”আপনি কোথায় থাকবেন?”
যুবকটি দৃশ্যতই খুশি হল কথাটা শুনে। তার সম্পর্কে একটি মেয়ে, যে নিকটবয়সি এবং মাথায় প্রায় সমান চলনসই, সুশ্রী এবং ভরাট স্বাস্থ্য, কণার মনে হল যুবকটি বোধহয় প্রণয়প্রার্থী, সুতরাং এমন বিপন্ন পরিস্থিতিতে মেয়েটি তার জন্য উদ্বিগ্ন হওয়ায় সে খুশিই হতে পারে।
”আমার জন্য আপনাকে ভাবতে হবে না। রাস্তাঘাটে যেখানে হোক…কত হাজার হাজার লোক যে কলকাতার ফুটপাথে রোজ রাত কাটাচ্ছে…আপনাকে নিয়েই চিন্তা। কলকাতায় এত রকমের বাজে লোক আছে, একা মেয়ের পক্ষে রাত কাটানোটা, বিশেষ করে এইরকম ডিস্টার্বেন্সের সময়…বিপদে পড়লে একটা লোকও এগিয়ে আসবে না। দেখলেন তো লোকটাকে যখন মারছিল কেউ একজনও তাকে রেসকু করতে এগোল না।”
”অসিতদার বাড়ি কত দূরে, কলকাতার কিছুই আমি চিনি না।”
”বড় জোর আধঘণ্টার রাস্তা, সিমলেয়।”
কণার পাশে দাঁড়িয়েই ওরা কথা বলছে। সে মাঝেমাঝে দুজনের দিকে তাকাচ্ছে, আবার চোখ সরিয়ে লোকজন দেখছে। ওরা বলছে ওদের নিজেদের কথা, তাতে অংশ নেওয়ার কোনো সুযোগই তার নেই। তবু একটা আশা তার মনে জেগেছিল, হয়তো মেয়েটি তাকেও জড়িয়ে নেবে রাতে থাকার সমস্যার সঙ্গে। বোঝাই তো যাচ্ছে সে-ও একই বিপদে। এক্ষেত্রে বিপদটা ভাগ করে নেওয়াই তো উচিত। কিন্তু তাকে বাদ দিয়েই কথাবার্তা হচ্ছে।
”কিন্তু ধরুন যদি কোনো কারণে অসিতদার ওখানে থাকা না হয়…হয়তো কারুর খুব অসুখ কিংবা আমার মতই কোনো নিকট আত্মীয় এসে পড়েছে…”
”নাঃ আপনাকে নিয়ে আর পারা গেল না। বেশ, তখন আবার আপনাকে হাওড়া স্টেশনে পৌঁছে দিয়ে যাব, তারপর আপনি নিজেই ডিসিশান নেবেন।”
যুবকটি ছদ্ম ঝাঁঝ মাখিয়ে অভিমানে আহতস্বরে বলল, ”না না, মানে…আপনিই তখন অপ্রস্তুতে পড়ে যাবেন।”
”তাই যাব, আমার ব্যাপার, চলুন তো।”
কণা মুখ ফিরিয়ে রেললাইন বরাবর পশ্চিমে তাকিয়ে ছিল। এবার দক্ষিণে অন্য প্ল্যাটফর্মে ধৈর্য আর হতাশার প্রান্তে পৌঁছনো মুখগুলোর দিকে তাকাল। কিন্তু চোখের কোণ দিয়ে সে নজর করল, যেতে যেতে থমকে দাঁড়ালো মেয়েটি। বার দুই পিছনে তাকিয়ে যুবকটির সঙ্গে কথা বলে এবার তার দিকেই আসছে। কণার মনে আশা জাগল।
”কিছু মনে কোরো না ভাই। বুঝতেই পেরেছ আমার সঙ্গেই ভালো পরিচয় নেই, অন্য সেকশনে কাজ করেন ভদ্রলোক, শুধু সমরেশবাবুর কথাতেই যাচ্ছি, নয়তো তোমাকেও আসতে বলতাম।”
”না না আপনি ওসব নিয়ে ভাববেন না। বুঝতেই পারছি আপনার অসুবিধেটা।”
”তুমি তাহলে কী করবে এখন, কলকাতায় কোনো বন্ধু বা আত্মীয়স্বজন নেই?”
