”যখন যেটা হয়, তবে ভাতই আমার পছন্দ।”
”কে রান্না করেন?”
”মা।…আমিও মাঝে মাঝে…।”
ছানুকাকা তাকে ঘরে এসে টিভি দেখার জন্য ডাকলেন। কণা ইতস্তত করল। শুধু তো দেখা নয়, তখন কথাও বলতে হবে, যেটা একদমই এখন তার ইচ্ছা করছে না। কিন্তু এখন অন্তত তার এদের কথামতো চলাই উচিত। সে ঘরে এল।
ছানুকাকা আর হিমু খাটে পা ঝুলিয়ে বসে। ঘরের আলো নেভান। কণাকে দেখে হিমু সরে জায়গা করে দিল। টিভিতে বিশেষ খবর পড়ছে একটি মেয়ে।
”ইন্দিরার ছেলে রাজীব প্রাইম মিনিস্টার হল।” ছানুকাকা একটু অবাক যেন। এতক্ষণ বোধহয় বিশ্বাস করেননি ইন্দিরা মৃত। ”রাষ্ট্রপতি ভবনে শপথ নেওয়া হয়ে গেছে পৌনে সাতটায়, সেটা দেখা হল না। সত্যিই তাহলে মারা গেছেন!”
কণাও অবাক। হঠাৎ-ই সময়টা জানতে ইচ্ছা করল তার। হাত তুলে ঘড়িটা দেখতে না পেয়ে কয়েক সেকেন্ড ভাবল। বাথরুমেই কি গা ধোয়ার সময় খুলে রেখেছে? তারপরই মনে পড়ল, চিৎপুরের কাছে রাস্তাটা অন্ধকার দেখে দেবুই বলেছিল, সোনা টোনা গায়ে থাকলে খুলে রাখতে। জায়গাটা ভালো নয়। গহনা সে পরে না। ঘড়িটা তার খুবই পছন্দের, এটা ছিনতাই হোক তা সে চায় না। তখন খুলে ঝোলার মধ্যে রেখেছিল। সেটা ড্রেসিং টেবিলের উপর রাখা। উঠে গিয়ে সে ঝোলাটা আনল।
ঘড়ির সঙ্গে সে স্কেচ খাতাটাও বার করল। বাইরে সদর দরজায় খুট খুট হতেই ছানুকাকা, ”কে” বলে হাঁক দিয়ে উঠে গেলেন। কণা খাতাটার কয়েকটা পাতা উল্টে, টিভির স্ক্রিনের আলোয় ভালোভাবে দেখতে না পারায় সেটা খাটেই রেখে দিল।
”আমি এটা দেখব?”
হিমু বড় বড় চোখে তার মুখের দিকে তাকিয়ে কণা, কণা খাতাটা এগিয়ে দিল।
”অন্ধকারে দেখবে কী করে?”
”বাইরে নিয়ে গিয়ে দেখব?”
কুণ্ঠিত অনুরোধ। কণা মাথা হেলালো। ছেলেটিকে মিষ্টি দেখতে, কণ্ঠস্বরও। ছানুকাকার সঙ্গে একটি লোক ঢুকল। পরনে লুঙ্গি আর হাওয়াই শার্ট, সম্ভবত বাড়িরই অন্য কোনো পরিবার থেকে।
”বসুন দত্তদা, বসুন। হিমু একটু ভিতর দিকে সরে যাও।”
”আমি বাইরে যাচ্ছি।”
খাতাটা নিয়ে হিমু বেরিয়ে গেল। কণাও বাইরে যাবার জন্য উঠে দাঁড়াল।
”তুমি বসো, তুমি বসো, কোনো অসুবিধা হবে না।”
”তা নয়, আমার ছোট্ট একটু কাজ রয়েছে, স্কেচগুলো যতটা পারি ফিনিশ করে রাখব।”
”টিভি দেখবে না?”
”এখন ইচ্ছে করছে না।”
রান্নাঘর থেকে ভাজা গরম মশলার চমৎকার গন্ধ আসছে। কণাকে রান্নাঘরের দরজায় দাঁড়াতে দেখে কাকিমা ব্যস্ত হলেন।
”রাতে তাড়াতাড়ি খাওয়ার অব্যেস?”
”একদমই না।”
”ধোঁকা করছি। বিকেলে ডাল বাটিয়ে রেখেছিলাম, খাও তো?”
