ভারতের ইনিংস শেষ হয়েছে ৩০৪ রানে। শেষ দুটি উইকেট নিতে পঁয়তাল্লিশ মিনিট অপেক্ষা করতে হয়েছিল নিউজিল্যান্ডারদের। প্রায় তিনশো রানে পিছিয়ে ফলো-অন করে আলভা ও শর্মা ম্যাচে দ্বিতীয়বার চমৎকারভাবে ইনিংস পত্তন করেছে। দেড়ঘণ্টায় ৫৫ রান তুলেছে দুজনে। তাদের ব্যাটিং থেকেই বোঝা যাচ্ছিল ব্যস্ততা, দ্বিধা বা ভয় থেকে বেরিয়ে আসতে পেরেছে। পঞ্চম দিনটা নির্বিঘ্নে কাটিয়ে দেওয়া এমন কিছু কঠিন ব্যাপার হবে না সবক’টি উইকেটই যখন অটুট রয়েছে।
রমেন গুহঠাকুরতা বার্তায় জানিয়েছে, ছবিগুলো রামকুমার ভালো তুলেছে। ভবানী সম্পর্কে লেখাটা ও সঙ্গে ছবি দেওয়ার মতো জায়গা পাওয়া যাচ্ছে না। ইতিমধ্যে লেখাটায় সে আর কিছু যদি সংযোজন দরকার মনে করে তো করতে পারে।
সরোজ জবাব দেয়নি। লেখা শেষ করে ঘরে এসেছে। বীণার বাড়িতে এখন নিশ্চয় ভবানী আর শঙ্কর মিলে হইচই শুরু করেছে। রোজার বন্ধুরা, বীণার প্রতিবেশীরা জানতে পারছে এখন দেশের সবথেকে পরিচিত যুবকটি কোথায়। এতে হয়তো রাওদের খাতির বাড়বে।
বেয়ারাকে দিয়ে তন্দুরি মুরগি নান আর বিয়ার আনিয়ে সরোজ একাই পার্টি দিল নিজেকে। খাওয়ার মাঝে ফোন এল। ওধারে শঙ্কর।
”সরোজদা কচ্ছেন কী ঘরে বসে, লিখে যাচ্ছেন নাকি এখনও? চলে আসুন চলে আসুন, দারুণ গ্যাদারিং, রোজা, মিসেস রাও আপনার কথা বারবার বলছে। আসলে দোষটা আমারই, আপনাকে নিয়ে আসার কথা ছিল আমারই আর আমি একদমই ভুলে গেছি।”
সরোজ শুনতে শুনতে দ্রুত ভেবে যাচ্ছিল কী বলবে।
”আসছেন তো, প্লিজ আসুন, নইলে এরা আমায় ক্ষমা করবে না।”
”মিসেস রাওকে বরং ডেকে দাও।”
”দিচ্ছি।”
কয়েক সেকেন্ড পরে বীণার গলা ভেসে এল।
”কী ব্যাপার, আসছ?”
”বীণা একদমই ভুলে গেছি বলতে, আজ একজনের বাড়িতে যাওয়ার কথা, নিয়ে যাবার জন্য ভদ্রলোক গাড়ি নিয়ে এসেছেন। আজ মাপ করে দাও।”
”তাহলে আসছ না?”
”না। এখানে অনেকদিন আগেই যাব বলে রেখেছি। শঙ্কু বলল দারুণ জমায়েত, রোজা কী করছে?”
”ও খুব মরোজড, ভবানী যেভাবে আউট হল!”
”আরে ক্রিকেটে এসব ঘটেই…আচ্ছা পরে কথা হবে’খন…গুড নাইট।”
ফোন রেখে সরোজ গুম হয়ে কিছুক্ষণ বসে থেকে খাওয়া শেষ করেই শুয়ে পড়ে। সে এটাকে তার খাঁটি রাগ না অভিমান, কীসের প্রকাশ হিসাবে গণ্য করবে তা ঠিক করতে পারেনি। নিশ্চিন্ত গাঢ় হয়নি তার ঘুম।
বহুদূর থেকে ভেসে আসা দমকলের ঘণ্টার শব্দ তার মাথার মধ্যে বেজে যাচ্ছিল। তাইতে ঘুম ভেঙে যায়। শব্দটা কিন্তু থামল না, মাঝে মাঝেই বেজে যেতে থাকে। চেতনা থেকে ঘুমের রেশ কেটে যেতেই সে ধড়মড়িয়ে উঠে পড়ল। শব্দটা ফোন বাজার।
”হ্যালো।”
”সরোজ? রোজা কোথায়?” বীণার স্বরে আর্তনাদ।
”মানে?” সরোজ অবাক বীণার গলা শুনে এবং প্রশ্নটিতে।
”কাল রাতে ভবানী আর শঙ্করের সঙ্গে বেরোল, শেরাটনে ভবানীকে পৌঁছে দিয়ে ফিরে আসার কথা কিন্তু এখনও ফেরেনি।” কান্নাচাপা উদ্বিগ্ন স্বরে বীণা বলল।
সরোজ টেবলে রাখা ঘড়িটা তুলে সময় দেখল সাতটা-পঁয়ত্রিশ।
”জানো কোথায় ওরা?”
