”প্লিজ, তাড়াতাড়ি।”
”এত উতলা হচ্ছ কেন, রাতে ফেরেনি তো কী হয়েছে?”
”বলছ কী! একটা অল্পবয়সি মেয়ে সারারাত বাড়ির বাইরে দুটো বদমাইশের সঙ্গে কাটাচ্ছে আর তার মা উতলা হবে না?”
”এখন ওরা বদমাইশ হয়ে গেল আর ওদের দেওয়া টিকিটে যখন সেজেগুজে খেলা দেখতে গেছলে তখন কি ওদের দেবদূত মনে হচ্ছিল?”
বীণা রাগে আর বিতৃষ্ণায় মুখ ঘুরিয়ে রাখল। ঠোঁট থরথর করছে, মুঠো বন্ধ, দৃষ্টি জ্বলন্ত। সরোজকে শুনিয়ে আপনমনে বলল, ”ট্রেনে দেখা না হলেই দেখছি মঙ্গল ছিল।”
”কোনোকালে দেখা না হলে আরও মঙ্গল হত, রোজা জন্মাত না, আজকের এই ঝঞ্ঝাটেও পড়তে হত না।”
”হোয়াট ডু ইউ মিন? রোজা জন্মাত না মানে?”
”সরল কথার আবার মানে? রোজা তো আমার মেয়ে।”
বীণা দাঁড়িয়ে উঠল লহমায়।
”কে বলল তোমার মেয়ে? রোজা আমার স্বামীর।” বীণার স্বর চিরে গেল।
সরোজ তীক্ষ্ন চোখে তাকাল। সে যেন প্রত্যয়ের অভাব দেখতে পেল বীণার মুখে। বিবর্ণ হয়ে যাচ্ছে ঠোঁট। চাহনির ঔজ্জ্বল্য স্তিমিত।
”মিথ্যা কথা বোলো না। সরোজের মেয়ে সরোজা, দুজনের মুখের মিলও অদ্ভুত।”
বীণা মাথা নাড়তে লাগল।
”রোজা আমার স্বামীর।”
”তাহলে যে বলেছিলে প্রেগনান্ট হয়েছ?”
”মিথ্যে বলেছিলাম তোমাকে প্রেশার দেবার জন্য, বিয়েতে বাধ্য করার জন্য।”
”তুমি রোজাকে পেটে নিয়েই বিয়ে করেছ?”
”কী আবোলতাবোল বকছ। ওঠো এবার। এসব কথা রোজার কানে গেলে ওর জীবনটাই নষ্ট হয়ে যাবে।”
”নাহ। যতক্ষণ না সত্যি বলছ আমি উঠব না। যদি নিজে ওকে খুঁজে নিতে পারো তো নাও।”
”পুলিশের হেল্প নিয়ে বার করব। তুমি কি ভেবেছ আমি পারি না?”
বীণা দরজার দিকে এগোল। পেয়ালায় আবার চা ঢালতে ঢালতে সরোজ বলল, ”পুলিশ বার করে দেবে ঠিকই। কিন্তু তারপর। বিখ্যাত একটি ছেলে এতে ইনভলভড। খবর চাপা থাকবে না। ছবিসমেত কাগজে খবর বেরোবে। মিস্টার রাওয়ের মানসম্মান…”
সরোজ থেমে গেল এবং দ্রুত উঠে এগিয়ে গেল। বীণা মেঝেয় বসে পড়েছে, ডান হাতটা দেয়াল থেকে বেয়ে বেয়ে নামছে, বাঁ হাত বুকে চেপে ধরা। মুখ কোলের মধ্যে ডুবে গেল। বীণার পাশে উবু হয়ে বসে সরোজ দু’হাতে কাঁধ ধরে নাড়া দিল।
”কী হয়েছে? কী হল?”
