কিন্তু আপাতত স্কেচ নিয়ে চিন্তার কোনো ইচ্ছা তার নেই। ক্লান্ত, সে এখন অত্যন্ত ক্লান্ত। তাছাড়া মনের অবস্থাটাও নিরাপদে বাড়ি ফেরা ছাড়া আর কিছু ভাবার মতো নয়। কল্পনার বাইরে থেকে এসে পরের পর ঘটনা, মসৃণ দৃশ্য ও শব্দ তাকে ধাক্কার পর ধাক্কা দিয়ে তার সাজানো, ধারণাগুলোকে ওলটপালট করে দিয়ে গেছে। এখন শুধু ট্রেনে উঠে কোনোভাবে পৌঁছনো। কাতার দিয়ে যেভাবে লোক স্টেশনের দিকে দৌড়চ্ছে, অসম্ভব ভিড় হবে, ট্রেনে উঠতে পারলে হয়!
হাওড়া স্টেশনে ঢুকেই কণার মনে হল, কিছু একটা গোলমাল ঘটেছে। এত লোক দাঁড়িয়ে কেন? ট্রেনে ওঠার জন্য যারা আসে, এভাবে জটলা করে বা একা একা হকচকান বা বিরক্তমুখে বাইরের চত্বরে না দাঁড়িয়ে ভিতরে প্ল্যাটফর্মে অপেক্ষা করে।
কী ব্যাপার ট্রেন নেই নাকি? কণা বাইরে থেকেই দেখতে পাচ্ছে। এক থেকে ছয় নম্বর পর্যন্ত কোনো প্ল্যাটফর্মে ট্রেন নেই। সে আর এগোল না। মাঝবয়সি একটি লোক যার ধুতি ও শার্ট এবং হাতে ঝোলান ছোট্ট কাপড়ের থলিটি থেকে মনে হচ্ছে কৃষি-ব্যবসায়ী বা স্যাকরা কিংবা হোমিওপ্যাথও হতে পারে এবং নিয়মিত নিত্যযাত্রী, এমন লোকের কাছ থেকে খবর নেওয়াই নিরাপদ। এরা আজেবাজে মনগড়া ধারণার বা আন্দাজি খবর দেয় না।
”ট্রেন কি নেই?” কণার স্বর আর্তনাদের মতো।
মাথা নাড়ল লোকটি। ব্যস্ততা বা উদ্বেগ নেই, যেন জানেই এরকম কিছু একটা হবে। কণা দমে গেল।
”কতক্ষণ নেই?”
”আমি এক ঘণ্টা হল এসেছি। সব বন্ধ, খুব গোলমাল হচ্ছে, ট্রেনে আগুন টাগুনও নাকি লাগিয়েছে তাই।”
লোকটি আর কথা বাড়াল না। কণা মুখের দিকে তাকিয়ে রইল।
”বলেছে কিছু, কখন চলবে?”
”বলেছে সব ট্রেন পথে আটকে আছে, কখন এসে পৌঁছবে তার নিশ্চয়তা নেই। আর এলেও সেটা যে ছাড়বে আবার তারও নিশ্চয়তা নেই।”
”তার মানে?” এবার কণার মাথায় আকাশ ভেঙে পড়ল। ”ট্রেন তাহলে পাওয়া যাবে না?….বন্ধ!”
”কোথায় যাবেন?”
”হিন্দমোটর।”
লোকটি কয়েক সেকেন্ড ভেবে বলল, ”মাইল সাত-আট, হেঁটে গেলে…।” আপাদমস্তক কণাকে দেখে নিয়ে বলল, ”ওব্যেস তো নেই, নয়তো এখন রওনা হলে ঘণ্টা চারেক, কি পাঁচ ঘণ্টায় পৌঁছে যাবেন।”
কণা শুধু ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে রইল। লোকটির কথার মধ্যে যে পরামর্শ রয়েছে সেটা তার মাথায় ঢুকতে একটু সময় নিল। তারপরই শিউরে উঠে বলল, হেঁটে যেতে হবে!”
”এগিয়ে দেখুন না, বহু লোক হেঁটেই রওনা দিয়েছে, মেয়েছেলেও।”
”আপনি কোথায় যাবেন?”
”বর্ধমান।” খুব নিশ্চিন্তভাবে লোকটি বলল।
”হেঁটে যাবেন?”
