রামিন্দারের গালের হাড়ে চিড় দেখা গেছে। ডাক্তার জানিয়েছে দু’সপ্তাহ তার খেলার কোনো প্রশ্নই ওঠে না। লাঞ্চে চার উইকেটে ১২৫ রান। আর একটি উইকেট পড়ল ১৩৩ রানে যখন আনন্দ বোল্ড হল বয়েডের ইয়র্কারে।
ড্র হবার ম্যাচ হঠাৎ পরাজয়ের ম্যাচে রূপান্তরিত হল। পরের ব্যাটসম্যান রেগে। হঠাৎ তুমুল উচ্ছ্বাসের মধ্যে দেখা গেল রেগে নয় রামিন্দার মাঠে নামছে। দু’ঘণ্টা আর কুড়ি ম্যান্ডেটরি ওভার তখনও বাকি। যেভাবে উপরের দিকের বাটসম্যানরা আউট হল তাতে শেষের প্রতিরোধ সম্পর্কে কারুরই ভরসা থাকার কথা নয়।
গালে তুলোর উপর প্লাস্টার আঁটা, ওটাই রামিন্দারের সারা অস্তিত্বের মধ্যে প্রথমেই চোখ টেনে রাখল দর্শকদের। চ্যালেঞ্জের সংকেত ওর উঁচু করে তুলে ধরা চিবুকে, হালকা পদক্ষেপে বা শান্ত চাহনিতে। মনে হচ্ছে যেন একটা বাঘ শিকার ধরতে এগোচ্ছে।
সেদিন সরোজ অফিসে ফিরে এসে প্রথমে গুহঠাকুরতাকে একটা টেলেক্স করে। তাতে সে জানায়, ‘ভবানী সম্পর্কে যে লেখাটা পাঠিয়েছিলাম সেটা ছাপবেন না। তাতে যে মেয়েটির কথা লিখেছি আদপে তার কোনো অস্তিত্বই নেই। পরে ভবানী সম্পর্কে লিখব। তার বদলে রামিন্দার সম্পর্কে লেখা পাঠাচ্ছি। কীভাবে সে হারের কিনার থেকে দলকে টেনে আনল এবং তার নিজের প্রত্যাবর্তনের কথা। একটু বড়ো হবে। আশা করি, জায়গার অকুলান হবে না।’
এর পর সরোজ রাশি রাশি শব্দের মধ্যে ডুবে গেল রামিন্দারের ইনিংসটা তুলে আনার জন্য। তার মধ্যে কয়েকবার সে আনমনা হয়েছিল এবং আপনমনে হেসে মাথা নেড়েছিল।
দূরদৃষ্টি
দূরদৃষ্টি – মতি নন্দী – উপন্যাস
এক
কণা পরের দিন খবরের কাগজ থেকে সময়টা জেনে হিসেব করে দেখেছিল, যখন সে ন’টা-ষোলোর শেওড়াফুলি লোকাল ধরার জন্য হিন্দমোটর স্টেশনের প্ল্যাটফর্মে দাঁড়িয়ে তখন সফদরজং রোডের বাড়ি থেকে বেরিয়ে ইন্দিরা গান্ধী আকবর রোডের অফিসের দিকে হেঁটে যাচ্ছিলেন। তাঁকে যখন একটা অ্যাম্বাসাডারে অল ইন্ডিয়া ইন্সটিটিউট অব মেডিক্যাল সায়েন্সে নিয়ে যাওয়া হচ্ছিল তখন শেওড়াফুলি লোকাল স্টেশনে ঢুকেছে। প্রায় আঠারো মিনিট লেট। আট বছর আগে এমার্জেন্সির সময় ট্রেন নাকি কাঁটায় কাঁটায় ছাড়ত আর পৌঁছত, এ কথা কণা প্রায়ই ট্রেনে কারুর না কারুর মুখে শুনতে পায়।
হাওড়া স্টেশনে ঢোকবার আগে সিগন্যাল না পেয়ে ট্রেনটা বামনগাছি ব্রিজের কাছাকাছি দাঁড়িয়ে থেকেছিল। হিসেব করে কণার মনে হয়েছে, ওই সময়ই ইন্দিরা গান্ধীকে লিফটে করে ন’ তলায় অপারেশন থিয়েটারে নিয়ে যাবার আগে ক্যাজুয়ালটি সেকশানে রাখা হয়। তখন এক ডাক্তার তাঁর নাড়ি টিপে কোনো স্পন্দন পাননি, চোখ পরীক্ষা করে দেখেন, মণি বড় হয়ে গেছে এবং নিথর।
