”ইন্দিরা গান্ধিকে গুলি করেছে…ইন্দিরা গান্ধীকে গুলি করেছে।”
কয়েক সেকেন্ডের জন্য বিমূঢ় হয়ে রইল ঘরটা।
”কোথায় খবর পেলে, কে দিল?”
”বাজে খবর, কারা রটাচ্ছে?”
অনির্বাণ হাঁফাচ্ছে, মুখে রক্ত জমেছে, চোখ বিস্ফারিত।
”এক ভদ্রলোক কাজে এসেছেন। তিনিই বললেন, আসার সময় পিটিআই অফিসের সামনে ভিড় দেখে খোঁজ নিয়ে শুনে এলেন।”
”বেঁচে আছেন না মরে গেছেন?”
”বাজে গুজব।”
”কেন হতে পারে না? স্বর্ণমন্দিরে যেভাবে মিলিটারি দিয়ে অপারেশন করালেন…ওরা কি ছেড়ে কথা বলবে? কে গুলি করেছে বলেছে কিছু?”
”রেডিয়ো…অফিসে একটা রেডিয়ো থাকা উচিত। ক্রিকেটের সময় তো গণ্ডা গণ্ডা দেখা যায়!”
”সেসব কিচ্ছু এখনো জানা যায়নি। শুধু একটা ফ্ল্যাশ এসেছে মাত্র।”
”এত বড় ব্যাপার আর পিটিআইয়ের মতো প্রতিষ্ঠান, মিথ্যে খবর কি আর দেবে?”
এরপরই বিশৃঙ্খল কথাবার্তায় ঘরটা ভরে গেল। অনেকেই বেরিয়ে গেলেন খোঁজখবর নিতে! উপরতলা থেকে দ্রুত কিছু লোক নেমে এল। প্রত্যেকেই নিজের বিস্ময়কে প্রকাশ করার জন্য ব্যস্ত, আবেগকে কীভাবে বার করে দেবে সেটা বুঝতে না পেরে অনেকেই অস্থির। এত বড় ধাক্কা দেওয়া ঘটনা জীবনে খুব কমই আসে, বিশেষত অপ্রত্যাশিত, অস্বাভাবিক অঞ্চল থেকে।
অফিসের বাইরে ঘুরে দু’চারজন নানান খবর নিয়ে আসছে। তুষার পিছনের বারান্দায় বেরিয়ে এসে নিচের উঠোনে দেখল প্রতিদিনের মতোই। দরোয়ানদের ঘর, ক্যান্টিনের রান্নাঘর, একটা কালো প্যান্ট আর রঙিন ফ্রক শুকোচ্ছে দড়িতে, কয়েকজন এ’ধার থেকে ও’ধার গেল। অন্য বাড়ির জানলা দিয়ে যা দেখল তাতে মনে হল উত্তেজনা সব অফিসেই একভাবে নাড়া দিচ্ছে। বারান্দার একধারে ডেসপ্যাচের মণিরুল দাঁড়িয়ে। তুষারকে দেখে এগিয়ে এল।
”শুনেছেন কি কে গুলি করেছে।”
”না, কেন?”
”এমনি।” তারপর খাপছাড়াভাবে বলল, ”আমরা হিন্দু এলাকায় থাকি।”
”তাতে কী হয়েছে?”
মণিরুলের শুকনো মুখ। ভিতরের টান টান ভয় ওর ঠোঁটে হাসির মতো একটা করুণ ব্যাপার তৈরি করল।
”যদি কোন মুসলমান গুলি করে থাকে?”
তুষার থ হয়ে রইল। এটা তো তার মাথায় আসেনি! এখনো সে জানে না কে গুলি করেছে। সে প্রায় ছুটেই ঘরের মধ্যে এল।
”জানো? খবর পেয়েছ কি, কে মেরেছে?”
”নিউজ এজেন্সি বলছে, পিএম মারা গেছেন আশঙ্কা হচ্ছে।”
”কিন্তু কে বা কারা মারল?”
তুষার ঘর থেকে বেরিয়ে এল। সিঁড়ি দিয়ে লাফিয়ে উঠে এল অনির্বাণ।
”শেষ।” প্রায় চিৎকার করে উঠল সে। ”মারা গেছেন, পাক্কা খবর। এই একটা চল্লিশে দিল্লি থেকে খবর এল।”
”কে মেরেছে গুলি?”
