মার্কস টস জিতেছে। আম্পায়ার বিহারের মোহন ঘোষ আর তামিলনাড়ুর ইব্রাহিম সৈত ক্রিজে পৌঁছবার আগেই আনন্দ তার লোকেদের নিয়ে মাঠে নামল। হালকা রোদ এবং হালকা মেঘ, বাতাস মৃদু। বল শুরু করল আনন্দ এবং প্রথম ওভার খেলল ম্যাকগ্রেগর। মেডেন ওভার। বল যতটা নিচু হওয়ার কথা তার থেকেও নিচু হয়ে এল। মাত্র একটি বল স্টাম্পে ছিল, বাকিগুলি এল রেগের গ্লাভসে। সরোজের মনে হল আনন্দ আক্রমণাত্মক হতে চায় না। কানপুরে হারের ধাক্কায় যেন খোলসে ঢুকে গেছে।
তবে মাত্র ছটি বল থেকে এত শীঘ্র ধারণায় না আসাই উচিত। অন্তত পাঁচটি ওভার যাক, পেসারের সব ক’টি সিলিন্ডার ততক্ষণে চালু হয়ে যাবে। শর্মার প্রথম ওভারে তিনটি আলগা বল পড়ল তার একটিকে স্কোয়্যার কাট করে বেকার তিন রান পেল।
আনন্দের তৃতীয় ওভার শেষে স্কোরবোর্ডে ১১ রান। ম্যাকগ্রেগর গুড লেংথের কাছে গিয়ে ঝুঁকে পিচ দেখতে লাগল। বেকারও এগিয়ে এসেছে। দুজনের মধ্যে কয়েকটা কথা হল। শর্মা তার ইনসুইং বাগে আনতে পারছে না। রেগে দ্বিতীয় স্লিপের সামনে ঝাঁপিয়ে ল্যাটাবেকারের মিডল স্টাম্প থেকে সরে-আসা বলগুলো ধরল। ওভারের শেষ বল স্ল্যাশ করে সে চার রান পেল থার্ডম্যান বাউন্ডারিতে।
ছয় ওভার, আধ ঘণ্টা এবং ১৫ রান। সচরাচর পাঁচ দিনের ম্যাচের প্রথমদিনের মতোই খেলা প্রায় রুটিন ধরেই। আনন্দ প্রান্ত বদল করে নিজেকে প্যাভিলিয়নের দিকে আনতে চেয়ে ভাণ্ডারকরকে সপ্তম ওভারটা দিল। তার তৃতীয় বলে ম্যাকগ্রেগর ফরোয়ার্ড ডিফেন্সিভ খেলতেই ব্যাকোয়ার্ড শর্ট লেগ ঠুকরাল ঝাঁপিয়ে পড়ল। হাতের বলটা তুলে সে এবং আরও ছয়জন একসঙ্গে চেঁচিয়ে উঠতেই সৈত ডান হাত তুলল।
ম্যাচের সপ্তম ওভারে স্পিনার উইকেট পেল। সরোজ বুঝতেই পারেনি বলটা আদৌ ঘুরেছিল কি না। পড়ে পাওয়া চোদ্দো আনার মতোই যেন উইকেটটা পেয়ে গেল ভাণ্ডারকর, এখন তো ওকে কয়েক ওভার রাখতেই হয়। শর্মাকে সরিয়ে আনন্দ বল নিল। বেকার ও নবাগত ওকোনর চারটি সিঙ্গল নিল স্বচ্ছন্দে।
ভাণ্ডারকরের দ্বিতীয় ওভারে প্রথম বলটিই ওকোনরের কপাল ছুঁয়ে শর্ট স্কোয়ার লেগের হাতে গেল। এভাবে গুড লেংথ থেকে লাফিয়ে ওঠায় প্রথমদিনে লাঞ্চের আগেই, ভারতীয়রাও অবাক হয়েছে মনে হল। রেগে কথা বলল, প্রথম স্লিপে রামিন্দারের সঙ্গে। ভাণ্ডারকর লোক চেয়েছে সিলি মিড-অনে। আনন্দ নিজে সেখানে দাঁড়াল। ওকোনর শান্ত চোখে ফিল্ড দেখে নিয়ে আক্রমণে নামল। তিনটি বাউন্ডারি নিল বাকি পাঁচ বল থেকে। ওর উদ্দেশ্য পরিষ্কার-ভাণ্ডারকর হঠাও। খেলা এতক্ষণে ঝাঁকুনি দিয়ে একটা গতি পেল।
হঠাৎ সরোজের দৃষ্টি ডানদিকে পড়ল। রোজা এবং বীণা চেয়ারের সারির মধ্যে ঢুকে এগোচ্ছে। রোজার হাতে কার্ড, নম্বর মিলিয়ে দেখে নিয়ে দুজনে বসল।
নিশ্চয় কার্ড দুটো ভবানীরই দেওয়া। কয়েকদিন আগে যার শুধু একটা সই পাবার জন্য তাকে ধরাধরি করছিল এখন তারই অতিথি হয়ে টেস্টম্যাচ দেখছে। সরোজ ভাগ্য সম্পর্কে উদাস কোনো সিদ্ধান্তে অবশ্য পৌঁছল না। শুধু স্থির করল, ওদের থেকে দূরে থাকবে। কেন যে স্থির করল নিজেও তা জানে না!
