-এবার আমি উঠব অমল। একঘেয়ে সুরের কথা আমার ভাল লাগে না। ঘুম পায়।
-তা হলে ঘুমো।
-ফাজলামি হচ্ছে?
চোখাচোখ হতে দুজনে মুখ ঘুরিয়ে নিল। আলো জ্বালাচ্ছে ঘরের। অমলের মাথার ওপরেই সুইচ। চিনু উঠে জ্বালিয়ে দিল। মণীষ এল অফিস থেকে।
-দুটো টাকা দিতে পারিস?
-তোর খালি এক কথা।
-খুব দরকার।
-একে ট্রামের ভিড়, তার ওপর উদ্বাস্তু মিছিলে একঘণ্টা আটকা থেকে, এই সবে আসছি। একটু জিরোতে দে, তা নয় অমনি শুরু করেছিস?
চেয়ারে বাবু হয়ে বসল মণীষ। চিনু ঘাড় ফিরিয়ে দেখল। মেয়েটি উঠে গেছে কখন সঙ্গীদের নিয়ে। অমল বাইরের দিকে তাকিয়ে। ফ্যাকাশে দেখাচ্ছে গাল দুটো। তার নাকটা ফুলে উঠল একবার ভারী নিঃশ্বাসে। চেয়ারের হাতলে আনমনে হাত বুলোচ্ছে।
চিনু মনে মনে হাসতে লাগলো।
ছুটির পর রোজ হেঁটে আসতে হয় দিনেশকে লালবাজার পর্যন্ত। ট্রামের বোর্ডে তখনও লেখা থাকে ডালহৌসি। ট্রামে ওঠার জন্য জোর লাগাতে হয়। বয়স হয়েছে। ছেলে-ছোকরারা ধাক্কা দিয়ে আগে উঠে যায়। ফার্স্ট ক্লাশেই ভিড়টা বেশি হয়। এর কারণ বুঝে উঠতে পারেনি দিনেশ। লোকের পকেটে কি বেশি পয়সা এসেছে, না মানসম্মান এত বেড়ে গেছে যে দ্বিতীয়টায় উঠলে খোয়া যাবে! পয়সা বেশি হলেই কেউ ফার্স্ট ক্লাশে চড়ে না। ক্লাশটা করা হয়েছে সামাজিক অবস্থার স্তরগুলোকে স্পষ্ট করে চোখে আঙুল দিয়ে দেখাবার জন্য। সুতরাং টাকা বাড়লেই সেটাকে জাহির করে সমাজে কিছুটা খাতির আদায় তো লোকে করবেই। তার মানে কি ফার্স্ট ক্লাশে যারা চড়ে তারা বেশ ধনী? তাও নয়, ধনীরা কি দুঃখে ভিড়ে গাদাগাদি ক’রে মরবে!
তাহলে ব্যাপারটা কি? দিনেশ ট্রামে উঠলেই রোজ একবার ক’রে ভাবে, লোকে কেন ফার্স্ট ক্লাশে ওঠে! সে নিজে দু’একদিন ফার্স্ট ক্লাশে উঠে ব্যাপারটা বুঝতে চেষ্টা করেছিল। কিছুই বুঝতে পারে নি। তারমত কেরানীরাও ফার্স্ট ক্লাশে চড়ে। সেকেণ্ড ক্লাশে ভিড় কম থাকলেও চড়ে না। এক পয়সা বাঁচানোর জন্য কলকাতার মানুষ কি বিরাট আন্দোলনই না করেছিল। এক পয়সারও আজ অনেক দাম। তাহলে ওরা কেন সেকেণ্ড ক্লাশে চড়ে না!
