এই বদলিটা যে হবে, তুষারের প্রত্যাশায় তা ছিল। অ্যাকাউন্টস অফিসার শেষবার তাকে যখন বলে: ”করছেন কী, এসব কী নোট দিয়েছেন? পার্টির পেমেন্ট আটকে যাচ্ছে? জি এম পর্যন্ত বিরক্ত হয়েছেন। এসব নোট আর দেবেন না।”…তুষার তখনই বুঝে গেছে দুর্নীতির চাকার মধ্যে পেরেক ঢুকিয়ে সেটা বন্ধ করার ফল ভালো হবে না।
”কিন্তু হাজার পঞ্চাশ টাকা চুরি করে বেরিয়ে যাচ্ছে, সেটা কি বলব না?”
”টাকা কি আপনার না আমার? সেন্ট্রাল গভর্মেন্টের টাকা, অত মাথা ব্যথার দরকার কি? এই লালচাঁদ অ্যান্ড কোম্পানির লোক তো আপনার কাছে গেছল। মনে রাখবেন এরা কিন্তু খুব পাওয়ারফুল, ওদের লিঙ্কটা উপরে অনেক দূর পর্যন্ত।”
”বলো কী কাজের ব্যাপার?”
”আপনি সিটে বসুন গিয়ে আমি যাচ্ছি।” সুভাষ আবার লিফটের জন্য লাইনে গিয়ে দাঁড়াল।
তিনতলায় পৌঁছে তুষার দেখল অফিসের তিনটি ছেলে নিজেদের মধ্যে কথা বলতে বলতে, তাকে দেখেই, একজন চেঁচিয়ে উঠল, ”তুষারদা স্পোর্টস এই নভেম্বরেই, পনেরোই। আপনি নামছেন।”
”তুষারদা তো এখনো ভেটারেনদের ‘এ’ ক্যাটেগরিতে, তাই তো?”
”হ্যাঁ হ্যাঁ, এখনো পঞ্চাশ হয়নি, আমি ওর সার্ভিস হোল্ডার দু মাস আগে, অ্যাকাউন্টসে যখন এলেন তখনই দেখেছি এখনো বছর দেড়েক বাকি…কিন্তু শরীরটা কী জব্বর রেখেছেন! আপনার ভেটারেনে নামা উচিত নয়।”
তুষার শুধুই হাসল। তিনজনই অল্পবয়সি। ওদের মধ্যে অনির্বাণকেই শুধু চেনে। অফিসের কাজ বাদে আর সব ব্যাপারে অত্যন্ত খাটিয়ে। খবরও রাখে, বিশেষ করে খেলার। লিফট থেকে বেরিয়ে সুভাষ তার দিকে তাকিয়ে চলে গেল।
”এবার কী প্রাইজ দেবে? প্লাস্টিকের সস্তা জিনিস দিয়ে কাজ সারবে তো?”
”না না এবার অন্যরকম কিছুর কথা ভাবছি। কাল-পরশুই বসে ঠিক করা হবে। ডাবল বেড-শীট আর পিলো কেসের সেট কিংবা কম্বল নয়তো অ্যাটাচি।”
তুষার ঘড়ি দেখল, দশটা পাঁচ। সই করে নিজের চেয়ারে বসার সঙ্গে সঙ্গেই সুভাষ এল। হাতে একটা ফাইল। ঝুঁকে সে টেবলের পাশে দাঁড়াল।
”কী করব একটু পরামর্শ দিন। এই চালান, চিঠি, জিআরএন, ইম্পোর্ট রিপোর্ট, রিজেকশান রিপোর্ট সব এতে রয়েছে, আর আমার নোট। আপনি পর পর দেখলেই সব বুঝতে পারবেন।”
”তুমি আগে মুখে বল।” তুষার নিরাসক্ত স্বরে বলল। এসব কাগজ ঘাটাঘাটি করার ইচ্ছা সে হারিয়ে ফেলেছে দু মাস আগে। তার পাশের চেয়ারের লোক এসে গেছে। ‘ওই কোণের টেবিলটায় চলো, সরকারদা ছুটিতে আছে।”
