তো।
-খেয়েছিস?
চুপ করে রইল শৈল।
-না খেলেই কি মানুষের মন বদলায়? নে, খেয়ে নে।
-ওর এখনো খাওয়া হয়নি।
-এই যাতো, বাবাকে ডেকে নি আয়।
পাঁচটা ছেলে ছুটে বেরিয়ে গেল। ছোটটা শৈলর কোলে গড়িয়ে পড়ল মাই খাবার জন্য।
-তুই ব’সে পড়।
-ও আগে আসুক।
এখন কাজ রইল শুধু শৈলর মুখের দিকে তাকিয়ে বসে থাকা। ঘষে ঘষে চোখের কোল লালচে হয়েছে। চোখের পাতা ভিজে। চটচটে হয়ে জুড়ে যাচ্ছে। ছোট হয়ে গেছে চোখ দুটো। মানুষের মুখের দিকে তাকান মানেই তার চোখের দিকে তাকান।
মেঝের দিকে মুখ নামিয়ে রাখল মাধবী। একটা কিছু বলা দরকার এখন। কি বলা যায়। কথা আসছে না মনে। প্রাণপণে হাতড়াতে শুরু করল মাধবী। মনের এ-কোণ সে-কোণ থেকে এক টুকরো অভিজ্ঞতাও খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না যা দিয়ে একটা কিছু বলার মত কথা তৈরী হয়। এতখানি বয়স তাহলে কি দিয়ে গেল। এখনো কিছুদিন বাঁচতে হবে, অনেক কিছুই দেখতে হবে, অনেক অবস্থার মধ্যে নিজেকে পড়তে হবে, কিন্তু কি দিয়ে সেই অবস্থার সঙ্গে নিজেকে মানিয়ে নোব! কেউ মরলে এক ধরনের সান্ত্বনা দেওয়া যায়। বাপঠাকুর্দার আমল থেকে তা চলে আসছে। কিন্তু এই নতুন ধরনের, সকলে মিলে মরার কি সান্ত্বনা? নতুন কথা তৈরী করতে হবে, কিন্তু একটা কথাও তৈরী করা যাচ্ছে না। অভিজ্ঞতা হার মানছে। ভয় ভয় করছে। ছোটবেলায় ভূতের গল্প শুনে, জানলা দিয়ে হঠাৎ ঘুম ভেঙে একটা দুটো তারা চোখে পড়লে যে গা-ছমছমানি ভয় লাগত অনেকটা সেরকম। শৈল একদৃষ্টে তাকিয়ে। পাঁচটা ছেলে, বাপকে ধরে আনতে গেছে। ছোটটা মাই খাচ্ছে। উনুনটা জ্বলছে খাঁ খাঁ করে। ভাত বাড়াই আছে। এরপর উনুন ধরবে না, ভাতের হাঁড়ি চাপবে না, বাচ্ছাগুলো ক্ষিদের জ্বালায় ঘ্যানঘ্যান করবে। শৈলর স্বামী হয়তো সত্যিই বাসের তলায় ঝাঁপিয়ে পড়বে আর শৈল কি করবে?