এর একটা কারণই সে খুঁজে বার করেছে। সেটা মান-সম্মানের কথা। সব গিয়ে মানুষ যেন এই একটি জিনিসকেই আঁকড়ে ধরেছে। দুটো পয়সাও আপাতত তুচ্ছ মনে হয়। পরিচ্ছন্ন পোশাক, গদিমোড়া সিট, ভদ্র হবার চেষ্টা, এগুলোতেও মন কিছুক্ষণ প্রসন্ন থাকে। দু’পয়সায় শুধু এটুকু লাভ। আর লাভের লোভেই এত ভিড় ফার্স্ট ক্লাশে।
এত ক’রে তবুও তফাতটা ঠিক ঘুচলো না। কি ক’রে ঘুচবে, মানুষগুলো যে এক। দুটো ক্লাশেই যারা ওঠে, রোজগারের দিক থেকে তফাতটা খুব বিরাট নয়। স্বভাব, মেজাজ, চালচলনেরও খুব তফাত নেই। এটা দিনেশ দুটো ক্লাশে চড়েই বুঝতে পেরেছে। কিন্তু এটুকু বুঝতে গিয়েও আজ ধাঁধাঁ লাগে। তফাত যদি নেই-ই তাহলে মানুষ সেকেণ্ড ক্লাশে চড়ে না কেন? সেখানেও বোধ হয় ওই সম্মান বোধ কাজ করছে। যদি সকলের রোজগারই সমান হয় তাহলে কি ক্লাশ উঠে যাবে? শিক্ষা-দীক্ষা থেকে অহঙ্কার আসে। শিক্ষিতের মধ্যে কি স্তর ভাগ ঘোচান যায়? তফাত থাকবেই। অহঙ্কার থাকবেই। আইন করে ক্লাশ তুলে দিলেই কি অহঙ্কার ঘুচবে! ওটা ঘোচে ভেতর থেকে। যখন দেখবে শিক্ষায় বা রুচিতে পাশের মানুষটি খাটো নয়।
তাহলে মানতে হয় সেকেণ্ড ক্লাশে যারা ওঠে শিক্ষায় বা রুচিতে তারা ফার্স্ট ক্লাশের থেকে খাটো। এখানে রোজগারের কথাটা বড় নয়, এক রোজগারের মানুষের মধ্যেও অনেক তফাত থাকে। কিন্তু নিজেকে অশিক্ষিত ভাবতে কষ্ট হয় দিনেশের। রাগও হয়, ফার্স্ট ক্লাশে চড়া মানুষগুলোর ব্যবহারের কথা মনে পড়ে। অন্যকে বঞ্চিত করে সিটে বসার জন্য লোলুপতা দুটো ক্লাশেই আছে। ভাড়া ফাঁকি দেওয়ার কোন সুযোগই দুটো ক্লাশ ছেড়ে দেয় না। ঝগড়া মারামারিতে কেউই অপটু নয়। তবু খাতির পায় ফার্স্ট ক্লাশে চড়া মানুষগুলো। মাধবীর মত গোটা সমাজটাই যেন অন্ধ হয়ে গেছে। দেখতে না পারলে বুঝবে কি! মান-সম্মান, টাকা থাকলেই দিতে হবে, এ নিয়ম বাতিল হয়ে গেছে। কিন্তু এরা তা বোঝেনি। মাধবীর কাছে শিক্ষা-রুচির দাম নেই, টাকাটাই সব।
কিন্তু টাকাকে অবহেলা করার মত বুকের পাটাই বা কোথায়। তাহলে রমার জন্য অমন সম্বন্ধই বা আনলুম কেন? কোন রুচিতে এ কাজ করলুম! পরিবারের কথাটা মিথ্যে নয়। তার থেকেও নিজেকে নিরাপদ ভাবার কথাই বড় হয়ে উঠেছে। মানুষ সব আগে বিপদ থেকে নিজেকে বাঁচায়। অফিসে কানাঘুষো শোনা যাচ্ছে ছাঁটাই হবে। বুড়োবয়সে ছাঁটাই হলে ছেলে বৌ নিয়ে কোথায় দাঁড়াবো। কোথায় থাকবে তখন মান-সম্মান। বিপদ কোথা থেকে যে হুড়মুড়িয়ে আসবে কেউ বলতে পারে না। আমি থাকতেই বিপদ ঠেকাতে চেয়েছি। আর্থিক নিরাপত্তাকে জোরালো করতে চেয়েছি। তখন এত কথা মনে পড়ে নি। বাঁচার কথাটাই বড় হয়েছিল। মাধবীর কাছে এই কথাটা বরাবরই বড় হয়ে রয়েছে। ও সব সময় কেমন করে বাঁচা যায়, সংসারের মুখে দুমুঠো ভাত তুলে দেওয়া যায়, তার চিন্তাতেই ব্যস্ত। মান-সম্মানের কথা ভাবার সময়টুকুও দিতে পারে না। সেটা সম্ভব হয়েছে মাধবী অশিক্ষিত ব’লে, কিন্তু নিজেকে অশিক্ষিত ভাবতে দিনেশের কষ্ট হয়, রাগ হয়।
