”চিড়িয়াখানা, দুবার চেপেছি। এখান থেকে ধর্মতলা আর সেখান থেকে আবার।”
”কে কে গেছলে?”
কণা স্কেচ খাতাটা ওর হাত থেকে নিয়ে, ঝোলা থেকে পেনসিল বার করল। হিমুকে স্কেচ করবে আর সেজন্য ওকে বসিয়ে রাখতে গল্পে ব্যস্ত রাখা দরকার।
”আমি আর মা।”
”ব্যস, দুজন? বাবা?”
হিমু কাত হয়ে কণার কাজ দেখার চেষ্টা করছে। খাতাটা বন্ধ করে সে বলল, ”এখন নয়। তুমি যেমন ভাবে বসে কথা বলছিলে ঠিক সেইভাবে থাক, খানিকটা হয়ে গেলে তোমাকে নিশ্চয় দেখাব।”
”হিমু অপ্রতিভ হয়ে আগের মতো এক পা ঝুলিয়ে বসল। কৌতূহল আর উত্তেজনা এবার ওকে পেয়েছে। কণার মনে হল ছেলেটি শান্ত আর ঠান্ডা।
”হুঁ, আর কে গেছল?”
”আমি আর মা। বাবা যায়নি।”
”কেন?”
উত্তর না পেয়ে কণা মুখ তুলল। হিমু তার মুখের দিকে তাকিয়ে। রান্নাঘর থেকে কাকিমা চেঁচিয়ে বললেন, ”হিমু, দেখ তো তোর মা এলো কিনা। ট্রাম বাস সব বন্ধ, একা মেয়েমানুষ, হেঁটে ঠাকুরপুকুর থেকে অতটা পথ…এখনো যে কেন…।”
বারান্দার টানা রেলিং কাঠ দিয়ে ঢাকা তার উপর লোহার ফ্রেমে সার্সি বসানো। সার্সির একটা জায়গা কেটে জানলা, সেটা বন্ধই ছিল। হিমু পাল্লা খুলে নিচের দিকে একবার তাকিয়েই বলল, ”আসেনি।”
তক্তপোশে আগের মতো এক পা ঝুলিয়ে বসে হিমু অনুমোদনের জন্য তাকাল।
”হ্যাঁ এইভাবে থাক।”
কিছুক্ষণ কণা ওর মুখে সহিষ্ণুতা কমে যাচ্ছে দেখে শুরু করল। ”তোমার মা আছেন, বাবা আছেন, আর কে কে আছেন?”
উত্তর না পেয়ে সে তাকাল।
”আর কেউ নেই।”
”ঠাকুমা?”
”না।”
”মাসি, পিসি, মামা, কাকা…দাদা, বউদি…।”
হিমু হাসছে। কণার বলবার যেন মজা পেয়েছে।
‘নড়ো না নড়ো না…হ্যাঁ, তাহলে তুমি, মা আর বাবা, কেমন?”
”না, আমি আর মা।”
কণা চট করে তাকালো স্কেচ থেকে চোখ সরিয়ে। বিধবার ছেলে? কিন্তু বলল যে ‘বাবা যায়নি’। মারা গেলে কি ‘যায়নি’ বলতো? হয়তো যখন চিড়িয়াখানা গেছল বাবা বেঁচে ছিল।
”অ। তুমি আর মা।…মা অফিসে যায় আর তুমি?”
”স্কুলে যাই।”
”কখন যাও?”
”সকালে। আটটায় যাই, দুপুরে আসি। আচ্ছা, তোমার নাম কী?
”কণা।”
”তুমি কোথায় পড়ো?”
”কলেজে, সেখানে আঁকা শেখানো হয়।”
”তুমি আঁকা শিখছ? কণাকে মাথা নাড়তে দেখে বলল, ”আমাদেরও আঁকতে হয় ক্লাসে, রুমা আন্টি শেখায়…গাছের পাতা, পাখি ফুল…বইয়ে আঁকা আছে তাতে রং করতে হয়। দেখবে তুমি?”
”পরে।”
”দাঁড়াও আমি আসছি।”
হিমু ছুটে রান্নাঘরে গেল। ”জেঠুমণি চাবিটা দাও তো। ছবি দেখাব।”
”কাকে?”
