কণা হাসছিল। সেই সময় ঘর থেকে ছানুকাকা আর লুঙ্গি পরা প্রতিবেশীটি বেরিয়ে এল।
”একদমই তো কাঁচা, পলিটিক্সের প-ও জানে না, দাদামশাই কি মা প্রাইম মিনিস্টার হলেই যে দেশের হাল ধরার ক্ষমতা থাকবে, এটা মানা যায় না। ডায়নাস্টিক রুলই বহাল রইল, সামন্ত্রতান্ত্রিক ধারণাতেই তো এখনো দেশটা চলছে।”
ছানুকাকা শুনতে শুনতে মাথা নাড়লেন।
”দেখা যাক কিছুদিন না গেলে ঠিক বোঝা তো যাবে না। তবে ক’দিন এখন আর দেশে কাজকম্মো ব্যবসাবাণিজ্য বলে কিছু থাকবে না।”
দুজনে কথা বলতে বলতে দরজা পর্যন্ত গেলেন। প্রতিবেশী বিদায় নিতেই তিনি ফিরে এসে হিমুর, তারপর অন্যান্য স্কেচ দেখতে দেখতে বললেন:
”দিলীপবাবুর কাছে শুনলাম গুলি টুলি চলেছে, শিখরা লালবাজারে গিয়ে আশ্রয় নিয়েছে। লুঠপাঠও হয়েছে, সবই শিখেদের দোকান। তবে এখন কলকাতা নর্ম্যাল।”
”আমি কাল ভোরে প্রথম ট্রেনেই চলে যাব।”
”ভোরে কেন?” কাকিমা প্রতিবাদ করলেন। ”ভাতটাত খেয়ে তারপর যেয়ো। দোকানবাজার বন্ধ, কিছুই তো রান্না করা গেল না।”
”পরে এসে ভাত খাব। তাছাড়া আপনার একটা পোট্রেট আমি করবই, অয়েলে।”
”অয়েল মানে ওই যেসব বড়লোকদের বাড়িতে অয়েল পেন্টিং, তাই?” ছানুকাকুর স্বরে সমীহ এসে গেল।
”অত বড় নয়, শুধু মুখটুকু এই কাঁধ পর্যন্ত। আমি কিন্তু কাকিমা কাল ভোরেই যাব, দুশ্চিন্তায় মা-র রাতে নিশ্চয় ঘুম হবেনা।”
”হ্যাঁ হ্যাঁ নিশ্চয় যাবে। মেয়ে রাতে বাড়ি না ফিরলে কোন মা আর সুস্থ থাকতে পারে। আমি স্টেশনে পৌঁছে দিয়ে আসব, নিশ্চই কাল ট্রামবাস ট্রেন চলবে।”
রাত্রে খাওয়ার পর কাকিমা দালানে তক্তপোশে বিছানা পাতলেন ছানুকাকার জন্য। কণাকে নিয়ে তিনি ঘরে শোবেন। রাতে এরা তাড়াতাড়ি শুয়ে পড়েন, সূর্য ওঠার আগেই ওঠেন।
”আলো নিভিয়ে দি এবার?”
”দাঁড়ান কাকিমা, একবার বাথরুম যাব। আমি নিভিয়ে দেব, আপনি শুয়ে পড়ুন।”
বাথরুমে অন্ধকার। তবে জানলাটা আধখোলা। সেটা থেকে একতলার আলো ঢুকে পড়ে, আবছা ভাবে চৌবাচ্চচা, বালতি ইত্যাদিকে বুঝিয়ে দিচ্ছে। নিচে কারা কথা বলছে? হিমুর গলা তারপরই একটি পুরুষের।
”চিলি চিকেন খেতে হলে চিনে দোকানে যেতে হবে।”
”আমরা যাব, বাবা?”
”নিশ্চয়।”
কৌতূহলে কণা জানলায় এসে নিচে তাকাল। পরে সে এই কৌতূহলটাকেই দায়ী করেছিল, অভিশাপ দিয়েছিল তার জীবনের প্রচণ্ডতম ধাক্কা এনে দেবার জন্য। কেন সে দমন করতে পারল না তার কৌতূহলকে, কয়েকটা সেকেন্ডের জন্যও। উপেক্ষা করতে পারত। কি দরকার ছিল নিচের দিকে তাকাবার? বহুবার এই প্রশ্ন সে নিজেকে করেছে। কপাল! নিয়তি! তা ছাড়া আর কি?
