টাকাকে অবহেলা করা যায় না। যাকে অবহেলা করা যায় না সেই মানী। ফার্স্ট ক্লাশের লোক মান্যগণ্য। সেকেণ্ড ক্লাশ থেকে যখন ফার্স্ট ক্লাশে ডিউটি দেয়, তখন কণ্ডাক্টারদের ব্যবহারও বদলে যায়। হঠাৎ রোজগার বাড়লে মাধবীও কি তার ব্যবহার বদলাবে? স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্কের মধ্যে টাকার ঠাঁই কতটুকু? সম্পর্ককে টাকা কতখানি ভাঙ্গা-গড়া করতে পারে?
ভিড়, ঘাম আর ময়লা কাপড়ের বোদা গন্ধের মধ্যে, রড ধরে দাঁড়িয়ে দিনেশ ভাবল, পরিবেশ যদি দমচাপা হয়, নড়াচড়ার ইচ্ছে থাকলেও ক্ষমতা যদি না থাকে, দুশ্চিন্তা যদি মাথায় ভর করে, তাহলে কোনটে আগে ভাবা উচিত, টাকা-পয়সা, মানসম্মান, না শিক্ষা-দীক্ষা। কোনটে আগে কোনটে পরে হবে? একটার সঙ্গে অন্যগুলোর কি সম্পর্ক হতে পারে?
-টিকিট।
-তাই বলে গায়ে হাত দিচ্ছ কেন? মুখে বললে কি শুনতে পাই না?
কণ্ডাক্টার মুখখানাকে নির্বিকার করে রাখল। লোকটা গাঁইগুঁই করে পয়সা দিল। দিনেশ তাড়াতাড়ি পয়সা হাতে নিয়ে তৈরী হয়ে রইল।
-ঠেলবেন না।
-ইচ্ছে করে কি আর ঠেলছি দাদা।
-ঠেলাঠেলি যদি পছন্দ না হয় তা হলে ট্যাক্সিতে যান দাদু।
-অফিস টাইমের ট্রামে বুঝি নতুন!
মাথা গরম হয়ে উঠল দিনেশের। লোকগুলো সামান্য কথাটাকে নিয়ে অহেতুক ব্যঙ্গ করল। বাঙালী স্বভাবে ব্যঙ্গটা ভাল খোলে। তবু ইদানীং সেটা বেড়েছে যেন। অপরকে জ্বালা দিয়ে মানুষ আজকাল খুশি হচ্ছে। দিনেশ নিজের মধ্যেকার জ্বালা দিয়ে অন্যদের বুঝতে চেষ্টা করল। জ্বলছে এই মানুষগুলোর কথায়। এই মানুষগুলোকে জ্বালাচ্ছে কে?
-ঠিকই তো দিয়েছি। একটা আনি আর তিনটে নয়া পয়সা। ছ’পয়সা হল।
-টিকিটের দাম দশ নয়া পয়সা। আনিতে হয় ছ’ নয়া পয়সা তা হলে মোট হল নয় নয়া পয়সা।
-গরমেণ্ট যা বলেছে আমি তাই দিয়েছি, এই তো পাঁচটা লোক রয়েছে, জিগ্যেস করে দেখ আমি কিছু অন্যায্য বলেছি কিনা!
-গরমেণ্টের কথা শুনলে তো আমার চলবে না; আমি কোম্পানির চাকরি করি, তাদের কথা শুনতে হবে।
-কোম্পানিতো বিলিতি!
-তা’তে কি হবে।
-গরমেণ্টের উপর কি তার হুকুম চলবে!
