তারপর ঘরের কোণে বসা টেবলে ঝুঁকে একটা মোটা খাতায় কাজে ব্যস্ত মাঝবয়সী লোকের দিকে আঙুল দেখিয়ে বললেন, ”পবিত্রবাবুকে বলে রাখছি কিছু কাজ যদি তোমায় দিতে পারেন। অনেকেই তো করেটরে, তাদের বিনা কারণে বরবাদ করাটাও তো ঠিক হবে না, সবাইকেই তো দেখতে হবে।”
কলেজ স্ট্রিট মোড় থেকে মহাত্মা গান্ধী রোড ধরে পূর্বে শেয়ালদার দিকে যেতে রাস্তাটা যেখানে সামান্য বাঁক নিয়েছে তার কিছু ডানদিকে রায় অ্যান্ড ঘোষ। ফুটপাত থেকে তিন ধাপ সিঁড়ি, তারপরই প্রায় পনেরো ফুট কোলাপসিবল লোহার দরজা, তার পিছনে কাঠের দরজা। সাধারণত এক-চতুর্থাংশ বন্ধই থাকে। বিবর্ণ, ময়লাধরা কাঠের কাউন্টারের ওধারে দুটি লোক টুলে বসে থাকে। র্যাকে নানান আকারের, নানান মলাটের পাঠ্য এবং অন্যান্য ধরনের বইয়ে মেঝে থেকে দশ ফুট উচ্চচতা পর্যন্ত দেয়াল ঢাকা। কাউন্টারের এক প্রান্তে ভিতরের অফিস ঘরে যাওয়ার দরজা, আর একটা দরজা গুদামে যাওয়ার।
কণা পৌঁছে দেখল কাউন্টারে একজন কর্মচারী। রুগণ, ফ্যাকাশে মুখ, আধ-ময়লা খয়েরি পাঞ্জাবিপরা বছর তিরিশের লোকটিকে জানাল, তারকবাবুর সঙ্গে দেখা করতে চায়। রাস্তার দিকে তাকিয়ে লোকটি ক্ষীণস্বরে বলল, ”আসেননি এখনো।”
বিব্রত হয়ে হাতঘড়ি দেখে নিয়ে কণা বলল, ”এগারোটাতেই আসতে বলেছিলেন।”
”আসবেন, হয়তো ট্রেন লেট আছে।”
”ট্রেনে আসবেন?”
”সোনারপুরে থাকেন। আপনি একটু অপেক্ষা করুন।” পাশের খালি টুলটির দিকে একটু হেলে লোকটি ইঙ্গিত করল। কাউন্টারের কাটা জায়গাটা দিয়ে ভিতরে ঢুকে কাঁধের ঝোলাটা কাউন্টারের উপর রেখে টুলে বসার সময় কণা বলল, ”পবিত্রবাবু আছেন কি?”
”ভেতরে।”
”যাব ভেতরে?”
লোকটি মাথা হেলায়। কণা ঢোকার আগে দরজা দিয়ে উঁকি দিল।
”আসব?”
পবিত্রবাবু একটা পাতলা বই চোখের সামনে তুলে ধরে চেয়ারে হেলান দিয়ে। চশমাটা টেবলে ছিল, সেটা চোখে লাগিয়ে তিন-চার সেকেন্ড পর এক গাল হেসে বললেন, ”আসুন আসুন।”
ঘরটা যেমন স্যাঁতসেঁতে তেমনি শব্দহীন। মোটা দেয়াল ভেদ করে রাস্তার অবিরাম হরেকরকম আওয়াজ ভিতরে আসে না। দুটি জানালাই ঘরের পিছন দিকে, যার ওপারে একটা উঠোন, তালাবন্ধ ঘরের দরজা আর দোতলা থেকে ঝোলানো শাড়ির কিছুটা দেখা যাচ্ছে। ঘরে আলো কম। সিলিং ফ্যানটা বন্ধ। কার্তিকের মাঝামাঝি তবু এইসময় কলকাতায় ঠান্ডা অন্তত পড়ে না। গরম লাগছে না বটে কিন্তু পাখাটা ঘুরলে ভ্যাপসা গন্ধটা হয়তো থাকত না।
”আজই আসার কথা ছিল, এই সময়েই।”
পবিত্রবাবু নিজেই জানিয়ে দিলেন। কণা আশা পেল। ঝোলাটা কাঁধ থেকে চেয়ারের পিঠে ঝুলিয়ে দিল।
”কী আছে ওতে?”