”আমি কী করব, কী তখন করতে পারি! সহায় সম্বল নেই, একা… আর কী করার ছিল? তুমিও প্রত্যাখ্যান করলে।”
বীণা কাঁদছে।
.অটোরিকশায় পনেরো মিনিটের মধ্যে ওরা পৌঁছল। দরজার বেলের সুইচ টিপে দুজনে অপেক্ষা করল। সাড়া না পেয়ে আরও কয়েকবার ঘনঘন টিপল।
দরজার ওপাশে মৃদু গজগজানি, পায়ের শব্দ। দরজা খুলে খালি গা, শর্টস পরা শঙ্কর ভারী চোখে তাকিয়ে রইল। ওকে ঠেলে সরোজ তার পিছনে বীণা ভিতরে ঢুকল।
আলো জ্বলছে। মাংস পোড়ার মতো বিশ্রী গন্ধে বাইরের বসার জায়গাটা ভরে আছে। সরোজ বুঝতে পারল এই গন্ধ গাঁজার। শঙ্কর চোখ খুলে তাকাবার চেষ্টা করছে। অবশেষে সোফাটায় বসে পড়ল। হাত তুলে শোবার ঘরের দরজাটা দেখিয়েই সে ধীরে ধীরে শুয়ে পড়ল।
পর্দা সরিয়ে ঘরের মধ্যে কিছু দেখতে পেল না সরোজ। তবে অনুমান করল কেউ একজন শুয়ে। বীণা তার পিছন থেকে উঁকি দিল।
হাতড়ে সুইচ বোর্ড পেয়ে সরোজ একটা সুইচ টিপতেই একটা পাখা ঘুরে উঠল। যে ক’টা সুইচ সব ক’টিই সে টিপল এবং আলোয় ঘর ভরে যেতেই সরোজের পিছন থেকে তীক্ষ্ন আর্তনাদ করে বীণা ছুটে গেল।
রোজা কার্পেটে কাত হয়ে শুয়ে। শঙ্করের ”লাভ মি” ছাপমারা গেঞ্জিটা গায়ে জড়ানো। জিনসের ট্রাউজার্সটা কোমর থেকে নামানো। খাটে চিত হয়ে পা ছড়িয়ে খালি গায়ে শুয়ে ভবানী। বুকটা হাপরের মতো ওঠানামা করছে। সারা ঘর ভরে আছে গাঁজার গন্ধে।
রোজার বুকে কান চেপে বীণা স্পন্দন শোনার পর ট্রাউজার্সটা টেনে তুলতে লাগল। সরোজ জানলা খুলে পাখা চালিয়ে দিল। রোজাকে টেনে বসিয়ে সরোজ ধরে রইল আর বীণা গেঞ্জিটা পরিয়ে দিল।
”এখান থেকে নিয়ে যেতে হবে, এখুনি।”
”চলার ক্ষমতা নেই। ট্যাক্সি ডেকে আনি।”
রাস্তায় বেরিয়েই সরোজ ট্যাক্সি পেল। রোজাকে পাঁজাকোলা করে যখন বেরোল, শঙ্কর এবং ভবানী তখন বেঘোরে। ট্যাক্সিতে তাকে তোলার সময় পথচারী অনেকেই তাকিয়ে গেল। ট্যাক্সিওলা সন্দেহের চোখে রোজার দিকে তাকিয়ে বলল, ”কী হয়েছে?”
”মেয়ে বেহুঁশ হয়ে গেছে জ্বরে। নার্সিং হোমে নিয়ে যাব।” সরোজ কথাটা বলে বীণার দিকে তাকাল। ”চেনা নার্সিং হোম আছে? সেখানেই আগে যাব।”
”আছে।”
.শেষ দিনে টেস্ট ম্যাচটি অকল্পনীয় মোড় নিল। লাঞ্চের পনেরো মিনিট আগে পিকার্ড হ্যাটট্রিক করল আলভা, ঠুকরাল ও শান্তনমকে আউট করে। প্রথম উইকেট পড়তেই ভবানীর বদলে ঠুকরালকে নামতে দেখে প্রেসবক্সে বিস্ময় দেখা দেয়। ঠুকরালের পরও ভবানী মাঠে নামল না। একজন বলল, ক্রাইসিস দেখা দিলে তা সামলাতে ঘোষালকে নীচের দিকে রাখা হয়েছে।
শান্তনম বোল্ড আউট হবার পর ভবানী মাঠে এল। অনিশ্চিত পদক্ষেপ, বারবার মাথা ঝাঁকাচ্ছে, শরীর যেন আর বইতে পারছে না। সে ওয়ালেসের তিনটি বলের সম্মুখীন হয়। প্রথম দুটি ফসকায় এবং স্টাম্প ঘেঁষে চলে যায়। তৃতীয়টিতে বিরক্ত হয়ে দু’পা বেরিয়ে মারতে গিয়ে হুমড়ি খেয়ে পড়ে এবং স্টাম্পড। ফেরার সময় ওর মুখ দেখে সরোজের কষ্ট হল। দুই ইনিংসেই শূন্য করার জন্য ভবানীর মুখে যে লজ্জা বা হীনতা বোধ প্রত্যাশিত ছিল তার কোনো চিহ্ন সে দেখতে পেল না; কেননা, ওর স্নায়ুর কাজ করার ক্ষমতা এখন অসাড় হয়ে আছে। ঘোলাটে চাহনিতে তাকাতে তাকাতে সে অদৃশ্য হয়ে গেল প্যাভিলিয়নের মধ্যে।
