কলেজ ক্যান্টিনে আড্ডা দেবার সময় একবার কে যেন কথাটা তুলেছিল, ক’জন তাদের বাবার অফিসে গেছে? ছেলেদের মধ্যে দুজন বাদে প্রত্যেকেই বলেছিল, গেছে। আর ওই দুজন বলেছিল, বাবার অফিস রাইটার্স বিল্ডিংসটা বাইরে থেকেই দেখেছে। মেয়েদের কেউ-ই কখনো বাবার অফিসে যায়নি। শুধু একজন বলেছিল, দূর থেকে দেখেছে। ‘যদি হঠাৎ কখনো বাবাকে দরকার পড়ে তখন কী করবে?’ একজন বলেছিল, ‘রেলের অফিসে বাবা কাজ করে, কয়লাঘাটা জায়গাটা জানি, ডিপার্টমেন্টের নামও জানি। লোককে জিগ্যেস করে করে বার করে নেব।’
কণা অফিসের নামটা জানে। বাবার কাউকে অফিসের নাম বলতে হলে বলে, ‘এনজেম্পি…ভারত সরকারের অধীন একটা সংস্থা।’ যাকে বলা হল সে বুঝতে না পেরে তাকিয়ে থাকলে বলে, ন্যাশনাল জুট মিল অব প্রোডাক্টস সংক্ষেপে ‘এনজেম্পি’। সেখানে তার বাবা স্টোর্স সেকশনে কেরানি। নিশ্চয় ওই অঞ্চলের লোকজন অফিসটা জানে। এখন গেলে কেমন হয়! কিন্তু যাওয়ারও কোনো দরকার আছে কি?
বাবার জন্য হালকা একটা উদ্বেগ তার মনে ভেসে এল। কিন্তু ওটা অফিস এলাকা। রাইটার্স আর লালবাজার কাছেই। ওখানে কি এইরকম অবস্থা হবে? বাবা ছেলেমানুষ বা ভীতু ধরনের নয়। কিন্তু কোথাও একটা পুলিশ নেই কেন? এই অদ্ভুত নৃশংসতার সঙ্গে ইন্দিরা গান্ধীর মৃত্যুর সম্পর্কটা কোথায়?
সিদ্ধান্তে না এসেই দক্ষিণ দিকে সে হাঁটতে শুরু করল। রাস্তার মাঝ দিয়ে কাতারে কাতারে লোক চলেছে। কণাও রাস্তায় নামল। কলুটোলার মোড়ে পৌঁছে দেখল অনেকেই আর এগোচ্ছে না। ওখান থেকেই দেখা যাচ্ছে বৌবাজারের মোড়ে একটা বাসে আগুন জ্বলছে। দমকলের গাড়ি দাঁড়িয়ে। মনে হল কয়েকজন লোক ইঁট ছুঁড়ছে দমকল গাড়িতে।
”আর এগোস না, কলুটোলা দিয়ে চল। ক্যানিং স্ট্রিট হয়ে-ব্র্যাবোর্ন রোডে পড়ব।”
দুটি লোক ডানদিকের রাস্তায় ঢুকল। কণাও তাদের পিছু নিল। ব্র্যাবোর্ন রোড নামটাই তাকে আশ্বাস জোগাল। চেনা নাম, হাওড়া থেকে বাসে ওই রাস্তা দিয়েই সে কলেজ যায়। বাবার অফিসে এখন যাওয়ার কোনো অর্থ হয় না, দরকারও নেই। তাকে দেখে বাবা হয়তো রাগ করবে। ‘কী দরকার ছিল এখানে আসার? এরকম বহু দেখেছি জীবনে। নর্থ ক্যালকাটায় আমার জন্ম’। তবে একদিন গিয়ে অবশ্যই অফিসটা দেখে আসতে হবে। কখন যে কী দরকার পড়ে।
রবীন্দ্র সরণির মোড়ে পৌঁছে ডানদিকে তাকিয়ে কণার মনে হল, উত্তেজক কিছু ঘটছে। কত লোক? অন্তত দু-তিন হাজার তো হবেই, তাদের চলাফেরার মধ্যে ব্যস্ততা, ঝাঁঝ এমনকি দু-তিনজনের হাতে লাঠি বা রডের মতো জিনিসও।
একটি কিশোর ওইদিক থেকেই আসছে। পরণে কালো গেঞ্জি আর লুঙ্গি, কাঁধে একটু চুপড়িতে কাঠকয়লা। কণা তাকে জিজ্ঞেস করল, ”কী হয়েছে ভাই?”
”গুরুদ্বারা আছে না ওখানে, আগ লাগাচ্ছে। ভিতর থেকে গোলি চালিয়েছে। বড়বাজারে টেক্সিতে ভি আগ লাগিয়েছে।”
”কেন?”
”ইন্দিরা গান্ধীকে উগ্রপন্থীরা মেরেছে না!”
