”কোথায় গুলি করেছে, ওড়িশায় তো গেছেন জানতুম।”
”কোথায় তা জানি না।”
”আচ্ছা, তুমি কাউন্টারে গিয়ে বস। গুজবের তো মা-বাপ নেই, ছড়িয়ে দিলেই হল। প্রাইম মিনিস্টারকে গুলি করা যেন সোজা ব্যাপার, তাঁর বডিগার্ড কটা আছে জানো? মনে আছে ক’বছর আগে জয়প্রকাশ নারায়ণকে জ্যান্তই মেরে ফেলেছিল। কী কেলেঙ্কারি রে বাবা!”
পবিত্রবাবু প্রায় গজগজ করার মতই কথাগুলো বলে দেয়ালের দিকে তাকিয়ে রইলেন, নিজেকে সামলে নেবার চেষ্টায়। কণার মনে হল কাজের কথায় আসার এটাই সুযোগ।
”তারকবাবু তো আসেননি। আপনাকে বলেছেন কিছু কি?”
”আঁকার কাজ? আগে কখনো করেছেন?”
”না।”
”জানব কী করে আপনি আঁকতে জানেন।”
”কিছু স্কেচ সঙ্গে আছে।”
”দেখি।”
ঝোলা থেকে স্কেচের খাতাটা বার করে কণা এগিয়ে দিল। চেয়ারে হেলে, জানলার আলোয় ধরে পবিত্রবাবু খাতার মলাট সন্তর্পণে ওল্টালেন। তারপর চশমাটা খুলে টেবলে রেখে সরু চোখে প্রথম পাতায় কিছুক্ষণ তাকিয়ে পাতা ওল্টালেন।
কণা লক্ষ্য করছিল ওঁর মুখে কী কী ভাবের উদয় হয়। কোন স্কেচটা দেখছেন সেটা ওর মুখ থেকে ধরতে পারা যায় কিনা, এটা বেশ মজার ব্যাপার। মুখটা লম্বাটে, নাকটা উঁচু হয়ে সাঁকোর মতো নেমেছে, কানদুটো ছোট এবং তাতে কাশফুলের মতো পাকা চুল। গালে, ঠোঁটের কোলে গভীর রেখা, সামনের চুল ওঠা, লম্বা গলার নলিটা প্রকট।
দেখতে দেখতে কণার ইচ্ছা হল স্কেচ করে নিতে। থলি থেকে একটা কাগজ বার করে স্কেচবোর্ডে এঁটে, কোলের উপর রাখল। চার কোল পেন্সিলের দ্রুত টানে মুখের অবয়বের বহির্রেখা এঁকে ফেলল।
”এই ভিখিরি ছেলেটার হাতে এটা কী?”
”কোনটে?” কণা মুখ না তুলে জানতে চাইল।
”এই যে ট্রেনের কামরায় গুঁতোগুঁতি মারামারি চলছে ওঠার জন্য আর দূরে দাঁড়িয়ে ছেলেটা, মুখে লম্বা মতো কি একটা।”
”ভেঁপু, তালপাতার। রথের দিনে স্কেচ করা। একটা ঊর্ধ্বশ্বাসে দৌড়চ্ছিল ট্রেন ধরতে তখন তার হাতের থলি থেকে পড়ে যায়।”
”টের পেল না?”
”না। মানুষের তখন হুঁশ থাকে না। আপনি সন্ধেবেলায় লোকাল ট্রেনে কখনো চেপেছেন?”
পবিত্রবাবুর খেয়াল হল কণা তার দিকে বারবার তাকিয়ে কী যেন আঁকছে। চেয়ার থেকে উঠে দেখে নিলেন।
”চা খাবেন?” উত্তরের অপেক্ষা না করেই চিৎকার করলেন, ”অবনী অবনী।” এরপর দরজার দিকে তাকিয়ে, ”দুটো চা, আর ইন্দ্রনাথকে বলে দিও আমারটায় কাল চিনি দিয়েছিল যতটা তার থেকেও যেন কম দেয়, তুমিও খাবে নাকি?…আচ্ছা তাহলে তিনটে বলে দাও, জলদি দেয় যেন।”
কণা আর মুখ তোলেনি। পবিত্রবাবু মুখটা শক্ত করে ফেলেছেন। সন্তর্পণে স্কেচ খাতার পাতা উল্টে বললেন, ”ভালোই হয়েছে। আমাদের একটা নিচু ক্লাসের স্বাস্থ্য বই বেরবে। তাতে কিছু ছবি দেওয়া হবে। আদর্শ গ্রামের, ঝকঝকে তকতকে বাড়ি, রাস্তা, পুকুর, বাগান…দাঁতমাজা, নখ কাটা, চুল আঁচড়ানো মাথা, মশারি টাঙিয়ে শোয়া, আজকাল ম্যালেরিয়া হচ্ছে তো,….শিরদাঁড়া সোজা রেখে পড়তে বসা…খুব ইম্পর্ট্যান্ট এগুলো।”
কণা এবার মুখ তুলে শুনছিল। বলল, ”আমরা ক্লাস টু-তে এসব ছবি দেখেছি।”
অবনী সেই সময় ঘরে ঢুকল। উত্তেজিতস্বরে বলল, ”দোকান বন্ধ করে দিয়েছে ইন্দ্রনাথ। রাস্তায় কী লোক, বেরিয়ে এসে একবার দেখুন।”
”কেন?” পবিত্রবাবু ভ্রূ কুঁচকে চেয়ারে সোজা হলেন।
”ইন্দিরা গান্ধীকে গুলি করেছে বললুম না। বাস-ট্রাম বন্ধ করে দিচ্ছে, দোকানও। আমাদের দরজা বন্ধ করে দোব?”
