ভবানী নামছে। শঙ্করের কথাটা সরোজের মনে পড়ল, ঠিক যেন গ্যারি সোবার্স! হাততালি এবং স্বাগত কলরব অন্যদের থেকে বেশিই সে পাচ্ছে। রোজা এবং সরোজ দেখল, নতুন একটি মেয়ে, দাঁড়িয়ে মাথার উপর হাত তুলে তালি দিচ্ছে আর চিৎকার করে যাচ্ছে।
আজকের প্রথম ওভারের পাঁচ বল এখনও বাকি। ভবানী গার্ড নিয়ে তাচ্ছিল্যভরে সাজানো ফিল্ডের উপর দিয়ে চোখ বোলাল। সিলি মিড অনে লোক এনেছে মার্কস, সিলি পয়েন্টে নিজে। অবহেলায় ফরোয়ার্ড খেলল সে দুটো বল। বাঁ পা সামান্য এগোল, অল্প ঝোঁকানো মাথা। প্রচণ্ড আস্থা বিচ্ছুরিত হচ্ছে ওর অলস নড়াচড়ার মধ্যে। গড়িয়ে বল দুটো ফিরে গেছে স্যান্ডার্সনের কাছে। সরোজ গভীর মনোযোগে দেখতে দেখতে তারিফ জানিয়ে মাথা নাড়ল। তৃতীয়টি বাউন্সার। মুখ সরিয়ে কোমরের উপর থেকে শরীরটা পিছনে হেলিয়ে দিল। বলটা কপাল ঘেঁষে চলে গেল। ভবানী তাকিয়ে রইল বোলারের দিকে। চতুর্থটি অল্প ওভারপিচ। শেষ মুহূর্তে বলটা সুইং করল, জমিতে পড়ে সরে এল ভিতরে। ভবানী ড্রাইভ করার জন্য পা বাড়িয়েছে, লিফট করা ব্যাটটা নামছে। বলের শেষ মুহূর্তের সরে আসাটা লক্ষ করেই ব্যাটটাকে থমকিয়ে সে বলটা কভার পয়েন্টের মাথার উপর দিয়ে তুলে ফেলে দিল। পারেখ রান নিতে চেয়েছিল, ভবানী ফিরিয়ে দেয়।
ক্যাচ উঠেছিল ভেবে স্বস্তির গুঞ্জন উঠল। সরোজের নিশ্বাস বন্ধ হয়ে গেল অনায়াস ব্যাপারটায়। ওভারের শেষ বল। ভবানী দৌড়ের ভঙ্গি দেখিয়ে পারেখকে তৈরি থাকতে বলল। সে যে এক রান নেবে ঔদ্ধত্যভরে তা ফিল্ডারদের জানিয়ে রেখেই স্টান্স নিল।
অফ স্পিন করিয়ে স্যান্ডার্সন বলটা তুলে দিল। ভবানী ক্রিজ থেকে ঝটিতি বেরিয়ে এসে বলটাকে ধীরে ফাঁকা মিড অফে ঠেলে দিয়ে রান নেবার জন্য দৌড়তে গিয়েই হড়কে পড়ল। স্যান্ডার্সনই দৌড়েছিল বলটা ফিরিয়ে আনতে। যখন বলটা সে তুলেছে ভবানীও তখন জমি থেকে কইমাছের মতো ছিটকে লাফিয়ে উঠে বোলার প্রান্তের দিকে দৌড় শুরু করেছে। স্যান্ডার্সন প্রায় পনেরো মিটার থেকে বলটা ছুড়ে যখন স্টাম্পে মারল ভবানী তখন ঝাঁপ দিয়েছে। চিৎকার করে চারজন ফিল্ডার হাত তুলে ছুটে গেল মোহন ঘোষের দিকে।
আঙুল উঠল।
নিউজিল্যান্ডাররা রণনৃত্য শুরু করেছে স্যান্ডার্সনকে ঘিরে। মাঠ ঘিরে বিস্ময়ের স্তব্ধতা। ভবানী বুটের তলায় ব্যাটটা ঠুকে মুখে হাসি রেখে শূন্য করে ফিরে আসছে। প্রথম ওভারেই দুটো রান আউট। দুটো ভালো উইকেট ভারত হারাল। রামিন্দরের প্রবেশ সংবর্ধিত হল ক্ষীণ কয়েকটি করতালিতে। সরোজ দেখল রোজা দু’হাতে মুখ ঢেকে কুঁজো হয়ে।