”ওই যে ওকে।”
”ওকে’ কি? বলো দিদিকে। তোমার থেকে কত বড়ো না? দিদি বলবে। এখন ছবি নয়, পরে দেখিও।”
”না, তুমি চাবি দাও, আমি খুলে আবার ঠিক লাগিয়ে দেব।”
চাবি নিয়ে হিমু ছুটে বেরিয়ে গেল। কাকিমা রান্নাঘর থেকে বেরিয়ে এলেন।
”ছেলেটা একা একাই থাকে। মা বেরিয়ে যাবার সময় দরজায় তালা দিয়ে চাবিটা আমার কাছে রেখে যায়। ও স্কুল থেকে ফিরে আমার কাছেই থাকে। পরের ছেলে তো, চোখে চোখে আগলে রাখতে হয়, কিছু একটা হলে আমিই তো তখন দায়ী হব। বাড়ি থেকে বেরোতে দিই না, হারিয়ে টারিয়ে গেলে কি গাড়ি চাপা পড়লে…ছাদে বিকেলে একাই খেলা করে। কিন্তু তা কি আর ভালো লাগে, বড় হচ্ছে তো। রাস্তায় সমবয়সিরা খেলা করে, আমায় বলে জেঠিমণি একটুখানি যাই?’ শুনলে তো কষ্ট হয়, মায়াও লাগে দিই এক-আধদিন খেলতে।…সারাদিন ঘরে বন্দি থেকে থেকে ছেলেটা কেমন যেন হয়ে যাচ্ছে।”
”বয়স কত?”
”এই তো আট পেরিয়ে হিমু ন’য়ে পড়ল। ওরা ভাড়া এসেছে, আজ দশ বছর।”
”বাবা কি এখানে এসে মারা গেছেন?”
”কার বাবা!”
”হিমুর।”
কাকিমা কিছুক্ষণ অবাক হয়ে তাকিয়ে থেকে, মাথা নাড়লেন।
”হিমুর বাবা তো দিব্যি বেঁচে আছেন, তবে…এখানে তিনি থাকেন না।” কাকিমা কয়েক পা এগিয়ে এসে গলা নামিয়ে বললেন, ”হিমুর মা দ্বিতীয় পক্ষ। ভদ্রলোক প্রথম বউ নিয়ে থাকেন অন্য জায়গায়।”
”সে কি!” কণা ধাক্কা খেল।
ড্রইং বই হাতে হিমু হুড়মুড়িয়ে ঢুকল। হাঁফাচ্ছে।
”দরজায় ঠিক তালা দিয়েছ?”
”জেঠিমণি, মা এসে গেছে। আমিও তালা খুলছি আর মা’ও ঠিক তখন পিছনে..জানো জেঠিমণি,” হিমু হাত তুলে কাকিমাকে নিচু হতে ইশারা করল। তিনি মুখ নামিয়ে আনলেন। হিমু তার কানে কানে কিছু একটা বলল।
”ওহহ এই কথা তা অত চুপিচুপি বলার কী আছে, দিদি শুনলে তো কী হয়েছে?”
কণা কৌতূহলে তাকিয়ে রইল।
”হিমুর বাবা এসেছেন, আজ থাকবেন।”
আনন্দে ঝকঝক করছে হিমুর চোখ। মুখের উপর দিয়ে বয়ে যাচ্ছে খুশি। ছেলেটির বিষণ্ণ ভাব কেটে গেছে। বুকটা ওঠানামা করছে দ্রুত।
”বাবা দরজা পর্যন্ত মাকে পৌঁছে দিয়ে দোকানে গেছে, না না, বাজারে গেছে মুরগি যদি পায়।”
ড্রইং বইটা ওর হাতেই ধরা, সেটার কথা একদমই ভুলে গেছে। কণা হাত বাড়িয়ে নিল।
”তুমি এটা দেখো, আমি নিচে যাচ্ছি।”
হিমু উত্তরের অপেক্ষা না করেই বেরিয়ে দুড়দাড় শব্দ তুলে সিঁড়ি দিয়ে নেমে গেল।
কাকিমা শোবার ঘরে গেলেন বোধহয় হিমুর মা’র ফেরার খবরটা জানাতে। একটু সময় নিয়ে ফিরলেন কিছুক্ষণ টিভি দেখে।
”সত্যিই একটা মানুষ ছিল বটে! শেষকালে কিনা গুলি করে মেরে তবেই সরাতে হল! দেখি দেখি কেমন আঁকলে হিমুকে।”
স্কেচ খাতাটা নিয়ে কাকিমা তাকিয়ে রইলেন। মুখে কিছুটা বিভ্রান্তি নিয়ে বললেন, ”বেশ আঁকো তো তুমি। এটা কি এইরকমই থাকবে? মানে এইটেই পুরো আঁকা নাকি ওর ওপর আরও…হ্যাঁ। হিমুকে বোঝা যাচ্ছে ঠিকই, তবে থুতনিটি অত লম্বা তো নয়!”