”মোটেই না। এখানেই শুয়ে কাটাব। দেখুন না, কত লোক আজ স্টেশনেই থেকে যাবে।”
কণা এগিয়ে গেল প্ল্যাটফর্মের দিকে। আশা নিয়ে বহু লোক অপেক্ষা করছে। কেউ ইন্দিরা গান্ধীকে নিয়ে আর কথা বলছে না। হতাশা, বিরক্তি, চাপা রাগ থরে থরে মুখগুলোয় সাজানো। এই অকল্পনীয় অবস্থার জন্য কাকে যে দোষারোপ করবে কেউই তা খুঁজে পাচ্ছে না। কণা ভিড় ঠেলে প্ল্যাটফর্মের শেষে পৌঁছল। রেল লাইন ধরে সার দিয়ে শ’য়ে শ’য়ে মানুষ চলেছে। সে অবাক হয়ে ভাবল, কোথায় ওদের বাড়ি, কখনই বা ওরা পৌঁছবে?
কী করব তাহলে? দেবাইপুকুরে তাদের একতলা বাড়িটা কণার মনে ঝলসে উঠল। মা বোধহয় এখনও জানে না ট্রেন বন্ধ। গ্রিলঘেরা ঢাকা বারান্দায়, টেবলে মাথা ঝুঁকিয়ে এ-বই সে-বই খুলছে আর লিখে যাচ্ছে। রেডিয়োটা নিশ্চয়ই বন্ধ রয়েছে। হয়তো রাস্তা থেকে বা পাশের বাড়ি থেকে কেউ জানিয়ে দেবে ইন্দিরা গান্ধীর মৃত্যুর খবর। শোনার পর কিছুক্ষণ স্থির চোখে তাকিয়ে থেকে আবার লেখায় মন দেবে। দিদিমা মারা যাবার খবর নিয়ে ত্রিবেণী থেকে মামার বড় ছেলে পানু যখন এসেছিল মা তখন দুটি ছাত্রকে পড়াচ্ছিল। পানুর মুখের দিকে অনেকক্ষণ তাকিয়ে ধীরস্বরে মা বলেছিল, ”মিনিট পনের বস, এখন একটু ব্যস্ত।”
”এই যে ভাই, এখন কী করব বল তো?”
কণা চমকে পাশে তাকাল। মেয়েটি তার থেকে পাঁচ-ছ বছরের বড়, অফিসে চাকরি করে। থাকে কোন্নগরে। বছরখানেক আগে ট্রেনেই আলাপ, কালও দেখা হয়েছে। ভাই নেই তাই পাড়ার চারটি ছেলেকে ফোঁটা দিয়েছে এবং কালীপুজোয় নীলাম্বর অপেরার যাত্রা দেখতে গিয়ে কী ঝামেলায় পড়েছিল এইসব কথা ট্রেনে বলেছিল।
”আমিও তো ভাবছি, কী বিপদে যে পড়া গেল, এখন বাড়ি যাই কী করে?”
”মেয়েটির সঙ্গে বেঁটেখাটো একটি যুবক। সাদা-সবুজ ডোরা দেওয়া স্পোর্টস শার্ট প্যান্টে গোঁজা। তাকে লক্ষ্য করে মেয়েটি বলল, ”আর একবার খোঁজ নিয়ে দেখুন না যদি ট্রেন চলে। গোলমাল বন্ধ হয়েও তো যেতে পারে।”
”বলেই তো দিল, কোনো আশা নেই….বরং আমি যা বললাম তাই করুন।”
”অসিতদার বাড়ি?….খুব ভালো আলাপ নেই।”
”আমার সঙ্গে তো আছে। অত্যন্ত ভালো লোক, বউদিও খুব ভালো, এক রাত্তিরের তো ব্যাপার। ট্রেন তো কাল বন্ধ থাকবে না, থাকতে পারে না। আর গভর্নমেন্ট আজই দেখবেন সব ঠান্ডা করে দেবে।…আপনি ভালো না চিনলেও, অফিসেরই মেয়ে বিপদে পড়ে কয়েক ঘণ্টার জন্য থাকতে চাইছে তখন কলিগ আশ্রয় দেবে না, তা হতে পারে নাকি?”
যুবকটি খুবই আন্তরিকভাবে কথা বলছে। মেয়েটির ইতস্ততঃ করার কারণও কণা বুঝতে পারছে। হঠাৎ কারুর বাড়ি রাত কাটাতে সঙ্কোচ হওয়ারই কথা।