”আমি কী করে জানব।” সরোজের গলায় ঝাঁঝ এসে গেল, ”শেরাটনে খোঁজ নেওয়া উচিত ছিল প্রথমেই, তারপর পুলিশে।”
”শেরাটনের রিসেপশনিস্ট খবর নিয়ে বলল ভবানী কাল হোটেলেই ফেরেনি। ওরা কি কাল রাতে অন্য কোথাও…”, বীণার গলা থেকে এরপর ফোঁপানির মতো আওয়াজ বেরিয়ে এল।
”শঙ্কর কোথায় রয়েছে বলতে পারো?”
”পারি।”
”আমাকে ঠিকানাটা দেবে?”
”ঠিকানা জানি না তবে জায়গাটা চিনি।”
”তাহলে আমি তোমার ওখানে যাচ্ছি, আমাকে একটু জায়গাটা চিনিয়ে দিয়ো।”
বীণা ফোন রাখল। হতভম্ব বোধটা কেটে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে সরোজ বেরোবার জন্য তৈরি হতে লাগল। ব্যাপারটার গুরুত্ব এবং আকস্মিকতা তার চিন্তাক্ষমতাকে ঘেঁটে দিয়েছে। গুছিয়ে ভাবার মতো অবস্থা ফিরে পেতে পেতেই দরজায় খটখট শব্দ হল।
”ভেতরে এসো।” দরজার পাল্লাটা সরোজ মেলে ধরে রইল। বীণা ভিতরে এল। সরোজ প্যান্ট্রির দিকে তাকিয়ে একটি লোককে দেখে ইশারায় চা পাঠাতে বলল।
”বোসো, চা খাও।”
”না না না, তুমি আগে নিয়ে চলো।”
সরোজ খাটে বসে পায়ের উপর পা তুলল।
”চা না খেয়ে সকালে নড়তে পারি না।” সরোজ পা দোলাতে শুরু করল। বীণা কিছু বলতে গিয়ে চুপ করে গেল। তবে রাগ চাপার লক্ষণ মুখে ফুটে উঠল।
”ওদের সঙ্গে রোজার আলাপ যদি না করিয়ে দিতে তাহলে এটা ঘটত না।”
”তোমরা, মা-মেয়ে তো পাগল হয়ে উঠেছিলে ভবানীকে বাড়িতে আনার জন্য।”
”পাগল কেন হব।” বীণা ভ্রূ কুঁচকে বলল।
”আমি তোমার বাড়ি চিনি না, কথা ছিল কেউ এসে আমাকে নিয়ে যাবে। যদি কাল নিয়ে যেতে তাহলে এই পরিস্থিতির উদ্ভব হত না।”
”শঙ্কর নিজে থেকেই বলেছিল ও তোমাকে নিয়ে যাবে।”
”আমাকে তুমি ফোন করে এটাও যদি জানাতে তাহলে আমিই শঙ্করকে তাগাদা দিয়ে…কিন্তু তুমি একে তাকে ফোন করে নেমন্তন্ন করতে সময় পাও শুধু আমাকেই…”
”একে তাকে মানে?”
দরজায় টোকা। চা নিয়ে এসেছে। সরোজ দু’পেয়ালা চা তৈরি করছিল, বীণা বলল, ”আমি খাব না। তুমি একটু তাড়াতাড়ি করো।”
কথাটা গ্রাহ্যে না-আনা বোঝাতে সরোজ মন্থরভাবে চামচ নাড়তে লাগল। তারপর ধীরেসুস্থে পেয়ালাটা ঠোঁটের কাছে এনে চুমুকের জন্য সময় দিল।