”ব্যাপারটা হল, হেড অফিস চালান করে মিলেতে মালটা পাঠিয়েছে, মিল ইম্পোর্ট রিপোর্টও তৈরি করল কিন্তু অর্ধেক মাল, বয়লার আর মেসিনের প্রায় পঞ্চান্ন হাজার টাকার স্পেয়ার পার্টস রিজেক্ট করেছে অথচ মালটা পার্টির কাছে কিন্তু ফেরত যায়নি। এদিকে যে চালানে হেড অফিস থেকে মাল গেছে সেই চালানটাই পাওয়া যাচ্ছে না, তার মানে মাল যেন হেড অফিস থেকে মিলে যায়নি। কিন্তু মিল ইম্পোর্ট রিপোর্ট তৈরি করে ফেলেছে।”
তুষার ফাইলের কাগজগুলোর কয়েকটা উল্টে বলল, ”রিজেকশন রিপোর্টটা কোথায়? ওটা তো রিজেকশন প্রমাণ হিসেবে সাবমিট করতে হবে। তাছাড়া হেড অফিসের যে চালানে মাল গেছে সেটাই বা কোথায়? তাতে তো লরির নাম্বারও থাকবে।”
”কিচ্ছু নেই। চালান পাওয়া যাচ্ছে না।” সুভাষ অসহায় ভঙ্গি করল হাতের তালু উল্টে। ”পার্টিকে ফেরৎ দেওয়া হয়নি যখন, রিজেক্ট মালটা তাহলে মিলেই আছে। এদিকে হেড অফিসের চালান দেখিয়ে এই দেখুন, পার্টি বিল দিয়েছে অথচ চালানটা মিসিং।”
তুষার মুচকি মুচকি হাসতে শুরু করল। সুভাষও মিট মিট করে হাসি হাসল।
”স্টোরে মাল নিশ্চয়ই ঢুকেছে নয়তো ইম্পোর্ট রিপোর্ট তৈরি হবে কেন? আবার হেড অফিসে চিঠিও রয়েছে মাল রিজেক্ট হয়েছে। চমৎকার!” তুষার ফাইলটা বন্ধ করে সুভাষের দিকে ঠেলে দিল।
”আমি নোট দিয়েছিলাম, রিজেক্ট মাল পার্টিকে ফেরত দেওয়ার কোনো ডকুমেন্ট নেই।”
”মিলের স্টোরস ইনচার্জ তাহলে ফাঁসবে। রিজেক্ট মাল ফেরত যায়নি মানে স্টোরেই আছে।”
সুভাষ মাথাটা হেলিয়ে বোঝাল তাই-ই। ফাইলটা আবার খুলে একটা চিঠিতে আঙুল রাখল।
”মিল চিঠি দিয়েছে আই আর নম্বরটা ক্যানসেল করে ফ্রেশ নতুন নম্বর বসানো হোক। তাই হয়েছে। পার্টিকেও জানিয়েছে তোমার চালান ক্যানসেল, ওই মাল অন্য অর্ডারের এগেনস্টে অ্যাডজাস্ট করা হয়েছে। তুষারদা এর মানেটা নিশ্চয় জানেন, রিজেক্ট মালই অ্যাকসেপ্ট করা হল। পার্টি তারপর ফ্রেশ চালান দিয়েছে। এখন এই দেখুন পেমেন্টের জন্য বিল সাবমিট করেছে।”
”তা তোমার মুশিকলটা কোথায়?”
”কিন্তু আগের ক্যানসেল হওয়া মালটা গেল কোথায়, রিজেকশান মেমো কোথায়, যদি এই সব প্রশ্ন অডিট করে তখন জবাব দেবার কিছু তো নেই।”
”তাহলে তোমার নোটে তাই লিখে দাও।”
”লিখে দেব!”
তুষার এইবার সচকিত হল। সুভাষ কী বলতে চায় সেটা ওর চাহনিতেই ধরা পড়েছে…’এই নোট দিয়েই তো আজ আপনি এই টেবিলে চালান হয়েছেন, আমাকেও কি তাই’…তুষারের মুখ ধীরে ধীরে কঠিন হয়ে উঠল।
”পরামর্শের জন্য আমার কাছে কেন এসেছ? সুভাষ, তোমার বিবেকের সঙ্গে কথা বলো। সেই তোমার বড় বান্ধব…বড় শত্রুও। তোমার পাশেই বড়বাবু নাহাতা আছেন, পার্টিদের সঙ্গে ওঁর সম্পর্কটা ভালোই, ওঁকেই জিজ্ঞেস করে নিতে…’ তুষার বাক্যটি সম্পূর্ণ করতে পারল না। চিৎকার করতে করতে ছুটে আসছে অনির্বাণ।
