হিমু একবার মাত্র কণার দিকে তাকিয়ে ঘর থেকে বেরিয়ে গেল।
”বাড়ি থেকে কখন বেরিয়েছ?”
”প্রায় ন’টা।”
”বাথরুমটা দেখিয়ে দিচ্ছি এসো।”
কণা বাথরুম থেকেই শুনতে পেল কেউ একজন এসেছে। ”আরে কি ব্যাপার দেবু যে, থাক থাক…” শুনে সে বুঝল ছানুকাকু। ”যা ব্যাপার আজ হল, যা ঘটে গেল অবিশ্বাস্য, এমন পাওয়ারফুল লেডি, তিনিই কিনা…দুপুরেই আমি বাড়ি চলে এসেছি দোকান বন্ধ করে…চা ফুরিয়ে গেছে তাই কিনতে বেরিয়েছিলাম, সব বন্ধ, শেষে কুমোরটুলিতে এক বন্ধুর বাড়ি থেকে খানিকটা চেয়ে আনলাম। সকাল পর্যন্ত চলে যাবে….একটু করে দাও তো, অনেকক্ষণ খাইনি।”
বাথরুমের লাগোয়া রান্নাঘর। কণা শুনতে পেল, ”মিনিটে মিনিটে চা না হলেই মাথা খারাপ, দেবু বস তোরা, একটু কিছু মুখে দিয়ে যাবি।”
কণার যে অস্বস্তিটা এতক্ষণ ছিল, সেটা সহজ হয়ে আসছে। ছানুকাকার স্বর এবং বলার ভঙ্গি বন্ধুত্বমূলক। লোক কম, জায়গাও আছে, পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন, সব থেকে বড় কথা দুটি মানুষই গোমড়া নয়। সহজ গেরস্ত এবং সচ্ছল। অচেনা মানুষকে আপন করে নিতে পারে।
এই গুণটা তার মায়ের একদমই নেই, বোধহয় স্কুলে পড়াতে পড়াতে এটা হয়েছে। সে নিজেও দেখেছে শুধু মেয়েরাই নয়, টিচাররাও মাকে ভয় করে, সমীহ করে, শ্রদ্ধাও করে। হেড মিস্ট্রেসদের কঠোর পক্ষপাতহীন হতেই হয়। বাবা প্রচুর কথা বলে কিন্তু বাড়িটা ভরিয়ে রাখার মতো যথেষ্ট নয়। অবশ্য সারাদিনে কতটুকুই বা বাড়িতে থাকে!
কণা যেমনটি ভেবে নিয়েছিল ছানুকাকা একদমই সেইরকম দেখতে নন। বেঁটে কুচকুচে কালো এবং দু পাশ থেকে চুল টেনে এনে টাকের উপর বিছিয়ে দেওয়া। সোনালি সরু ধাতুর ফ্রেমের চশমা। বয়স বাবারই মতো, পঞ্চাশের কাছাকাছি। বাথরুম থেকে কণা বেরিয়ে আসতেই তিনি অবাক হয়ে তাকালেন।
দেবু নড়েচড়ে বসল। ”এ হল কণা আমাদের সঙ্গেই…কলেজে আমরা এক ক্লাসেই…হিন্দমোটরে থাকে, ট্রেন বন্ধ তাই…এখানে আনলাম।” টেলিগ্রামে খবর জানাবার মতো হল ওর কথাগুলো।
”ফাইন ফাইন, থেকে যাও রাতে।” ছানুকাকা উৎসাহে দাঁড়িয়ে পড়লেন। ”কোনো অসুবিধে হবে না মানে আমাদের হবে না।”
প্রণাম করবে কি করবে না ইতস্তত করছিল কণা। কল্যাণ চোখের ইশারায় করতে বলল।
”থাক থাক এসব তো…নাম কী? ওহহ কণা…পুরো নাম কী?
”কণা দাশগুপ্ত।”
বদ্যি!” ছানুকাকা খুবই অপ্রতিভ হলেন। কাউকে উদ্দেশ্য না করে বললেন, ”কেন এরকম হল বল তো? কে মারল? কারা মারল?”
প্রশ্নগুলো কে তুলে নেবে? তিনজনেই নিজেদের মধ্যে একবার তাকাল। বাড়িতে নিশ্চিন্ত পরিবেশে অনুৎকণ্ঠায় থাকা মানুষদের আজকের ঘটনা নিয়ে কথা বলার জন্য যত শারীরিক ও মানসিক উৎসাহ রয়েছে তার দশ ভাগের একভাগও, উদ্বেগ ও উত্তেজনা নিয়ে হাঁটাহাঁটি করে ক্লান্ত, বিশ্রামের ও নিরাপত্তার জন্য ব্যস্ত এই তিনজনের মধ্যে এখন নেই। কল্যাণই মুখ খুলল, ”বলা তো খুব শক্ত, কাল সকালে খবরের কাগজ না পাওয়া পর্যন্ত আসল ব্যাপার জানা যাবে না।”
কোথায় দিল্লি আর কোথায় আমরা! এখানে তো সব আন্দাজে ধরে নেওয়া হচ্ছে। রেডিয়ো, টিভি তো গর্ভমেন্টের হাতে, যতটুকু গর্ভমেন্ট জানাতে চায় ততটুকুই জানাবে, তার উপর ভিত্তি করে কথা বলে লাভ কী!” দেবু টেনেটেনে তার স্বরে শ্রান্ত ভঙ্গি আরোপ করে এক ধরনের বিজ্ঞতা নিয়ে এল, যার ফলে কথাগুলো যুক্তিবান মনে হল।
”তা ঠিক, তা ঠিক। তবে উগ্রপন্থীরা যখন মেরেছে বুঝতে হবে ওই অমৃতসর স্বর্ণমন্দিরে সোলজার ঢুকিয়ে উনি যা করেছেন হয়তো এটা তারই প্রতিক্রিয়া।”
ওরা কেউ কথা বলল না।
”তোমরা ঘরে এসে বসো না, টিভি আছে।”
”না কাকা, তাড়াতাড়ি হস্টেলে যেতে হবে কল্যাণকে নিয়ে, এখন বসে বসে গীতাপাঠ আর ভজন আর শোকভাষণ শোনা, অসম্ভব।”
রেকাবিতে লুচি আর আলু ছেঁচকি নিয়ে কাকিমা এলেন। বিনা ভণিতায় তিনজনে সেগুলো হাত বাড়িয়ে নিল।
”হিমু, লুচি খাবে তো এসো।” কাকিমা শোবার ঘরের দরজায় দাঁড়িয়ে বললেন।
”এখানে দিয়ে দাও।” ঘরের ভিতর থেকে আদেশের মতো উত্তর এল।
”ছেলেটা কে?” দেবু জানতে চাইল ছানুকাকার কাছে।
”নিচে থাকে। ওর মা বেহালা ছাড়িয়ে সেই ঠাকুরপুকুরে একটা অফিসে কাজ করে। আজ যা অবস্থা, অতদূর থেকে হেঁটে আসা…এখন তো ফেরেনি?” ছানুকাকা চিন্তিতমুখে লুচির রেকাবির জন্য হাত বাড়িয়ে স্ত্রীকে জিজ্ঞাস করলেন, ”হিমুর মা তো ছ’টা সাড়ে ছ’টার মধ্যেই এসে যায়।”
”সে তো অফিস খোলা থাকলে। আজ কি আর কোথাও পুরো অফিস হয়েছে?”
”ভাবনা ধরিয়ে দিল। হেঁটে ঠাকুরপুকুর থেকে একটি মেয়ের পক্ষে আসা!”
কণার মনে পড়ল বাবাকে। রেললাইন ধরে যারা হেঁটে যাচ্ছে তাদের মধ্যে বাবা ছিল কি? কলকাতায় থাকলে বাবা রাতটা কোথায় কাটাবে? তার মনে হল, বাবাও এখন ঠিক এই চিন্তাই করছে তার জন্য।
দেবু আর কল্যাণ চা খেয়ে চলে গেল। দরজা পর্যন্ত গিয়ে কণা জিজ্ঞাসা করেছিল, ”কাল নিশ্চয় কলেজ বন্ধ থাকবে, পরশু তোরা আসছিস?”
”এখন সাতদিন দেশে কোনো কাজকম্ম হবে না। বরং এই সময়টায় পরীক্ষার স্কেচগুলো করে নেব। তোর হয়েছে?”
”কয়েকটা হয়েছে।”
”কাল ভোরে আসব? নাকি নিজেই চলে যেতে পারবি? ছানুকাকাকে বলিস পনেরো নম্বর বাসে তুলে দেবে।”
রান্নাঘর থেকে কাকিমা জানতে চাইলেন রাতে সে ভাত না রুটি খায়।
