সরোজ উত্তেজনা বোধ করল, কেউ জানে না এমন একটা ব্যাপার জেনে ফেলার জন্যই হয়তো জ্যোতিষ ‘একটু চা খেয়ে নিলে হত না’ প্রস্তাবটা দিতেই সে সাগ্রহে রাজি হয়ে গেল।
কনট প্লেসে ছোটো ঝকঝকে রেস্টুরেন্টে মুখোমুখি বসে সরোজ বলল, ”ব্যাপারটা খুবই সিরিয়াস, দুজনেরই জীবন বিপদের মধ্যে, মাথার উপর খাঁড়া ঝুলছে…আপনি ব্যাপারটা বলে কি ভালো করলেন?”
”কেন!” জ্যোতিষ সচকিত হয়ে উঠল।
”লোক জানাজানি হওয়া কি উচিত?”
”ওহ।” জ্যোতিষ যেন নিশ্চিন্ত হল, ”আপনাকেই শুধু বলেছি আর কাউকে বলবও না।”
”শুধু আমাকেই বললেন, কেন?”
জ্যোতিষের মুখে হালকা হাসির ছায়া ভেসে এল। কাপে চুমুক দিয়ে, সিগারেট ধরিয়ে প্যাকেটটা এগিয়ে দিল।
”দুটো কারণে। কানপুরে রামিন্দার যে কাণ্ডটা করেছে তা কাগজে পড়েছি। তারপরও আপনি ওর সম্পর্কে যা লিখেছেন তা-ও পড়েছি। আমার মনে হয়েছে ওর উপর আপনার অগাধ আস্থা, আপনি ওর ভালো চান। আমি কি ঠিক?”
সরোজ মাথা নোয়াল।
”আপনার দ্বারা ওর ক্ষতি হবে না এ সম্পর্কে আমি নিশ্চিত। অনেকেই ওর এই খারাপ খেলার পিছনের কারণ নিয়ে লিখেছে, তাতে ওর লজ্জা আর যন্ত্রণা আরও বেড়েছে। লেখাপড়া প্রায় করেইনি, একদিক দিয়ে বোকাই। লাইফ রিস্ক করে ওর বউয়ের ফিরে আসার ঘটনাটা রামিন্দারকে ভীষণভাবে নাড়া দিয়েছে মনে হচ্ছে। আমার বউ তখন ওখানে ছিল যখন রামিন্দার আসে। ওর কাছ থেকেই শুনলাম একসময় হঠাৎই কেমন ধীর শান্ত হয়ে শুধু বাইরের দিকে তাকিয়ে চুপ করে থাকে। বারকয়েক শুধু বিড়বিড় করেছে, ব্যস। আপনি ওকে চিনেছেন, এই ব্যাপারটা লিখবেন কি লিখবেন না সেটা আপনিই ঠিক করবেন।”
”বেশ। আর একটা কারণ?”
”বহু বছর আগের কথা।” জ্যোতিষ সিগারেটটা অ্যাশট্রেতে ফেলে দিল। সরু ধোঁয়া উঠছে, কাপের তলানিটা ঢেলে ধোঁয়া বন্ধ করল। ”ব্যাপারটা আপনি জানেন। রেস্টুরেন্টে মেয়েদের সঙ্গে বসে, এক অল্পবয়সি ছোকরা ক্লাসের একটি মেয়েকে ইমপ্রেস করতে লম্বা লম্বা কথা বলছিল, যেসব কথার থ্রি-ফোর্থই মিথ্যে, মনে আছে?”
”আছে।”
”আপনার চলে যাওয়াটা সেদিন ওই মুহূর্তে আমাকে যে কী লজ্জা আর অপমানের হাত থেকে বাঁচিয়েছিল, …অপমানিত হয়েছি পরে, নিজের কাছে, যখন আমাকে একটি ছেলে গোটা ব্যাপারটা বলল। আমি ট্রান্সফার নিয়ে বিদ্যাসাগরে চলে আসি। মিথ্যা কথা বলে আমি বোকামি করেছি ঠিকই কিন্তু আপনার সই এনে বীণা ক্লাসের কয়েকজনকে দেখিয়ে বলেছিল-সরোজ বিশ্বাসের গ্লাভস বইবার যোগ্যতাও যার নেই সে আবার প্রেম করতে চায়, এই দেখ সরোজ বিশ্বাস কী লিখেছে। আমাকে তারপর…আপনাকে রেস্টুরেন্টে এনে…আমি কৃতজ্ঞ আপনি ওখানে আর বসে থাকেননি।”
সরোজ দেখল কথা বলতে বলতে জ্যোতিষের ফরসা মুখ রক্তাভ হয়ে উঠেছে। কুড়ি-বাইশ বছর আগের কথা, কিন্তু ভোলেনি। হৃদয়ে একটা জায়গা আছে যেখানে কিছু বিঁধলে সারাজীবনেও উপড়ে ফেলা যায় না।
”আমার সঙ্গে ওর ঘনিষ্ঠতা হয়েছিল, খুবই।”
”জানি। অনেকেই জানত।”
”বিয়ে হল কীভাবে জানেন কি?”