উঠোনের ধারে রকে হিমু ঝুঁকে হাত ধুচ্ছে। পাজামা পরা, গেঞ্জি গায়ে একটি লোক মগ থেকে তার হাতে জল ঢেলে দিচ্ছে। ওদের পিছনে ঘরের দরজায় পর্দা ঝোলানো, ভিতরে উজ্জ্বল আলো জ্বলছে. পর্দার তলা দিয়ে আলো এসে পড়েছে দুজনের পায়ের কাছে।
কণা থতোমতো। লোকটিকে অসম্ভব চেনা লাগল। হুবহু বাবার মতো। তার মাথার মধ্যে ঝাঁ ঝাঁ করে উঠল, পা দুটি কেঁপে উঠল। অসম্ভব, হতে পারে না।
”সবাই মিলে যাব, তবে এখন নয়। দেখেছ তো কি গোলমাল শুরু হয়েছে।”
বাবার মতোই গলার স্বর! কণা জানলার শিক আঁকড়ে ধরে মুখটা এগিয়ে দিল। আলোটাকে আড়াল করছে তারে মেলা একটা শাড়ি। লোকটার মুখ স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে না। কিন্তু শরীরের আকৃতি একই রকমের। মাথার চুলও ঝাঁকরা, পাশের দিকে সিঁথি করে পাট করা।
”হিমু পর্দাটা সরা তো।”
দু’হাতে ধরা মাজা বাসন। নিশ্চয় ইনিই হিমুর মা, কলঘরের দিক থেকে এল। হিমু পর্দাটা সরাতেই ঘরের আলো বাইরের রকে এসে ওদের তিনজনকেই স্পষ্ট করে দিল।
ওহ মা গো! আর্তনাদটা কণার বুক থেকে মাথায় উঠে গেল। থরথর কাঁপতে শুরু করল। ধীরে ধীরে অসাড় হয়ে আসছে শরীর। দেয়াল ধরে ধরে বাথরুম থেকে সে বেরিয়ে এল। আলো নেভালো। কাকিমার পাশে শুয়ে পড়ল।
কিছুক্ষণ পর সে ফিসফিস করে বলল, ”কাকিমা, হিমুর বাবার নাম কী?”
”তুষারবাবু, তোমার মত ওরাও, ওরাও সেনগুপ্ত, কেউ হয় নাকি?
কণার মনে হল, দাড়িওলা পাগড়ি পরা একজন স্টেনগান হাতে হঠাৎ লাফিয়ে এসে তার সামনে দাঁড়িয়েছে। সে চিৎকার করে ওঠার আগেই লোকটা ট্রিগার টিপল। এক দুই তিন…আট, বারো…পনেরো, বুলেট তার শরীরে ঢুকে যাচ্ছে।
সে বলল, ”না, কেউ হয় না।”
তিন
তুষার অফিসে পৌঁছেছিল দশ’টার আগেই। তিনতলায় অফিস, অনেকেই লিফটে ওঠে, সে সিঁড়ি ব্যবহার করে। আজও সে দেখে লিফটের জন্য লম্বা লাইন। তাকে দেখে লাইনে দাঁড়ানো সুভাষ এগিয়ে এল।
”তুষারদা একটু দরকার আছে আপনার সঙ্গে। একটা পরামর্শ নেব, অফিসেরই কাজের ব্যাপারে।”
দু’মাস আগে স্টোর্স বিভাগে যে চেয়ারে তুষার বসত, এখন সেটাতেই বসছে সুভাষ। বছর ত্রিশ বয়স, বউয়ের প্রথম বাচ্চচা হবে তাই বাপের বাড়িতে রয়েছে। সুভাষ শৌখিন, একটা নাটকের দলের সঙ্গে যুক্ত, ভারী উদাত্ত কণ্ঠস্বর। স্কুটারে অফিসে আসে, প্যান্টের বেল্টের কিনারে উপচানো চর্বি চোখে পড়ার মতো অবস্থায় এসেছে।
”অফিসের ব্যাপার?”
তুষার বিস্মিত এবং সতর্কও হল। আগস্ট মাসের উনত্রিশ তারিখে একটা চিঠি জেনারেল ম্যানেজারের কাছ থেকে তার টেবিলে এসেছিল। আগামী পয়লা সেপ্টেম্বর থেকে তাকে বদলি করা হল অ্যাকাউন্টস বিভাগে। তার পদের বা মাইনের কোনো হেরফের হবে না। তিনটি ঘর পরে অ্যাকাউন্টসে একটা লম্বা টেবিলের একধারে বসে তুষার এখন লেজার খাতায় যে কাজ করে সেটা মাধ্যমিক পাস পিয়োন প্রশান্তও পারবে। তার বদলি হয়ে যাওয়ার কথাটা বাড়িতে কাউকে বলেনি।