-অত কথা জানি না, আর একটা নয়া পয়সা দিন।
-দোবো না।
-তা হলে নেমে যান।
কণ্ডাক্টারকে চার পাঁচ জন বেধড়ক মারল। কাঠ হয়ে দিনেশ দেখল। তর্কটা হয়েছিল তার সঙ্গেই। নেমে যাবার কথা বলায় ভীষণ রাগ হয়েছিল। অপমানে গলা ভারী হয়ে, চোখে ঝাঁজাল বাষ্প জমে উঠেছিল। পাশের মানুষগুলো তর্কাতর্কি শুনছিল। এরপর ওরাও দু’চারটে কথা বলে। কথার পিঠে কথা হয়। সুর চড়তে শুরু করে। শেষকালে কণ্ডাক্টার মার খেল।
যারা মারল তারাই একটু আগে ব্যঙ্গ করেছিল। ট্রাম থেমে গেছে। ভিড় জমেছে, পুলিশও এসেছে। সেই ফাঁকে সে সকলের চোখ এড়িয়ে কেটে পড়েছে। তাকে নিয়েই ঝগড়ার শুরু, সব আগে তারই খোঁজ পড়বে। এরপর থানা, পুলিশ, কোর্ট, ফাইন কিংবা জেল।
যারা মারল তাদের কি হবে! তারা মারতে গেল কেন? তাদের সঙ্গে তো তর্ক হয়নি। মারা উচিত ছিল আমার। আমায় অপমান করল। আমি কাঠ হয়ে রইলুম। মাধবী অপমান করে, তখনও চুপ করে থাকি। কণ্ডাক্টারকে অন্যলোকে মারল। আমারও ইচ্ছে করেছিল দু’চারটে চড় চাপড় মারি। তবু কেমন জবুথবু হয়ে রইলুম। এইটেই দোষ। আসল কাজের সময় কিছু করতে পারি না। ওরা আমার হয়ে করে দিল।
ওদের ফেলে আমি পালিয়ে এলুম। আমি কেন এলুম। অন্যায় করেছি? ওখানে গিয়ে যদি এখন বলি আমার জন্যই এই কাণ্ড ঘটেছে, আমিই আসল দোষী, তা হলে মহত্ত্ব দেখান হয়। কিন্তু যদি জেল হয়! আগে বুদ্ধিমান, তারপর মহৎ হওয়া উচিত। মহত্ত্ব আমার সংসারকে বাঁচাবে না। পয়সায় সংসার বাঁচে আর আমি একটা নয়া পয়সা বাঁচাতে ঝগড়া শুরু করেছিলুম। আসলে সংসারের মুখ চেয়েই মহৎ হওয়া না হওয়া নির্ভর করে। জন্মগত মহত্ত্ব গুণ বাজে কথা।
তবু কর্তব্য বলে একটা জিনিস আছে। আমি সেটা করিনি। ওরা আমার জন্যই মারল। ওদের জন্য আমার উচিত ছিল পালিয়ে না আসা। এখন যদি ফিরে যাই!
দিনেশ রাস্তায় দাঁড়িয়ে পড়ল। অনেকখানি পথ হেঁটে এসেছি। ফিরতে গেলে ক্লান্ত হতে হবেই। ফিরে যাওয়া উচিত। শরীর ক্লান্ত লাগছে, বাড়িও বেশিদূর নয়। মাথা গরম হয়ে উঠল দিনেশের। হঠাৎ নজর পড়ল চাকরটার ওপর। একটা বাচ্চচা কোলে নিয়ে দাঁত খিঁচুচ্ছে ওপরে দাঁড়ান একটা ছোট্ট ছেলেকে। বেড়াতে বেরিয়েছে, বোধ হয় একটু পিছিয়ে পড়েছিল তাই একসঙ্গে রাস্তা পার হতে পারেনি। রাস্তাটায় ট্রাম, বাস দুই-ই চলে। কেমন ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে গেছে ছেলেটা। চাকরটার উচিত ওকে হাতেধরে পার করে নিয়ে আসা, তা’ না করে খিঁচুচ্ছে। হয়ত আড়ালে মারবে। মারের ভয়ে এখুনি অন্ধের মত ছুটে আসবে ছেলেটা।
ছুটে গিয়ে চাকরটাকে থাপ্পড় কষাল দিনেশ।
-উল্লুক কাঁহাকা। ওইটুকু ছেলে পার হতে পারে? তুমি বুড়োদামড়া পার হয়ে এসেছ বলে কি সবাই পারে?
আরও কয়েক ঘা লাগাল দিনেশ। ভিড় জমে গেল। সকলেই সমর্থন করল তাকে। পুলিশ এল না। চাকরটাই সরে পড়ল গুটিগুটি।
ভীষণ ঝরঝরে লাগছে এখন নিজেকে। মনে একফোঁটা গ্লানি নেই। চোখে পড়ল রাস্তার এমাথা ওমাথা পর্যন্ত টাঙান শালুটা। পুজো আসছে। রমাকে, মাধবীকে একখানা করে শাড়ি দিতে হবে।