ব্যস্ত হয়ে পবিত্রবাবু উঠলেন। কণা স্কেচটা হাতে নিয়েই ওঁর পিছন পিছন ঘর থেকে বেরিয়ে এসে দেখল কিছুক্ষণ আগের মহাত্মা গান্ধী রোডটার চেহারা একদম বদলে গেছে। লোকে ভরে উঠেছে রাস্তা। এত লোক এল কোথা থেকে! সবার মুখেই বিস্ময়, উত্তেজনা, বিভ্রান্তি। প্রত্যেকে কথা বলতে চাইছে। হাঁটাচলা বদলে গেছে, কেউ এখন আর মন্থর নয়।
”বন্ধ করে দাও দরজা, গেট টেনে দাও।”
পবিত্রবাবু রাস্তায় নেমে এলেন। তার পিছনে কণাও। পাশের নিমন্ত্রণ কার্ডের দোকানের দরজা ভেজিয়ে মালিক দাঁড়িয়ে। পবিত্রবাবু তাকে জিজ্ঞাসা করলেন, ”হল কী? সত্যি সত্যি নাকি গুজব ছড়িয়ে লুটপাট করার ধান্দা?”
”না দাদা, সত্যিই। আমার ভাইয়ের বন্ধু এইমাত্র বলে গেল পি টি আই অফিস থেকে সে জেনে এসেছে ইন্দিরাকে হাসপাতালে নিয়ে গেছে, অবস্থা খুব খারাপ। তাছাড়া রেডিয়োতে স্পেশাল বুলেটিনে নাকি বলেছে, ইন্দিরার ওপর অ্যাটেম্পট হয়েছে, অবস্থা নাকি খুব খারাপ।”
”সাত-আটজন পথচারী ততক্ষণে জমে গেছে ওদের পাশে। কেউ গলা চড়িয়ে কিছু বললেই তাকে ঘিরে লোক জমে যাচ্ছে।
”কীভাবে অ্যাটেম্পড হল, শুনেছেন কিছু?”
”না, মনে তো হয় গুলি করেছে।”
”কোথায়? অফিসে?”
”তা-ও জানি না।”
ভিড় জমে গেছে দেখে লোকটি অস্বস্তিভরে পিছিয়ে গিয়ে দরজা ঠেলে দোকানে ঢুকে গেল।
”কী অদ্ভুত অবিশ্বাস্য ব্যাপার!”
”খুব খারাপ হল, এবার খুব খারাপ অবস্থা হবে দেশের।”
নিজের কাছেই ব্যাপারটা যে কেমন লাগছে, কণা তার বিন্দুবিসর্গও বোধ করতে পারছে না। তার মাথার মধ্যে সাদা একটা পরদা ঝুলে গেছে, তাতে কোনো ছায়া বা ছবি পড়ছে না।
রাজনীতি বা রাজনীতি-করা লোকেদের সম্পর্কে তার কোনো আগ্রহ নেই। বাড়িতেও কখনো গুরুত্ব দিয়ে রাজনীতির কথা ওঠে না। তবে এত বড় মাপের মানুষের অপ্রত্যাশিত এবং অস্বাভাবিক মৃত্যুর কথা শুনলে মাথার মধ্যে নিঃশব্দে প্লাবন ঘটে যেতেই পারে। ইন্দিরা গান্ধীর অজস্র ভাবের ও ভঙ্গির অসংখ্য ছবি সে দেখেছে। তার একটাও এখন মনে পড়ছে না।
