”দোকান বন্ধ করে দাও, গতিক ভালো মনে হচ্ছে না। ট্রাম, বাস বন্ধ হয়ে যাচ্ছে।”
”বন্ধ হচ্ছে কী, বন্ধ করে দিচ্ছে। ওই দেখুন, ছোঁড়াগুলো কী করছে।”
”করুক, তুমি বন্ধ কর।” পবিত্রবাবু খিঁচিয়ে উঠলেন অবনীর প্রতি।
ওদের সঙ্গে কণা দোকানে ঢুকল। ভিতরের ঘর থেকে পেন্সিল, ঝোলা আর স্কেচ খাতাটা হাতে নিয়ে সে কাউন্টারের কাছে দাঁড়াল। বাইরের দরজার পাল্লা সামান্য ফাঁক, যৎসামান্য আলো ভিতরে।
”অবনী বাইরে দাঁড়িয়ে দেখো অবস্থাটা কী দাঁড়াচ্ছে। তারকবাবু এখনও তো এলেন না, দোকান বন্ধ করে চেলে যেতে হবে কিনা…যা মনে হচ্ছে, একটা গণ্ডগোল না পাকায়।” পবিত্রবাবু ভিতরের ঘরে ঢুকে গেলেন। কণার সঙ্গে একটা কথাও আর বললেন না, ওর অস্তিত্বটাও যেন ভুলে গেছেন। দোকানের নিরাপত্তা এখন তার সবকিছু।
দরজার ফাঁক দিয়ে কণা রাস্তায় তাকায়। আরও মানুষ। ওপারের গলির মুখে খণ্ড খণ্ড জটলা, তার মধ্যে বয়স্ক মেয়েরাও রয়েছে। ঘটনাটার ধাক্কায় সংসার ফেলে বেরিয়ে এসেছে। এই রকম মাপের কিছু ঘটলে কখনোই আর একা থাকা যায় না। অজস্র কথা আর অনুভূতি ভিতরে কেঁপে ওঠে যা অন্যের সঙ্গে ভাগ না করা পর্যন্ত দমবন্ধ করা অবস্থা তৈরি করে। বারবার জিজ্ঞাসা, একই উত্তর বারবার শোনা, তবুও অবিশ্বাস, তবুও জিজ্ঞাসা।
একটা রিকশয় এক বৃদ্ধ, সঙ্গে এক প্রৌঢ়া। কয়েকটি ছেলে রিকশকে থামিয়েছে। পঞ্চাশ ষাট মিটার দূর থেকে লক্ষ্য করলেও কণা বুঝতে পারছে ঘটনাটা কী। দুটি ছেলে প্রবলভাবে হাত নেড়ে দুজনকে রিকশ থেকে নামতে বলছে। বুদ্ধ ফ্যালফ্যাল চোখে, প্রৌঢ়ার একটা হাত বৃদ্ধের পায়ে, কাতরভাবে কথা বলছেন। বৃদ্ধের ডান পায়ের পাতা থেকে হাঁটুর উপর পর্যন্ত প্লাস্টারে মোড়া। রিকশওয়ালা আবেদনের ভঙ্গিতে কী একটা বলতেই একটি ছেলে তাকে চড় মারল। আর একজন বৃদ্ধার হাত ধরে টান দিল। তিনি পড়তে পড়তেও হাতল আঁকড়ে সামলালেন।
অবনী হালচাল বুঝে ফিরে এসেছে। কণা দরজা থেকে সরে এল ভিতরে।
”খুব খারাপ অবস্থা। গাড়িটাড়ি চলতে দিচ্ছে না। আগুন লাগিয়েছে নাকি শেয়ালদার দিকে একটা বাসে। আর এদিকে ইউনিভার্সিটির কাছে।”
দমকলের ঘণ্টার শব্দ এগিয়ে আসছে। অবনী চুপ করে রইল। তার কথা যে মিথ্যা, নয়, এটা প্রমাণ হয়ে যাওয়ার স্বস্তি ফুটে উঠেই মুখটায় আবার ফ্যাকাশে রং ধরল।
”সব বন্ধটন্ধ করে দিয়েছি, আর থাকার কোনো দরকার নেই।” ভিতরের ঘর থেকে পবিত্রবাবু বেরিয়ে এসেছেন। কাউন্টারের তলা থেকে ভারী তালাগুলো বার করে বললেন, ”বাড়ি ফেরার যে কী হবে! নিশ্চয় সারা কলকাতার ট্রাম-বাস বন্ধ। এর ওপর গুলিটুলি চললে…বড় রাস্তা দিয়ে না হাঁটাই ভালো। আপনি এখন কোথায় যাবেন?”