”ওঁরই বডিগার্ড, দু’জন।…বাড়ি থেকে বেরিয়ে পাশেই যাচ্ছিলেন…”
”বডিগার্ডরা কোন জাতের? কোন ধর্মের।”
”শিখ।”
”ঠিক বলছ?”
”তাই তো শুনলাম।”
তুষারের বুক থেকে বিরাট একটা ভার নেমে গেল। একটি স্বস্তির সঙ্গে সঙ্গে বুকের খালি জায়গাটা আনন্দে ভরে গেল এবং সেটা অনুভব করা মাত্র অসহায় বোধ করল। এখন আনন্দ! এই বিশাল শোক আর দুঃখের মধ্যে? কিন্তু এই অনুভূতিটার উপর আমার তো কোনো হাত নেই। কোনো অনুভূতির উপরই কি থাকে? এগুলো তো আমি তৈরি করি না, ঘটনায় করিয়ে দেয়। মণিরুল আরতার পরিবার নিরাপদ হয়ে গেল। বিশাল ইন্দিরা গান্ধীর পাশে এই স্বস্তিটুকু তুচ্ছই, নিজেকে অপরাধী করার মতো যোগ্যতাও এর নেই। কিন্তু মণিরুলরা বেঁচে গেল। খুনিরা মুসলমান নয়।
কণা এখন কোথায় কী করছে? ওর তো এখন কলকাতায় থাকার কথা! তুষারের মনে হল, খবরটা শুনেই কণা ‘এ এ এ মা আ আ!’ বলে ডানহাতের তালু মুখে চেপে ধরবে। এইভাবেই ও অবাক হয়।
”গণ্ডগোল শুরু হয়ে গেছে, প্রায় রায়টের মতো।”
”কে বলল? দেখেছে কেউ?”
”হ্যাঁ দেখেছে। ট্রাম বাস সব বন্ধ হয়ে গেছে। ভবানীপুরে, হরিশ মুখার্জি রোডের মোড়ে ট্যাক্সি জ্বলছে, হাজার হাজার লোক নাকি বড়বাজারের গুরুদ্বার অ্যাটাক করেছে। ট্রাম-বাসও পুড়েছে।”
ঘরে আতঙ্ক দেখা দিল। সবাই ব্যস্ত বেরিয়ে যেতে। হাঙ্গামা আর ট্রাম-বাস বন্ধ হলে, নিরাপদে বাড়ি ফেরার তাগিদটাই প্রথম ও একমাত্র লক্ষ্য হয়ে ওঠে। তুষারের প্রথমেই মনে পড়ল কণার কথা। হেঁটে হাওড়া স্টেশন যেতে হবে। যে পথ ধরে যেতে হবে, সেই পথগুলো দ্রুত সে চোখে ভাসিয়ে তুলল। চৌরঙ্গিতে গোলমাল হবে না, ডালহৌসির অফিস পাড়াতেও নয়। তারপর স্ট্র্যান্ড রোড ধরে হাওড়া ব্রিজের দিকে যদি যায়…ওখানে অজস্র গোডাউন, স্টেশনে যাবারও পথ। শিখদের বাস ট্রাক আর ট্যাক্সি ও পথে তো আছেই, যদি জ্বালিয়ে দেয় আর ড্রাইভারদের পিটিয়ে মারে, জ্বালাবার বা মারার লোক ওই অঞ্চলে আছেই, তাহলে কেউ বাধা দিতে এগোবে না। তখন পুলিশের গুলিটাই ভয়ের। এলোপাতারি ছুঁড়বে আর কণা যদি ওখান দিয়ে সেই সময় হাঁটে, পালাতেও তো পারবে না, এসব ও শেখেনি। তবু রক্ষে শাড়ি পরে না, সালোয়ার-কামিজে তবু ছোটা যায়।
”তুষারদা, বসে থেকে কী করবেন, বাড়ি যান।”
”ট্রাম বাস বন্ধ, গুলিটুলিও চলছে। মেয়েটা কলেজে, চিন্তা হচ্ছে।” তুষারের গলা শুকিয়ে আসছে। ”কখনো তো এই সব ঝামেলায় পড়েনি।”
”আজকালকার মেয়ে, ঠিক চলে যেতে পারবে। চিন্তা করবেন না।”
”ইন্দিরা গান্ধীও কি আজকালকার ছিলেন না? চলে গেলেন কিন্তু এভাবে যাওয়ার কথা কি ছিল?”