”আছে।”
মেয়েটির মুখে স্বস্তি ছড়িয়ে পড়ল।
”তাহলে আর দেরি করো না, চলে যাও। কলকাতায় আত্মীয়-বন্ধু থাকাটা যে কত দরকার এবার তা বুঝলাম।”
চলে যাবার পর কণার মনে হল, ওর নামটা আজও জানা হয়নি। কাউকে নাম জিজ্ঞাসা করতে তার সঙ্কোচ হয়।
‘আছে’ তো বললাম কিন্তু কে আছে?
কণা পায়ে পায়ে স্টেশনের চত্বর থেকে বেরিয়ে এল। ফাঁকা ট্যাক্সি স্ট্যান্ড এবং স্টিমার ঘাট। রাস্তার ওপারে গঙ্গার দিকটা নোংরা, ফুটপাথ খাবারের দোকানের দখলে। হাওড়া ব্রিজের রুপোলি রঙে সূর্যকিরণ আর ততটা জ্বলজ্বলে লাগছে না। গঙ্গার পুবের বাড়িগুলোয় বিবর্ণ স্যাঁতসেঁতে ভাব ফুটে উঠেছে। হেমন্তের বেলা পড়ে আসছে। এখন ইন্দিরা গান্ধী, কোথায়, কী অবস্থায়, দিল্লিতে কী ঘটছে এখন? এবার কে প্রধানমন্ত্রী হবে, এবার আমি কী করব, এখন যাব কোথায়?
কণা বাস টার্মিনাসে এল। এখনও দলে দলে মানুষ স্টেশনের দিকে আসছে। কলকাতায় কোথাও তার যাবার জায়গা নেই, একটা রাত থাকার মতো আশ্রয় নেই। মায়ের আত্মীয়স্বজনরা, যাদের সে চেনে, সবাই কলকাতার বাইরে থাকে। মেজকাকা বাড়ি করে রয়েছে লেকটাউনে, তার সঙ্গে এখন তাদের কোনো সম্পর্কই নেই। ঠাকুমাকে নিয়ে ছোটকাকা রয়েছে বেলঘরিয়ায়, কণা সে বাড়িটা চেনে। কিন্তু এখন…এখান থেকে হেঁটে…তার শরীর ক্লান্তিতে ভার হয়ে এল। পায়ের গোছে পুরনো মচকানির ব্যথাটা আবার চাগিয়ে উঠছে। কামিজের বগলদুটো ভিজে।
হাঁটার অভ্যাস একদমই নেই। বাবা প্রায়ই বলে, ‘শরীরটাকে রোজ একবার খাটাবে নয়তো জং ধরে যাবে। শরীরের আর মেসিনের একই রকম যত্ন দরকার।” বাবা খুব ভোরে উঠে ছাদে গিয়ে শরীরটাকে খাটায়। তখনও সে বিছানায় শুয়ে থাকে, অল্পস্বল্প শব্দ পায়। অফিস থেকে হেঁটে বাড়ি চলে যাবার মতো জোর বাবার আছে, হয়তো রওনাও দিয়েছে এতক্ষণে। কণা বোধহয় বাবাকে দেখতে পাবে বলেই ভিড়ের দিকে তাকাল। আর তখনই ওদের দুজনকে দেখতে পেল।
”দেবু, এই দেবু…কল্যাণ।”
কণা পড়িমরি ছুটে গেল। ভাসতে ভাসতে একটা কুটো নয় আস্ত একটা নৌকোই যেন সে পেয়ে গেছে। ওরা তারই ক্লাসের।
”কোথায় যাচ্ছিস তোরা?”
”তুই এখানে দাঁড়িয়ে কী কচ্ছিস? কলেজ গেছলি?”
”না। যাবার আগেই তো কাণ্ডকারখানা বেধে গেল। এদিকে ট্রেনও বন্ধ।”
”য়্যা!” কল্যাণ ডানহাতের তালু মাথায় রাখল খানিকটা নকল হতাশায়। ”ট্রেন বন্ধ! শাললা…শোকপ্রকাশ হচ্ছে। এবার কী হবে দেবু?”
”কী আবার হবে স্টেশনে পড়ে থাক, কাল ট্রেন চললে বাড়ি যাস। তোর তো বেশি দূর নয় উলুবেড়ে, কাছেই, হেঁটে চলে যা না।”
দেবুর কথায় কান না দিয়ে কল্যাণ জিজ্ঞাস করল:
