চিৎপুর ধরে নিমতলা স্ট্রিট থেকে আহিরীটোলা হয়ে গঙ্গার দিকে যেতে ডানদিকে প্রথম রাস্তাটি ছেড়ে ওরা তেলেভাজার দোকানটা ঘুরে দ্বিতীয় রাস্তায় ঢুকল। টিনের চালার দুটো বাড়ি আর গম ভাঙার দোকানের পর রাস্তার আলোর থামের গায়েই ছোট লোহার গেটওলা পুরনো একটা বাড়ি। খড়খড়ির জানালা, প্রতি জানালার মাথায় ফুল লতাপাতার নকশা সিমেন্টের রিলিফে, ছাদের পাঁচিলের মাঝখানটা ঢেউ খেলিয়ে তোলা, তার মাথায় পুতুলের দুটো মূর্তি। বাড়িটায় দীর্ঘকাল কলি পড়েনি।
গেট থেকে তিন ধাপ উঠে দুপাশে দুটো ঘর, সোজা গেলে উঠোন, তার তিনদিকে রক। উঠোনে আবর্জনা ছড়ানো। শ্যাওলায় আটকে আছে পেঁয়াজের খোসা আর কাগজের টুকরো। উঠোনের এক কোণে চৌবাচ্চচা আর কল। উপর থেকে নর্দমার পাইপ উঠোনের আর একধারে দেয়াল দিয়ে নেমে এসেছে। তার তলার দিকে ভাঙা, তাই জল যখন পড়ে ছিটিয়ে যায়।
একতলার রাস্তার দিকের দুটো ঘর, এক ওষুধ কোম্পানি ভাড়া নিয়ে গুদাম করেছে। বিকেলের পরই ঘরে তালা দিয়ে চলে যায়। গেট থেকে উঠে পাথর বসানো মেঝের উপর দিয়ে এগিয়ে উঠোনের রকে পড়ার আগেই বাঁ দিকে দোতলায় যাবার সিঁড়ি। দেয়ালের ইঁট বেরিয়ে রয়েছে। রোদের অভাবে এবং আবর্জনায় একটা গন্ধ তৈরি হয়ে আছে। সেটায় অভ্যস্ত না হওয়া পর্যন্ত গা গুলিয়ে ওঠে। একটা বেড়াল সিঁড়ির মুখে গুটিগুটি বসে চোখ বন্ধ করে। ঝোলানো বাল্ব থেকে যে আলো পাওয়া যাচ্ছে তাতে উঁচু সিলিংয়ে কাঠের মোটাসোটা কড়ি-বরগায় উইয়ের আবাস বুঝতে পারা যায়। তিনতলার কার্নিশ থেকে হঠাৎ একটা পায়রা বকম বকম করে চুপ করে গেল। রকের একদিকটায় কাঠের পার্টিশান, তার পিছনের ঘরে রেডিয়ো থেকে সুর করে ধর্মীয় কিছু পাঠ ভেসে আসছে।
ওরা দোতলায় উঠল। সিঁড়িটা তিনতলায় যাবার জন্য যেখানে ঘুরেছে সেখানে মুখোমুখি দুটো দরজা।
”তোরা দাঁড়া, আমি গিয়ে ব্যাপারটা আগে বলি।” কণার মনে হল দেবুকে একটু যেন ঘাবড়ানো দেখাচ্ছে।
”তোদের হস্টেলে গিয়ে থাকা যায় না? কণা প্রায় মরিয়া হয়ে বলল।
”ওই ছেলেদের গাদায় একটা মেয়ে!”
”সবাইকেই তো চিনি, ভয়টা কিসের?”
”চুপ করে দাঁড়া তো।” দেবু ধমকে উঠল। ”একটা ছেলেও তাহলে সারা রাত ঘুমোতে পারবে না।”
খুট খুট কড়া নেড়ে দেবু ইশারায় ওদের পাশের দেয়াল ঘেঁষে দাঁড়াতে বলল।
”কে?” স্ত্রীলোকের গলা ভিতর থেকে।
”কাকিমা আমি, দেবু।”
দরজার পাল্লা প্রথমে অল্প খুলল। আবার ”কে?” বলেই পুরো খুলল।
”ওম্মা! খবর কী, ভেতরে এস।”
গলার স্বরটা মিষ্টি এবং আন্তরিক। কণা আশ্বস্ত হল। দরজা বন্ধ হবার পর কল্যাণ বলল, ”বাড়িটা কতদিনের বল তো?”