কী একটা ভয় ভারতের ব্যাটসম্যানদের মধ্যে যে ভর করল, যার ফলে তারা এলোপাথাড়ি ব্যাট চালাতে শুরু করল। পারিখা শূন্যতেই ফিরে গেল। ঠুকরাল আর শান্তনম দ্বি-অঙ্কে পৌঁছল না। আনন্দ দাঁড়াবার চেষ্টা করেছিল। ওয়ালেসের একটা আর্মার তার প্রতিরোধ ভেঙে দেয়। সে এগারো করেছে। ১৪৪ থেকে ১৮৪, আজ চল্লিশ রান ওঠার মধ্যে ছয়জন আউট। রামিন্দার অচঞ্চলভাবে ১৮ রান নিয়ে লাঞ্চে এল। রেগে দোসর রয়েছে এক রানে। এগারোটা মেডেন নিয়েছে ওয়ালেস, সঙ্গে তিনটি উইকেট।
সরোজ লাঞ্চের সময় তরুণের মুখোমুখি হতেই সে বিষণ্ণ স্বরে বলল, ”দাদা এটা কী হল? শুকনো মাঠে আছাড়! ভুবুর কপালে লেখা টেস্ট রেকর্ড ওর বাঁধা, আমি শঙ্কুর সঙ্গে বাজি ধরেছি দু’ইনিংসেই সেঞ্চুরির। তিন টেস্টে চারটে হত তাহলে।”
”রেকর্ডের জন্য আর একটা ইনিংস তো ওর হাতে রয়েছে। প্রথম তিন টেস্টে তিনটি সেঞ্চুরি আর কারুর নেই তো?”
”কারুর নেই, কারুর নেই।”
অভয়ঙ্করকে সামান্য ফ্যাকাশে দেখাচ্ছে। কথা না বলে চোখ দিয়ে আকাশ দেখিয়ে ঠোঁট ওলটাল। রোজা চেয়ারে নেই।
লাঞ্চের পরই মার্কস বহু আগে প্রাপ্য দ্বিতীয় নতুন বল নিল, সঙ্গে সঙ্গে রামিন্দারের অন্য মূর্তি। তার শান্ত নিষ্কম্প শীতল ব্যাট থেকে এবার হলকা বেরোচ্ছে। মহাদেবের তাণ্ডব নাচ যেন বাইশ গজের স্টেজে শুরু করল। কাট, ড্রাইভ আর হুকে সে নিউজিল্যান্ড বোলিং ছিন্নভিন্ন করার কাজে মেতে উঠল। ৪০ মিনিটে পৌঁছল পঁচাত্তরে, রেগে এক থেকে দুইয়ে। অপ্রত্যাশিত সহায়তা দিয়ে ছোট্ট চেহারার এই মারাঠি উইকেটকিপার একটা প্রান্ত ধরে রেখেছে। সাতটা বল পরেই রামিন্দার নব্বুইয়ে। প্রতিটি মার নিখুঁত, ব্যাটের কানা দিয়ে একটি রানও সে সংগ্রহ করেনি, পরিচ্ছন্ন হিসেবে ফুটওয়ার্ক, সময় বিচারে নির্ভুল। রামিন্দারের মন, মস্তিষ্ক আর শরীর, এক তালে এক ছন্দে মিলে কাজ করছে।
রামিন্দার সাতানব্বুইয়ে, তখনই বয়েডের বল গুডলেংথ থেকে খাড়াই দাঁড়িয়ে উঠল। ড্রাইভ করার জন্য তখন সে বাঁ পা বাড়াতে যাচ্ছে। বলটাকে উঠতে দেখেই পিছিয়ে যাবার চেষ্টা করে কিন্তু পারেনি। বাঁ চোখের পাশে হনুর হাড়ে বলটা যখন লাগল মাঠের সর্বত্র ‘খট’ শব্দটা প্রতিধ্বনিত হয়েছিল। পিছোতে গিয়ে ডান পায়ের বুট স্টাম্পে লেগেছিল। প্রায় একই সঙ্গে বেল ও রামিন্দার জমির উপর পড়ল।
নয়
রাত্রে ভালো ঘুম হল না। ছটফট করেছে অস্বস্তিতে, চটচটে ঘামে বিছানা ভিজেছে। একবার ঘুম ভেঙে গেছল ঘরে আগুন লেগেছে স্বপ্ন দেখে। বিছানায় উঠে বসে হিটারের গাঢ় কমলা রঙের কয়েলগুলোর দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে আবার শুয়ে পড়ে। রামিন্দারের জ্ঞান হারানো দেহটা বহন করে আনার দৃশ্যটা তখন সরোজকে তাড়া করেছিল।