”না। এখানে হঠাৎ ওর সঙ্গে দেখা এক বন্ধুর বাড়িতে পার্টিতে। মিস্টার রাও অদ্ভুত একটা অত্যন্ত ভালো, প্রগ্রেসিভ, কালচার্ড মানুষ। এখন বয়স পঁয়ষট্টির মতো। হাজার বারো মাসে পান। কলকাতায় বীণা ওর পি.এ. ছিল। তখনই গোপনে বিয়ে আর মিস্টার রাও কিছু পরেই চাকরি ছেড়ে মাদ্রাজে একটা কোম্পানিতে জয়েন করেন তারপর দিল্লিতে।”
”ওদের মধ্যে সম্পর্কটা তাহলে বিয়ের অনেক আগে থেকেই ছিল।” সরোজ নিশ্বাস চেপে রইল উত্তর শোনার জন্য।
”বলতে পারব না। তবে ওদের অফিসের একজনের সঙ্গে পরে আলাপ হয়, কথায় কথায় বলেছিল বিয়ের আগে দুজন প্রায়ই মোটরে বেড়াত, এখানে ওখানে খেতেও দেখা গেছে। আমি আর বেশি জিজ্ঞাসা করিনি। চলুন এবার যাওয়া যাক। দেখা হয়ে ভালোই হল।”
সরোজ ভ্রূ কুঁচকে চেয়ার থেকে উঠল। মোটরে বেড়াতে বা এখানে ওখানে খেতে দেখা গেছে তখন যখন তার সঙ্গে ব্যাপারটা চলছে। অপমানের একটা সূক্ষ্ম জ্বালা তাকে রাগিয়ে তুলল। বীণা তাকে বিশ্বাস করেনি। খেলো, পলকা, ভরসার অযোগ্য হিসাবেই ধরে নিয়েছিল, এদিকে তলায় তলায় খোঁজ করে বেড়াচ্ছিল শক্ত অবলম্বনের।
কিন্তু ওকে কি দোষ দেওয়া যায়? যখন বলল বিয়ে করো তখন কি সে বিয়ে করেছে বা করবে বলে কি কোথাও দিয়েছে? বীণা কোনো ভুল করেনি।
”জানেন কি কাল বীণাদের বাড়িতে ভবানী ঘোষাল আসবে?”
”তাই নাকি!” সরোজ অন্যমনস্কের মতো বলল।
”হ্যাঁ, আজ সকালেই আমাকে ফোন করেছিল, যেতে বলল। ঘোষালের সঙ্গে যে ওদের এত আলাপ আছে আগে কিন্তু কখনও বলেনি!”
”এখানেই রাখুন। বাকিটুকু হেঁটে যাব।”
লিফটে ওঠার আগে সরোজ রিসেপশনিস্টকে বলল, ”খুব ব্যস্ত থাকব, কোনো ফোন এলে আমার ঘরে দেবেন না?”
ঘরে এসে তার মনে হল, মিছিমিছিই বললাম, কোনো ফোনই আসবে না।
এখনও ২৫৬ রান দরকার ফলো-অন থেকে রেহাই পেতে। চতুর্থ দিনে প্রথম ওভারেই স্যান্ডারসনের প্রথম বলটিকে শর্মা গালি দিয়ে পাঠাল। একটা রান সহজে নেওয়া যায় এবং নিল। কিন্তু পারিখকে বোলিংয়ের সামনে দাঁড় না করাবার জন্য নিতে গেল দ্বিতীয় রানও। পৌঁছবার আগেই থার্ডম্যান পিকার্ডের নিখুঁত থ্রো গ্রে-র গ্লাভসে পৌঁছে গেছে। নিজের মূর্খামির জন্য শর্মা আফসোসে মাথা নাড়তে নাড়তে ফিরে এল।