”কলেজে।”
”কলেজ টলেজ আজ শিকেয় তুলুন, বাড়ি চলে যান।”
তিনজনে বেরিয়ে এল। অবনী তালা লাগাচ্ছে। কণার দৃষ্টি ফুটপাথে পা ছড়িয়ে বসা বৃদ্ধের দিকে। বৃদ্ধা উবু হয়ে বসে, বাঁ হাত দিয়ে বৃদ্ধের কাঁধ জড়িয়ে। উল্টে দেওয়া রিকশটা সোজা করার চেষ্টা করছে রিকশাওয়ালা। হইহই করে ছেলেগুলো ছুটে গিয়ে থামাল একটা অ্যাম্বাসাডার গাড়িকে।
কী যেন প্রবাহ কণার পা থেকে মাথা পর্যন্ত উঠে এসে তাকে থরথর করে কাঁপিয়ে দিল। একটা বাষ্পের গোলা বুকের মধ্যে ফেটে আবেগের কুণ্ডলী তৈরি করল। স্কেচের খাতাটা বুকের কাছে তুলে বাঁ হাতে জড়িয়ে ধরে ডান হাতে পেন্সিলটা যন্ত্রের মতো বার করল কাঁধের ঝোলাটা থেকে।
দ্রুত হাত চলছে, খচখচ টানে রেখাগুলো কইমাছের মতো লাফিয়ে উঠছে, কোলাপসিবল দরজায় হেলান দিয়ে কণা বারবার মুখ তুলছে আর নামাচ্ছে। এই মুহূর্তটা কতক্ষণ ধরে পাবে সে জানে না।
শাঁখা আর রুলিপরা লোলচর্মের একটি হাত, খোঁচাখোঁচা পাকাচুলের মাথাটা নামানো এবং মাথার নিচে হাতটা শীর্ণ ঘাড়ের উপর দিয়ে, অসহায় কিন্তু আশ্রয়ের আশ্বাসে ভরা। ঘাড়ের দুর্বল সরু দুটো পেশী এবং শিরা দড়ির মতো, নাকছাবিপরা নাকটা ঝুঁকে, ওদের সামনে উল্লাসে রাস্তায় ছুটে-যাওয়া কয়েকটি শরীরের আর একটা মোটরগাড়ির আভাস।
”এভাবে দাঁড়িয়ে ছবি টবি আঁকবেন না, লোক জমে যাবে। কার কী রকম মেজাজ এখন বলা তো যায় না।”
পবিত্রবাবু চাবিগুলো পকেটে রেখে, চারধারে তাকালেন। বিব্রত, বিরক্ত এবং ভয়ার্ত মুখ। ”অবনী, তুমি চলে যাও, কাল যদি গাড়ি টাড়ি চলে তো এস।”
হনহনিয়ে পবিত্রবাবু চলে গেলেন। এমন পরিস্থিতিতে কণা কখনো পড়েনি। কলকাতায় তার নিয়মিত যাতায়াত গত তিন বছর, আর্ট কলেজে ভর্তি হওয়ার পর থেকে। যা এখন ঘটছে তার কল্পনার বাইরে। পুব দিকে তাকিয়ে সে ধোঁয়া দেখতে পেল। কিছু পুড়ছে। কৌতূহলে সে এগোল।
রাস্তা বাঁক নিয়েছে এমন জায়গায়-পৌঁছেই সে থমকে গেল। দ্রুতপায়ে মানুষ সরে আসছে। একটা ট্রাম দাউদাউ জ্বলছে। দূর থেকে রাইফেলের গুলির শব্দ এল। কিছু লোক ছুটছে আর পিছনে তাকিয়ে দেখছে। রাস্তাটা উঁচু হয়ে উঠে ফ্লাইওভারে পৌঁছেছে। ওখানে একটা লোকও নেই। রাস্তার দু’পাশে কাপড়ের পাড়ের মতো টানা সাইনবোর্ড। বাড়ির জানালায়, বারান্দায়, ছাদে লোক ঝুঁকে দেখছে। কণা একটা বন্ধ দোকানের সিঁড়িতে উঠে স্কেচ খাতা খুলল। এমন দৃশ্য জীবনে সে আর পাবে না। এখন ড্রইংগুলো করে রেখে পরে সম্পূর্ণ করে নেবে।
