”কণা ঠিক জানিস, ট্রেন চলছে না?”
”এতক্ষণ তো ওখানে থেকে ফিরে এলাম।”
”কোথায় যাচ্ছিলি?”
”কোথাও না, তোদের জন্যই দাঁড়িয়েছিলাম।”
”এখন রসিকতার সময়? চারদিক তাকিয়ে দেখেছিস মানুষ সব শোকে ভাসতে ভাসতে চলেছে।”
”দেবু, আজ তোর ওখানেই থাকব।”
পাথুরিয়াঘাটায় কলেজের হস্টেলে দেবু থাকে। কল্যাণ বহুবার সেখানে রাত্রিবাস করেছে। রাতে না ফিরলে বাড়ির লোক তার জন্য ব্যস্ত হয় না। টানা এগারো দিনও খবর না দিয়ে সে বাড়ি ফেরেনি।
”কণা, কোথায় যাবি?” দেবু জানতে চাইল।
”কলকাতায় আমার কেউ নেই রে, কোথায় যাব যে বুঝতে পারছি না।” কণা ভেঙে পড়ার মতো অবস্থায় যে এসে গেছে গলার স্বরে দুজনে তা বুঝতে পারল।
”কলেজের কত ছেলেমেয়ের বাড়ি রয়েছে, তোর আবার ভাবনা কী? দেবু, গৌরী কোথায় থাকে রে, ওখানে কণাকে পৌঁছে দিলে তো হয়।”
বাড়ি চিনি না। বেলগাছিয়া না পাতিপুকুর কোথায় যেন থাকে।”
”চিনে ফিনে রাখবি তো। সুললিতের সঙ্গে এখন দেখা হলে ভালো হত, অন্তত সাঁইত্রিশটা ঠিকানা ও বলে দিত।”
মন্থরগতিতে একটা পুলিশ ভ্যান কলকাতার দিক থেকে আসছে ব্রিজ দিয়ে। ওরা কথা বন্ধ রেখে তাকিয়ে রইল। ভ্যানের মধ্যে সাত আটজন খাকি পোশাকের পুলিশ রাইফেল নিয়ে।
”অল ক্লিয়ার, গোলমাল থেমে গেছে। এবার তাহলে ট্রেনও চলবে।” দেবু আশ্বাস দেখিয়ে কণার দিকে তাকাল।
”চল তাহলে, দেখি গিয়ে।”
ট্রেন ফেল যদি হয়, এমন ধরনের উৎকণ্ঠা নিয়ে চেনা দুজনকে পিছনে রেখে স্টেশনের দিকে এগোল। তার হাঁটা দেখে একটা লোক সচকিত হয়ে উঠে বলে ফেলল, ট্রেন চলছে নাকি?”
তিনজন দশ মিনিটের মধ্যেই স্টেশন থেকে বেরিয়ে এল। দুজন সাইকেল আরোহী ওদের সামনে দিয়ে কলকাতার দিকে চলে গেল, কিছু পরে একটা মোটরও।
”তাহলে রতনের ওখানেই কণাকে পৌঁছেদি।” কল্যাণ বলল দেবুর অনুমোদন চেয়ে।
”রতন! তাই চল, একবার গিয়েছিলাম, খুঁজে নিতে পারব।”
”কত দূরে, আমি কিন্তু বেশি হাঁটতে পারব না।”
”কাছেই জোড়াসাঁকোয়। মিনিট দশ-পনেরো আমাদের হস্টেল থেকে বেশি দূর নয়।”
রতনের বাড়ি খুঁজে বার করতে সময় খরচ হল না। বড় রাস্তা থেকে গলি দিয়ে পঞ্চাশ মিটার ঢুকেই, টানা বারান্দাওলা, তিনতলা বাড়ি। রাস্তার উপরই দরজা। দেবু কড়া নাড়ল।
বাড়ির ভিতর থেকে চিৎকারের আওয়াজ আসছে। ওরা অস্বস্তিবোধ করল। মনে হচ্ছে ঝগড়া করছে কয়েকজন স্ত্রী-পুরুষ। দেবু এবার জোরে কড়া নাড়ল। দরজা খুলল এক বুড়ি। চিৎকারের ঝাপটা এল তার পিছন থেকে।
”রতন আছে?”
ঝগড়ার দমকে কিছু কিছু শব্দ উড়ে আসছে। দুটি মেয়ে গলায়-‘শুওরের বাচ্চচা’, ‘খানকির বাচ্চচা’, ‘মর মর, কুড়িকুষ্ঠো হোক তোর।’ এইসব শুনে ওরা দমে গেল।
”একটু আগে বেরিয়ে গেল।”
”ফিরবে কি এখন?”