অবাক হয়ে সে কণার দিকে তাকিয়ে চলে গেল। আর নয়, এবার সোজা স্টেশন। ভিড়ের মধ্য দিয়ে কাঁধের ঝুলিটা আঁকড়ে যতটা সম্ভব ক্যানিং স্ট্রিট দিয়ে এগোতে লাগল। তখন স্কুলবাসের ছেলেটির মুখ কয়েকবার তার মনে ভেসে উঠল। অসহায় বন্দির মতো, অথচ বিরুদ্ধে ঘটনার দেয়ালে ঘেরা প্রবলশক্তি। কিছু করার নেই অন্যায়ের কাছে আত্মসমর্পণ ছাড়া। সাহায্য করতে পারে যারা, তারা কেউ এগিয়ে আসছে না। কী ক্ষোভ মুখটায় অথচ বড় বড় চোখদুটিতে কেমন অদ্ভুত একটা সারল্য। বিশ্বাস করতে পারছে না, এরকমও হয়!
ভেঙে দেওয়া একটা চাকা লাগানো খাবার বিক্রির ঠেলাগাড়ি। ভাঙা উনুন আর পোড়া কয়লা রাস্তায় ছড়ানো। ডেকচি বা তাওয়াটা ধারেকাছে নেই অর্থাৎ লুট হয়ে গেছে। চীনেমাটির প্লেটগুলোর টুকরো অনেক দূর পর্যন্ত ছড়ানো, আছড়ে ভাঙার জন্য। মাংস, ঝোল, আর চানামটর রাস্তায় ছিটিয়ে। কণা পাশ কাটিয়ে এগিয়ে গেল। কিছু লোক দাঁড়িয়ে দেখছে, বোধহয় স্থানীয়, বাড়ি ফেরার তাড়া নেই। একটা ঘণ্টা এইসব গাড়িতে ঝোলে, মাঝে মাঝে বাজিয়ে জানান দেয়। সেটা তো চোখে পড়ল না! নিশ্চয় কেউ নিয়ে গেছে।
রাস্তার ওপারে বন্ধ দোকানগুলোর মাঝে একটা ছোট্ট ছিটকাপড়ের দোকান খোলা। সামনে দিয়ে দ্রুত লোক চলাচল হচ্ছে। দোকানের ভিতরের তাকে একটা সাদা কাপড়ের রিল কাত হয়ে, আরও কয়েকটি কাউন্টারে এলোমেলো। রাস্তার উপর শো-কেসের কাচ ভাঙা। কণার হঠাৎ-ই মনে হল যত কাপড় ছিল তাতে কটা ব্লাউজ, সায়া হতে পারত? সারা জীবন চলে যাবার মতো? জীবনে কটা ব্লাউজ লাগে, এটা কি কেউ কখনও হিসেব করেছে?
ফ্লাইওভার দিয়ে হাঁটা নিষেধ। আজ সব লোক ওখান দিয়েই হাঁটছে। কণা এইবার ক্লান্তবোধ করতে লাগল। বড় করে শ্বাস নিতে হচ্ছে। একটু তীক্ষ্ন ব্যথা বুকের বাঁদিকে। ওখানেই হার্ট। ফেল-টেল করবে না তো! চলতে চলতে ধপ করে পড়ে অনেকেই তো মারা গেছে। তবে তারা বাইশ-তেইশ বছরের নয়। ডান পায়ের গুলিটা শক্ত লাগছে, ব্যথা করছে। পা ফেললেই ডান কুঁচকিতে টান ধরছে। কণা হাঁটার গতি কমাল।
ব্রিজ বা ফ্লাইওভার দিয়ে যাতায়াতের সময় কতবার গঙ্গাকে দেখেছে। এখন হাঁটতে হাঁটতে আবার দেখল। ওপারে হাওড়া স্টেশনের লালবাড়ির ঘড়িতে পৌনে দুটো প্রায়, গঙ্গায় অন্যান্য দিনে যেমনটি থাকে এখন তাই। জলে ভাসা শ্যাওলা আর আবর্জনা যেমন নালার কিনারে থিতিয়ে আটকে যায় তেমনিভাবেই, নৌকো, গঙ্গাবোট, জেটি আর মালের জাহাজগুলো গঙ্গার দু-পার ঘেঁষে জমে রয়েছে দক্ষিণে বাঁক নেওয়া পর্যন্ত। পুরনো গুদাম বাড়িগুলো আর তার পিছনে লম্বা নতুন রং করা অফিস বাড়িটা কিংবা মাল খালাসের জন্য জিরাফের মতো গলা বাড়ানো ক্রেন, ফার্নেসের চিমনি, গঙ্গার পূর্বতীর ধরে মাল-বওয়া ট্রেন আর যাত্রীভরা খেয়া-নৌকো, এইসব নিয়ে দল বেঁধে তারা বহু স্কেচ করেছে। ভোরে ট্রেন ধরে হাওড়ায় এসে ব্রিজের নিচে স্কেচখাতা নিয়ে একা স্নানের ঘাটে বসেছে, ব্রিজের ওপর থেকে, পাশ থেকে, চলমান বা স্থাণু, জড় বা জঙ্গম যা তার ভালো লেগেছে এঁকেছে। তাকে আকর্ষণ করে জীবনের সঙ্গে মেশানো কৌতুককর বা গম্ভীর মানুষ ও ঘটনা। কলেজে তার স্কেচ প্রশংসা পেয়েছে শিক্ষক এবং ক্লাসের বন্ধুদের কাছে। ‘দেখার চোখ আছে’ এই কথা অনেকের মুখ থেকে সে শুনেছে।