”বঙ্কিমের আমলের।”
”অত নয়, বঙ্গভঙ্গের দু-চার বছর আগে পরে হবে। যখন তৈরি করে বাড়িওলার তখন টাকা ছিল। মেঝের পাথর দেখেছিস?”
”মার্বেল?”
”ধেৎ, এগুলো মার্বেল নয়। কোটা পাথর, কম দামি। তাহলেও…দরজাটা সেগুনের।”
”তুই কাঠ চিনিস?”
কল্যাণ প্রশ্নটা এড়িয়ে বলল, ”কাল সক্কালেই বাড়ি চলে যাবি, বাবা-মা’র তো চিন্তায় সারারাত ঘুম হবে না।”
”বাবাও তো কলকাতায়, অফিসে। নিশ্চয় ফিরতে পারেনি। এখন কোথায় যে আছে কে জানে।”
”অফিসের টেবলে শুয়ে পড়বেন কিংবা চেনাজানা কারুর বাড়িতে। তুই যে কলকাতায় সেটা কি জানেন?”
”হ্যাঁ। কলেজে যাব এটা তো…।”
দরজা খুলে দেবু বলল, ”আয়।”
ভিতরে ঢুকেই কণা দেখল, প্রায় মায়ের বয়সি কিন্তু মায়ের থেকে অনেক সুন্দর, আটপৌরে ভাবে পরা উজ্জ্বল সবুজ পাড় হালকা মেরুন তাঁতের শাড়ি, গড়ন দোহারা, মুখাকৃতি পানের মতো, কপালে বড় সিঁদুর টিপ, মাজা গায়ের রং, হাতে শাঁখা-রুলি, কয়েক গাছা চুড়ি সম্ভবত সোনার, আলগা খোঁপা। ঠোঁট দুটিতে হাসি এবং কৌতূহল নিয়ে একজন দাঁড়িয়ে।
”আমার কাকিমা, আর এই হল…”
কল্যাণের আগে কণা প্রণাম করল। পায়ে টাটকা আলতা এবং আঙুলের গড়ন তার ভালো লাগল।
”বাইরে দাঁড় করিয়ে রেখে জিজ্ঞেস করতে আসা কেন, একেবারেই তো ভেতরে নিয়ে চলে আসবি। বোসো তোমরা।…এমন একটা বিপদের সময়ে মানুষ এলে তাকে কি বলব না থাকতে দেব না।”
ঘেরা বারান্দা। দেয়াল ঘেঁষে সরু একটা তক্তপোশ তাতে পাতলা তোষকের উপর ফুলকাটা চাদর আর দুটো তাকিয়া। কথাগুলো শুনেই কণার শরীর চাইল এখুনি বিছানাটায় লুটিয়ে পড়তে। রায় অ্যান্ড ঘোষ থেকে বেরুনোর পর শুধুই হেঁটেছে, এখনও পর্যন্ত একবারও বসার সুযোগ পায়নি।
”ঘরে এসো, কাপড় দিচ্ছি বদলে নাও।”
বাধ্যের মতো কণা ঘরের দিকে এগুলো। তার এমন ঝিমুনি এসেছে যে দেবু বা কল্যাণের দিকে একবার তাকাতেও পারল না।
দুই
স্ট্যান্ডে টিভি সেট, তিনজনের মতো শোবার খাট, একটা স্টিলের আর একটা কাঠের আলমারি যার উপরের পাল্লা কাচের, দাঁড়ানো একটা আলনা, আয়না লাগানো ড্রেসিং টেবল। এতৎসত্ত্বেও ঘরটায় যথেষ্ট জায়গা রয়েছে নড়াচড়ার। আলনায় ভাঁজকরা শাড়ি সাজানো। কিন্তু তিনি স্টিলের আলমারি থেকে ধোবাবাড়ির কাচা একটা ছাপাশাড়ি বার করে দিলেন।
”হিমু, তুমি এখন একটু বাইরে যাও।”
”কেন, দেখব না?”
”একটু পরে, দিদির কাপড় ছাড়া হলে এসো।”
কণা লক্ষ্য করেনি খাটের এক কোণে দুই হাঁটু জড়িয়ে, দেয়ালে ঠেস দিয়ে একটি বালক বসে। টিভি চালু রয়েছে কিন্তু শব্দ এত কমানো যে প্রায় অস্ফুট। দেবু বলেছিল, এরা নিঃসন্তান, তাহলে এ কে?
