”আপনি যাবেন কোথায়?”
কণা মুখ ফিরিয়ে দেখল অবনী।
”কলেজ যাব ভেবেছিলাম, এখন মনে হচ্ছে বন্ধ হয়ে গেছে। নিশ্চয় ডিস্টার্বেন্স ওখানেও ছড়িয়েছে।”
”এ জিনিস এখন সারা কলকাতায় চলবে।”
কণা ওর স্বরে উদ্বেগ পেল। সে নিজেও এবার ছমছমানি বোধ করল। বাড়ি ফিরে যাওয়া ছাড়া আর গতি নেই।
”আমি এখন হাওড়া স্টেশন যাব।”
”দেরি করবেন না।”
”আপনি?”
”আমি কাছেই হিদারাম ব্যানার্জি লেনে থাকি। গলি দিয়ে চলে যাব। আপনি সোজা ট্রামলাইন ধরে সেন্ট্রাল অ্যাভিনু পেরিয়ে, বড়বাজার দিয়ে চলে যান।”
কণার মনে হল তার নিরাপত্তার জন্য অবনী চিন্তিত। স্কেচখাতা থলিতে রেখে সে বাধ্য মেয়ের মতো ঘাড় নাড়ল। এতক্ষণে সে কিছুটা ভয় পেয়েছে।
”তাই যাই।”
পশ্চিমদিকে হাঁটতে শুরু করেছে সবে তখনই একটা হইহই উঠল। লম্বা একটা স্কুলের বাসের সামনে কয়েকটি ছেলে হাত তুলে ছুটে গেছে। বাস ঠাসাঠাসি ভরতি শিশুতে। জানালায় ভীত মুখগুলো সার দিয়ে।
”বাস চলবে না, আজ কিচ্ছু চলবে না।”
”বাচ্চচাদের বাড়ি পৌঁছে দিচ্ছি ভাই।” মুখ বার করে একটি লোক বলল।
”হেঁটে যাবে, হেঁটে…হাওয়া বার করে দে তো, এত বড় একটা ব্যাপার ঘটেছে আর বাসে চড়ে আরামসে কিনা বাড়ি যাওয়া। টেনে নামা সব।”
”ভাই, এরা বাচ্চচা, দূর দূর জায়গায় বাড়ি, যাবে কী করে?” লোকটি হাতজোড় করেছে।
”বাচ্চচা তো কী হয়েছে? আজ বাচ্চচাবুড়ো সব সমান।”
বাসের গায়ে ধপাধপ চড় ঘুঁষি মারার শব্দ হতেই কয়েকটি বাচ্চচা ডুকরে উঠল। কণার চোখ আটকে গেল একটা মুখে।
জানালার ধার থেকে ওরা ভয়ে পিছিয়ে। আচমকা মুখে চড় মারলে যেমন হয়, কেউ বিহ্বল, কেউ কান্নার আগের মুহূর্তে। ত্রাস কি জিনিস, কণা এখন তার চেহারা দেখতে পাচ্ছে। বছর দশেকের ছেলেটি, ওদের মধ্যে একটু বড়ই, তাকে দুদিক থেকে জড়িয়ে দুটি বাচ্চচা মুখ চেপে ধরেছে ওর বুকের কাছে। আর সে দুজনকে দুহাতে ঘিরে রেখেছে। একটু আগে দেখা চামড়া কোঁচকানো হাতটিই যেন সুডৌল, নবীন হয়ে উঠেছে। ওর চোখেমুখে বিস্ময়। সেইসঙ্গে বেদনা এবং হয়তো জীবনে প্রথম একটা বীভৎস শক্তির সামনে নিজের অসহায়ত্ব অনুভব করার ক্ষোভও ওকে দগ্ধ করছে। বড় বড় দুটি চোখ, যা কিছুক্ষণ আগেও বালক বয়সের চাঞ্চল্য আর দুষ্টুমিতে ঝকঝকে ছিল, এখন সন্দেহের ঝুলকালিতে জড়িয়ে কুটিল অবিশ্বাসভরে তাকিয়ে।
এতগুলো বাচ্চচাকে শৈশব থেকে সরিয়ে দিলে ইন্দিরা গান্ধী, কেন যে এভাবে মারা যেতে গেলে! কণা তার চারপাশের লোকেদের দিকে তাকাল। কেউ সমর্থন করছে বলে তার মনে হয় না, কিন্তু এগিয়ে গিয়ে বাধা দেবার ইচ্ছাও কারুর মুখে সে দেখতে পেল না।
”আপনি এখনও দাঁড়িয়ে?” আবার অবনী।
