সরোজ তার রিপোর্টে গুরুত্ব দিল পিচের কয়েকবার অস্বাভাবিক আচরণকে। লেখাটা টেলেক্স অপারেটরের হাতে দিয়ে সে নিজের ঘরে এল। গতকালের মতো আজও সে অপেক্ষা করল ফোন বেজে ওঠার। গতকালের মতোই ক্যান্টিন থেকে আনিয়ে রাখা খাবার খেয়ে সে শুয়ে পড়ল।
দ্বিতীয় দিন লাঞ্চের আগের ওভারে আউট হল ওকোনর। আজ সে পঞ্চাশ রান যোগ করেছে। মার্কস আজও নট আউট থাকল ২০২ রানে। দিনশেষে নিউজল্যান্ড পাঁচ উইকেটে ৫১১। দু’দিনে ছ’শোর কাছে পৌঁছনোর মতো অবস্থা ছিল। ঝুঁকি নিতে চায়নি। কাল সকাল থেকে অবশ্যই পিটিয়ে যাবে। বোলারদের কারুর যে ভেদক্ষমতা নেই সেটাই এবং তার সঙ্গে আনন্দের কল্পনারহিত অধিনায়কত্ব, দুটোই আবার ঘোষিত হল। ম্যাচটা যে ভারতের হাতে আর নেই, চায়ের পর থেকেই তা স্পষ্ট হতে শুরু করে। ভি আই পি বা অতিথিদের অনেকেই চা খেয়ে আর ফিরে আসেনি, অবশ্য বীণা ও রোজা ফিরে এসেছে।
গতদিনেরই পুনরাবৃত্তি। রোজা হাত নেড়েছে, মেরুনের বদলে বীণার সবুজ সিল্ক, চুল ফোলানো, সাদা কার্ডিগানটাই রয়েছে। ওরা বেরিয়ে যাবার মিনিট পাঁচেক পর সরোজ বেরিয়ে আর ওদের দেখতে পায়নি। রাতে সে অপেক্ষা করল ফোনের জন্য। একসময় রিসেপশনে ফোন করে জিজ্ঞাসাও করল বাইরে থেকে তার জন্য কোনো কল এসেছে কি না। একটা ফোন করতে কতটা পরিশ্রম হয়? সেটুকুও বীণা করতে চায় না। সরোজ অনেক রকম যুক্তি নিজেকে সান্ত্বনা দেবার জন্য তৈরি করল। তার মধ্যে-বীণার তো উচিতই নয় তার মুখদর্শনের! এবং তারই বা এত কাঙালেপনা কেন বীণার সান্নিধ্যের জন্য? এই দুটির সদুত্তর সে খুঁজে পায়নি।
তৃতীয় দিনে প্রত্যাশামতোই নিউজিল্যান্ড দ্রুত রান তোলায় মন দিল। মার্কস একঘণ্টায় ৪৫ জুড়ল, বয়েড নিল ৩০। ভাণ্ডারকর খোঁড়াতে খোঁড়াতে মাঠের বাইরে যেতেই প্রেসবক্সে হাসিঠাট্টার দমকা লাগল। মার্কস ২৫১ এবং বয়েড ৪১ করে যথাক্রমে লং অন ও স্লিপে ক্যাচ দিয়ে ফিরে আসার পর সাত উইকেটে ঠিক ৬০০ রানে মার্কস ইনিংস ছেড়ে দিল। নট আউট রইল গ্রে পাঁচ রানে। আনন্দ পেয়েছে চার উইকেট ১৩২ রান দিয়ে।
আলভার সঙ্গে কে নামবে? উন্নির সাহায্যকারী ছেলেটি খবর আনল আর এক ওপেনার শর্মা। সরোজ আজ বীণাকে দেখতে পেল না। তার বদলে রোজারই বয়সি একই রকমের পোশাক, জিনস আর টি শার্টের উপর জিপ খোলা জ্যাকেট পরা একটি মেয়েকে বীণার চেয়ারে বসা দেখল। ইনিংস শুরুর আগে শঙ্কর আর রোজা ফেন্সিংয়ের কাছে এসে কথা বলল। রোজা তাকে চকোলেট দিল। কথা বলতে বলতে রোজা উপরের দিকে তাকিয়ে সরোজকে দেখতে পেয়ে ডান হাত তুলে নাড়ল। হেসে মাথাটা কাত করল সরোজ। রোজা তখন কী যেন বলল শঙ্করকে।
মন্থর কিন্তু নিশ্চিতভাবে আলভা ও শর্মা চা পর্যন্ত একসঙ্গে রইল, ভারতের রান ৯৮। দিনের শেষ ওভারে ওয়ালেসের বলে আলভাকে সিলি পয়েন্টে ধরে নিল মার্কস। প্রায় আড়াইশো মিনিটে এই প্রথম আলভার মনে অন্য কোনো ভাবনা মাথা গলিয়ে তাকে অন্যমনস্ক করে দিয়েছিল। নাইট ওয়াচম্যান নামল পারিখ এবং বাকি বলগুলো আটকাল। শর্মার ৭০ রান, আলভাও আউট হয়েছে ওই রানেই। প্রথম ইনিংসে ভারত ১৪৪ এক উইকেটে। বাকি রইল দুটো দিন। আরও আড়াইশো রান দরকার ফলো-অন বাঁচাতে।
অভয়ঙ্কর তর্কের সুরে কৃষ্ণমূর্তিকে বোঝাচ্ছে, মার্কস দ্বিতীয় দিনের রান তোলার গতি বাড়িয়ে যদি ইনিংসটা সাড়ে পাঁচশো রানে ছেড়ে দিত। তৃতীয় দিনে ব্যাট করে সময় যদি নষ্ট না করত তাহলে ম্যাচটা ড্র হত না।
”ড্র হয়ে গেছে! এখনও তো দু’দিন খেলা রয়েছে!”