”কিছু কাগজ, ড্রইং খাতা, পেন্সিল।”
”গবরমেন্ট আর্ট কলেজ, সেই জাদুঘরের পাশে?”
”হ্যাঁ।”
”কোন ইয়ার?”
”থার্ড ইয়ার।”
”কী আঁকা শিখতে হয়?”
পবিত্রবাবুর মুখে শিশুর কৌতূহল। কিন্তু এসব আলোচনার জন্য তো এখানে আসা নয়। কণা অন্য কাজে এলে জবাবে বলত, ‘তারকবাবু কখন আসবেন বলতে পারেন? অথবা উনি তো নেই, আপনাকে তো বলে গেছেন কাজ যদি কিছু…।’
এই লোকটি কাজ দিতে পারে। সুতরাং কণা হুঁশিয়ার হল। পবিত্রবাবুকে অখুশি করাটা ঠিক হবে না।
”অনেক রকম আঁকাই তো আছে। স্টিল লাইফ, অয়েল আর ওয়াটার কালারে পোট্রেট, ল্যান্ডস্কেপ পেইন্টিং, অ্যান্টিক স্টাডি।”
”ওরে বাবা, এসবের একটাও বুঝি না। আচ্ছা, এই যে সব সিন-সিনারি দেখি রাস্তার ধারে টাঙিয়ে বিক্রি করে, ওসব আঁকা শিখতে হয়?”
”হয়।”
বহু বছর আগে আমি একটা কিনেছিলুম, হেদোর রেলিংয়ে টাঙিয়ে বিক্রি করছিল। দোকান থেকে ফিরছিলুম, রাত হয়ে গেছল। ঘন নীল রঙের আকাশ; তিনটে নারকেল গাছ, নদী, পালতোলা একটা নৌকো, বিরাট চওড়া নদীর ওপারে গ্রাম, কুঁড়ে ঘরের চালা আর সাদা একটা চাঁদ। নদীর জলে সাদা একটা জোছনা চিকচিক করছে, ওপারটাও ভেসে যাচ্ছে। কী ভালো যে লাগল। আড়াই টাকা দিয়ে কিনে ফ্রেমে বাঁধিয়ে শোবার ঘরে রেখে দিলুম। ওহ, হ্যাঁ, দুটো পাখি ঠিক চাঁদের ওপর দিয়ে উড়ে যাচ্ছে, পাখিদুটো কী হতে পারে? আমার ধারণা বক, বউ বলেছিল চখাচখি।”
পবিত্রবাবু জিজ্ঞাসুচোখে তাকিয়ে। কাজের কথার ধার দিয়ে যাবার কোনো ইচ্ছা দেখাচ্ছেন না। কণা ইচ্ছে করেই হাতঘড়ি দেখল কিন্তু টেবলের ওধারে তার মনোবাসনা পৌঁছল না।
”আপনি বক দেখেছেন?”
”নিশ্চয়, ট্রেনে যতবার চেপেছি, কলকাতা একটু ছাড়ালেই দেখতে পেয়েছি।”
”তাহলে বুঝতে পারছেন না কেন ওটা বক না অন্য পাখি?”
পবিত্রবাবু অপ্রতিভতা কাটাবার জন্যই যেন বললেন, ”আর্টের ব্যাপার তো, কত রকমের কায়দা যে হয়। সিংহ এঁকে কানদুটো খরগোশের মতো করে দিল, মেয়েছেলের বুকটা পেটে, পাছাদুটো বগলে বসিয়ে দিল-এই সেদিন একটা ম্যাগাজিনে দেখলুম। আচ্ছা, কেন এসব করে বলুন তো? সোজা জিনিসটাকে সোজা করে আঁকতে পারে না? এসব কি, ঘোড়ার ডিমের আর্ট!”
কণা স্মিত হাসি মুখে ধরে রাখল। ঠিক তখনই দরজার কাছে দাঁড়িয়ে কাউন্টারের কর্মচারীটি দুর্বল গলায় বলল, ”পবিত্রবাবু, ইন্দিরা গান্ধীকে নাকি গুলি করে মেরে ফেলেছে?”
চোখ কুঁচকে পবিত্রবাবু তাকালেন, ঠোঁটদুটো ছুঁচলো করলেন, কী যেন ভাবলেন।
”তোমাকে কে বলল?”
”রাস্তায় বলাবলি হচ্ছে, রেডিয়োতে নাকি বলেছে।”