”দেখেছেন কী হচ্ছে।”
”হোক। এখন এরকম অনেক কিছু হবে। তাই বলে দাঁড়িয়ে দেখবেন না, নিজের কথা আগে ভাবুন।”
অবনী যেরকম মন্থর ক্ষীণস্বরে কথা বলে এখন কিন্তু তেমনভাবে নয়, দ্রুত এবং উত্তেজিত হয়ে উঠেছে।
”এরকম বহু দেখেছি। লক্ষ্য করেছেন এত বড় একটা গুরুত্বপূর্ণ জায়গা কলেজ স্ট্রিটের মোড় অথচ একটা পুলিশও কোথাও নেই! লুটপাট, গুণ্ডামি।” কণার পাশাপাশি অবনী মোড় পর্যন্ত এল। বাঁয়ে তাকিয়ে দেখল, বিশ্ববিদ্যালয়ের সামনে পোড়া একটা বাসে দমকল থেকে জল ঢালা হচ্ছে।
”আমি এদিকেই যাব, আপনি সিধে চলে যান।” অবনী হাত তুলে কণাকে হাঁটার পথ নির্দেশ করল।
”পুলিশের গুলি কিংবা বোমা টোমার ভয় রয়েছে আপনার দিকে।”
”আমি বাঁ দিকের গলি ধরব, চলি।”
গিজগিজে ভিড়। কণা রাস্তা পার হয়েই একটা ভিড়ের বাধা পেল। কেউ একজন ট্রানজিস্টর রেডিয়ো নিয়ে, তাকে দেখাই যাচ্ছে না, সেতারে মৃদু মন্থর বিষণ্ণ একটা সুর বাজছে। ভিড়টাকে পাশ কাটিয়ে সে চলতে শুরু করল। হাওড়া স্টেশন এখান থেকে অন্তত দেড়-দু’ মাইল পথ।
সব দোকানই বন্ধ হয়ে গেছে। সব দোকানের সামনেই জটলা। প্রত্যেকের মুখে বিভ্রান্তি, বিষণ্ণতা, কৌতূহল আর ভয়। বহু জায়গায় ট্রানজিস্টর রেডিয়ো ঘিরে ভিড়। পদচারি মানুষ ব্যস্ত পায়ে চলেছে তার মতো একই উদ্দেশে, বাড়ি পৌঁছতে। কণার এতক্ষণে মনে পড়ল মা এবং বাবাকে।
ভাইফোঁটা গেছে শুক্রবার। সোমবার, উনত্রিশে স্কুল খুললেও মা সেদিন স্কুল গিয়েই বৃহস্পতি পর্যন্ত চারদিনের ছুটি নিয়ে ফিরে এসেছিল। নভেম্বরের আগেই বইটা লিখে প্রকাশককে দেওয়ার কথা কিন্তু শেষ করতে এখনো অনেক বাকি। রবিবার প্রকাশকের লোক এসে কপি নিয়ে যাওয়ার সময় তাগিদ দিয়ে গেছে। কণা জানে, মা কখনও কথা রাখতে ভুল করে না। দিনরাত লিখে বইটা শেষ করবেই। দুর্গাপুজোর পর থেকেই টিভি বন্ধ রয়েছে। রান্না করা অবশ্য বন্ধ রাখেনি। এই একটা কাজ নিজে না করলে মা ছটফট করে।
”কে করল শুনেছেন কিছু?”
”বলল তো তাঁর দেহরক্ষী করেছে। …বাড়িতেই নাকি…কাল পেপারে না দেখা পর্যন্ত ভালোভাবে কিছুই জানা যাবে না।”
দুটি লোক কথা বলতে বলতে কণাকে পাশ কাটিয়ে এগিয়ে গেল। কণা এবার জোরে পা চালাল।
চিত্তরঞ্জন অ্যাভিনু। ওপারে ধোঁয়া উঠছে। রবীন্দ্র সরণির দিকে। কণা রাস্তা পার হতে ভরসা পেল না। এইবার তার বাবাকে মনে পড়ল। বাবা এখনও হয়তো অফিসে, গিয়ে দেখবে কি?
কণা শুধু এইটুকুই জানে বিবাদী বাগের উত্তর-পশ্চিমে নেতাজী সুভাষ রোডে বাবার অফিস। কখনো সেই অফিসে সে যায়নি। এমনকি বাড়িটাও চোখে দেখেনি। স্টেশন থেকে কলেজে ট্রামে বা বাসে যাতায়াতের পথে তার বাবার অফিস পড়ে না।