”তা জানি না। ঝগড়াঝাঁটি হলে বেরিয়ে যায়, কখন ফিরবে ঠিক নেই। কিছু বলতে হবে?”
”বলবেন কলেজ থেকে দেবু কল্যাণ আর কণা এসেছিল। ট্রেন বন্ধ থাকায় কণা, এই যে মেয়েটি, খুব বিপদে পড়ে শুধু রাতটুকু থাকার জন্য এসেছে।”
বুড়ি নিষেধ জানাবার ভঙ্গিতে হাত নেড়ে গলা নামিয়ে বলল, ”এ বাড়িতে নয়। শুনতে পাচ্ছ না, কী চলছে ভেতরে, মা-মেয়ের ঝগড়া, প্রায়ই হয়। দাদাবাবু তাই তো বেরিয়ে গেছে।”
ভিতর থেকে আবার একটা দমক এল।
”বেশ করব টো টো করব, যার তার সঙ্গেই ঘুরব। বেরিয়ে যাব এ বাড়ি থেকে, বেশ্যা হব।”
”তাই যা, তাই যা, আছিস কেন এ বাড়িতে।”
এরপর একটি পুরুষের গর্জন এবং মারের শব্দ শোনা গেল।
”বাপ পেটাচ্ছে মেয়েকে। বিয়ে হচ্ছে না তো, বয়সও হয়ে গেছে। তোমরা বাবা অন্যত্র কোথাও দেখো।”
দরজা বন্ধ হয়ে গেল। বিষণ্ণমনে ওরা ফিরে চলল।
”এই বাড়িতে থেকে ছবি আঁকা, অ্যাটির্স্ট হওয়া!…রতনকে দেখে কিন্তু কোনো ধারণাই করা যায় না।” কল্যাণ নিস্পৃহস্বরে বলল। দুজনের কেউ মন্তব্য করল না।
পথের আলো জ্বলছে। কলকাতা এখন স্বাভাবিক হয়ে গেছে। চিত্তরঞ্জন অ্যাভিনু দিয়ে মোটর, লরি, স্কুটার, রিকশ চলছে। তবে বাস, মিনিবাস নেই। রাস্তার এক জায়গায় ভাঙা ইঁটের টুকরো আর গুঁড়ো কাচ ছড়ানো। মোড়ে রাইফেল নিয়ে পুলিশ। বড় দোকানগুলো বন্ধই রয়েছে।
”চা খাব রে। আর পারছি না।”
একটা ভুজিওলার দোকানের তলায় রাস্তা থেকে এক হাত নিচে চায়ের দোকান।
”খিদেও পেয়েছে।” কণা ঝুলি থেকে ব্যাগ বার করে বলল, ”মুড়ি-বাদাম খাব, তোরা?”
”আমাদেরও তাই-ই, তেল যেন না দেয় আর আস্ত কাঁচালঙ্কা।”
কণা এগিয়ে গেল। যখন সে ভুজিওলার সঙ্গে কথা বলছে তখন কল্যাণ বলল, ”কী করা যায় বল তো? শঙ্কর আর সত্যপ্রিয়র বাড়িতে একবার চেষ্টা করা যায়।”
দেবু মাথা নাড়ল অমত জানিয়ে। ”আর কোথাও গিয়ে দরকার নেই। কে জানে কার বাড়িতে কী প্রব্লেম রয়েছে, এসব অনিশ্চিত ব্যাপার, দেখলিই তো। আমার পিসিমার দেওর, আমরা ডাকি ছানুকাকা, কাছেই নাথের বাগানে থাকেন, সংসারে কোনো ঝামেলা নেই, হাতিবাগানে বাসনের দোকান আছে-শুধু স্বামী-স্ত্রী, ওখানেই বরং যাই। মনে হচ্ছে হয়ে যাবে।”
কণার হাত থেকে ঠোঙা নেবার সময় দেবু প্রস্তাবটা দিল। কল্যাণ বলল, ”সেই ভালো, সন্ধেও হয়ে এল আর কোথায় ঘোরাঘুরি করবি।”
”একেবারেই আমরা অপরিচিত।” কণা আড়ষ্টতা বোধ করছে। কিন্তু সে জানে এসব নিরর্থক কথা। এখন বাছাবাছির প্রশ্নই ওঠে না রাতটুকু থাকার মতো নিরাপদ একটা জায়গা তার এখন চাই।