”খুব খাই। তবে আমি আপনার একটা পোট্রেট করব।” উনি বুঝতে না পেরে তাকিয়ে রয়েছেন দেখে কণা আবার বলল, ”আপনার ছবি আঁকব।”
”আমার! সে কি!” লজ্জায় বিব্রত মুখটা ঘুরিয়ে রান্নায় তাকালেন।
”হ্যাঁ, খুব ইচ্ছে করছে। রাজি না হলে ধোঁকার কিন্তু নিন্দে করব। অবশ্য হাত আমার ভালো নয়, খুবই কাঁচা, তাহলেও সুন্দর মুখ কতটা খারাপ করে দিতে পারি, সেটাও তো জেনে রাখা দরকার।”
”আমার মুখ সুন্দর! হায় ভগবান।” সুখবোধের আভা ওঁর মুখে ছড়িয়ে গেছে। সেটা মুছে নিতে কয়েক সেকেন্ড সময় নিয়ে বললেন, ”তোমার চোখ নিশ্চই খারাপ হয়েছে, ডাক্তার দেখানো উচিত। আজ অনেক ধকল গেছে তোমার, আজ নয়।”
”রান্নাটান্না সেরে নিন, তারপর বসব।”
কণা তক্তপোশে এসে বসামাত্র হিমু স্কেচখাতার খোলা পাতায় আঙুল রেখে বলল, ”এগুলো কী?”
”বুঝতে পারছ না?”
স্কেচের দিকে কিছুক্ষণ গভীরভাবে তাকিয়ে সে চিন্তান্বিত মুখে মাথা নাড়ল।
”এটা একটা রাস্তা, লোকজন গাড়িঘোড়া যাচ্ছে। দূরে ধোঁয়া উঠছে।”
”ঘোড়া কোথায়?”
”নেই।”
”তাহলে যে বললে?”
”ওটা এমনি কথার কথা। আমরা তো অমন কতই বলি…পথঘাট…যখন পথের ধারে পুকুর কি দিঘি থাকত বা ঘোড়ার গাড়ি চলত তখন কথাগুলো তৈরি হয়েছিল আর ওগুলো মুখে মুখে চলে আসছে, ঠাকুরদা বলতেন, তার কাছ থেকে বাবা, বাবার কাছ থেকে আমি…।”
তাকিয়ে আছে হিমু। ওর মুখটি কণাকে আকৃষ্ট করছে। ভাব প্রকাশের জন্য অত্যন্ত উন্মুখ, অধীর। জলের মতো আবেগ সরে সরে যাচ্ছে মসৃণ পাতলা চামড়ার উপর দিয়ে। প্রশস্ত কপালে হালকা কুঞ্চন পড়েছে। মুখ গতিময়। স্বচ্ছ টলটলে চোখের পিছনে লাইট হাউসের রশ্মির মতো একটা তীক্ষ্ন উজ্জ্বলতা। কিছুক্ষণ পর পর ঝলসে উঠছে। অথচ অচঞ্চল। অথচ উধাও হবার জন্য চোখের মণিদুটি ব্যস্ত। অথচ চোখের দীর্ঘ পলকে আকাশে ভাসা পাখির সারল্য ছড়ানো।
একটা শরীর, অবয়ব, আকৃতি, যার চেনা ব্যাপারগুলোর সবই হাজির। চোখ, চুল, কান, ঠোঁট যথাযথই রয়েছে কিন্তু সবগুলোই আলাদা হয়ে যাচ্ছে ভিতর থেকে হিমুর নিজেকে বার করে আনার ভঙ্গিতে। সবটাই ওর নিজস্ব, কণা কখনও এমনটি আগে দেখেনি।
ওই মুখটি ধীরে ধীরে তাকে টেনে নিয়ে যাচ্ছে এই বালকের দিকে। অদ্ভুত রহস্যের মতো অথচ কিছুই রহস্য নেই, এমন একটা বোধ থেকে কণা বলল, ”চোখে যা দেখি জিনিসগুলো কি ঠিক তাই-ই?”
হিমু বুঝতে না পেরে তাকিয়ে রইল।
”এটা কি বুঝতে অসুবিধে হচ্ছে?”
কণা আগুনে-জ্বালা ট্রামের স্কেচটায় আঙুল রাখল। হিমুর মুখে হাসি খেলে গেল। সে মাথাটা অনেকখানি হেলিয়ে বলল, ”মা’র সঙ্গে চেপেছি।”
”কোথায় গেছলে?”