জীবের শারীরিক মৃত্যু কখন ঘটে, কণা বছর পাঁচ আগে একদিন তার মা শুভাননাকে এই প্রশ্ন করেছিল। ভদ্রেশ্বরে রামকৃষ্ণ কমলাবালা বালিকা শিক্ষামন্দির নামের মেয়ে স্কুলে শুভাননা প্রধান শিক্ষিকা। জীবনবিজ্ঞান তাঁর নিজস্ব বিষয় কিন্তু বিজ্ঞানের সব শাখাই তিনি পড়িয়ে থাকেন। কণা এই স্কুল থেকেই উচ্চচ মাধ্যমিক পাস করেছে। এখন যতদূর তার মনে পড়ছে, মা বলেছিলেন, মৃত্যুর ঠিক মুহূর্তটি আজও ধরা যায়নি। এই নিয়ে অনেক মত রয়েছে। চলতি ধারণাটা হল, কোনো লোকের হৃদস্পন্দনের শব্দ দু মিনিট না পাওয়া গেলেই মৃত ধরে নেওয়া হবে। আর একটা মত হল, মস্তিষ্কের ক্রিয়া বন্ধ হলেই মৃত্যু ঘটে। জীবন-সহায়ক যন্ত্রপাতি, ওষুধপত্তর দিয়ে কৃত্রিমভাবে কোনো লোকের দেহের দরকারি কাজগুলোকে টিকিয়ে রাখা যায় বটে এমনকি গর্ভে সন্তান থাকলে সে বেঁচেও থাকতে পারে কিন্তু মস্তিষ্কের কর্মক্ষমতা না থাকলে বাঁচার কোনো আশাই থাকে না। মস্তিষ্কের মৃত্যুর একটা লক্ষণ হল নিথর, ছড়িয়ে যাওয়া চোখের মণি যার কোনো রকম প্রতিক্রিয়া আলোয় হয় না। কণা ধরে নিল, যখন সে কলেজ স্ট্রিট বাজারের স্টপে বাস থেকে নেমেছে ততক্ষণে ইন্দিরা গান্ধী মারা গেছেন।
রায় অ্যান্ড ঘোষ পাঠ্য বইয়ের বড় ব্যবসায়ী। তার অন্যতম অংশীদার তারকনাথ ঘোষের সঙ্গে কণার দেখা করার সময় এগারোটা। কণা সরকারি আর্ট কলেজে তৃতীয় বর্ষের ছাত্রী। নানান পাঠ্য বইয়ের জন্য বিশেষত বিজ্ঞান বিষয়ে, ছবি, ডায়াগ্রাম, অক্ষর, চার্ট ইত্যাদি দরকার হয়। আঁকার কাজ পাবার জন্য মায়ের চিঠি নিয়ে এক সপ্তাহ আগে সে দেখা করেছিল তারক ঘোষের সঙ্গে। বিরাট ডিগ্রিওলা এক অধ্যাপকের লাইফ সায়েন্সের চারখানা বই শুভাননাই লিখে দিয়েছে বেনামিতে আর এরাই প্রকাশক। প্রশ্নোত্তরে উচ্চচ মাধ্যমিক বিজ্ঞানের একখানি বই লেখায় শুভাননা এখন ব্যস্ত। তারক ঘোষ বিব্রত হয়েও কণার প্রতি সহৃদয় ছিলেন।
”বাহ চমৎকার নাম তো, শুভাননার মেয়ে শিশিরকণা, বাবার নাম?…য়্যাঁ তুষার! তাহলে তো তুষারকণা, না না তুষারকন্যা হলেই তো ভালো হত।” তারক ঘোষ এইভাবে শুরু করেছিলেন। তারপর ”মা কেমন আছেন? সেদিন এক আত্মীয়ের ছেলের ভাতে শ্রীরামপুর গেছলাম। ফেরার সময় ভাবলাম একবার নেমে মিসেস সেনগুপ্তর সঙ্গে দেখা করি কিন্তু প্রেসারটা বেড়ে ওঠে…আর ট্রেন থেকে নামলাম না। এখন তো দেবার মতো কাজ কিছু নেই, তুমি দিন সাতেক পর, বুধবারই এসো, এইরকম সকাল এগারটা নাগাদ, আমি তারমধ্যেই এসে যাই।”