”তুমি কি ভেবেছ নিউজিল্যান্ড এই অ্যাটাক নিয়ে ইন্ডিয়ার উনিশটা উইকেট দু’দিনে ফেলে দেবে? মাথা খারাপ!”
সরোজ দেখল রোজা ও তার বান্ধবীকে বেরিয়ে যেতে। সে ভিড়ের মধ্য দিয়ে খুঁটির বেড়া দেওয়া সরু পথ ধরে গেটের বাইরে আসতেই কোটটা হাতে ঝোলানো, টাই-পরা এক সুদর্শন পুরুষ হেসে তার দিকে হাত বাড়িয়ে দিল।
”বীণার কাছে আমার নাম শুনে থাকবেন, জ্যোতিষ।”
সরোজ স্বভাবতই বিস্মিত হল। বয়েস চল্লিশ সদ্য ছাড়ানো, গৌরবর্ণ, গালে গলায় এবং কোমরে চর্বি জমতে শুরু করেছে। সাবধান না হলে ভুঁড়ি হবে। কোঁকড়া এলোমেলো চুল। খুব কাজ আর ব্যস্ততার মধ্যে আছে এমন একটা ভাব অবয়বে।
”হ্যাঁ শুনেছি। এই সেদিন ট্রেনে অদ্ভুতভাবে ওর সঙ্গে দেখা হল অনেক বছর পর।”
”অফিস যাবেন তো, চলুন গাড়ি আছে। আমিও অফিস যাব।”
সরোজ জিজ্ঞাসু চোখে তাকাল।
”আমার অফিস রেল ভবন, আপনার কাছেই।”
জ্যোতিষের ফিয়াট ভিড়ের মধ্য দিয়ে বার করতে সময় লাগল। চালানোটা একটু সহজ হতেই জ্যোতিষ বলল, ”আপনাকে একটা খবর দিচ্ছি, রামিন্দারের সঙ্গে ওর বউয়ের যে ব্যাপারটা চলছিল সেটা মিটে গেছে। মহিলা ফিরে এসেছেন। এখন রামিন্দারের বোনের বাড়িতে।”
”জানলেন কী করে?”
”আমার বউ পাঞ্জাবি। রামিন্দারের বোনের সঙ্গে স্কুল থেকে আলাপ। কাল সন্ধেবেলায় রামিন্দার হোটেলে খবর পেয়ে বোনের কাছে ছুটে এসেছিল। শুনলাম খুব আবেগ-টাবেগের স্রোত বয়ে গেছল, কান্নাকাটিও হয়েছে, যা হয় আর কী।”
”ব্যাপারটা খুব ইন্টারেস্টিং তো। শুনেছি রামিন্দারের লাইফের উপরও অ্যাটেম্পট হয়েছে?”
”ঠিকই শুনেছেন। ভয়ও পেয়েছিল, পাবার মতোই ব্যাপারটা। এখন ওর বউ কিন্তু বিপদের মধ্যে পড়ল। স্বামীকে ছেড়ে যার কাছে চলে গেছল সে তো এবার ছাড়বে না…লোকটা অতি খারাপ, মাফিয়া টাইপের, খুন-টুন অনেক নাকি করিয়েছে। অত্যন্ত ভিন্ডিক্টিভ। …পালিয়ে ননদের বাড়িতে এসে উঠেছে, কেউ জানে না।”