ভাণ্ডারকর বদল হয়ে আবার শর্মা এসেছে। এবার বলের উপর সে অনেকটা নিয়ন্ত্রণ রাখছে। ভাণ্ডারকরকে সরিয়ে নেওয়াটা সরোজের মনঃপূত হল না। আনন্দ যে উইকেট পাওয়ার চেষ্টায় সাহসী হবে না এবার সেটা তার কাছে পরিষ্কার হয়ে উঠল। নিশ্চয় ওর লক্ষ্য প্রথমদিনে আড়াইশো রানের মধ্যে নিউজিল্যান্ডকে বেঁধে রাখা।
বস্তুত ২৪৭ রান উঠল এবং দুই উইকেটে। বেকার উইকেটকিপারকে ক্যাচ দেয় লাঞ্চের পরই আনন্দের বলে। বলটা লাফিয়ে উঠে বেকারকে চমকে দিয়েছিল। ব্যাটের হাতল থেকে বলটা রেগের কাছে যায়। দুটো তারকা চিহ্ন দিয়ে সরোজ খাতায় লিখল: কিছু গোলমাল আছে পিচে। বৃষ্টির জল কি একদিকের গুড লেংথ স্পটে বসেছে? আন্ডার প্রিপেয়ার্ড?
ওকোনর ১০৯ আর মার্কস ৮০ রান নিয়ে প্যাভিলিয়নে ফিরে এল পরদিন আবার নামার জন্য। খেলা ভাঙার সঙ্গে সঙ্গে সরোজ ডানদিকে তাকিয়েছিল। রোজার পরনে হালকা নীল শালোয়ার-কামিজ আর গাঢ় নীল ওড়না। চোখে পড়ার জন্য তাকে বেশিক্ষণ খুঁজতে হয় না। ট্রেনে যে সাজে দেখেছিল, বীণা সেই সাদা কার্ডিগান আর মেরুন সিল্কটাই পরেছে। বয়স অনেক কম দেখাচ্ছে, রোজার দিদি বলে চালিয়ে দেওয়া যায়। রোজা হাত তুলে নাড়তেই সরোজের সামনের দিকে চেয়ারে বসা শঙ্করও হাত নাড়ল। রোজা ইশারায় জানাল বাইরে অপেক্ষা করবে। শঙ্কর মাথা হেলিয়ে দিল। ঠিক এইভাবে লাঞ্চের সময়ও বাইরে যাবার আগে ওরা হাত নেড়েছিল।
ভিড়ের সঙ্গে চলতে চলতে বীণা কৌতূহল ভরে এদিকেই তাকাচ্ছে। হয়তো তাকেই খুঁজছে ভেবে সরোজ মাথাটা নামিয়ে নাকটা প্রায় টেবলে ঠেকিয়ে দিল, ওরা যেন না তাকে দেখতে পায়। সে আর ওদের মুখোমুখি হতে চায় না। তাকে যেমন ওরা ভুলে গেল, সে-ও তেমনি ওদের অগ্রাহ্য করবে।
তবে ফোর্থ ডে রাতে ওদের বাড়িতে নিশ্চয়ই যাবে। তাকে নিয়ে যাবার জন্য রোজা যদি স্কুটারে না আসে তাহলেই ভালো। পিছনে বসার কথা ভাবলেই ওর কোমর জড়িয়ে ধরা ভবানী চোখে ভেসে ওঠে।
ভিড় পাতলা হবার জন্য অপেক্ষা করে সরোজ মাঠ থেকে বেরোল। বাহাদুর শাহ জাফর মার্গের দিকে যাবার জন্য বাঁদিকের রাস্তা ধরে যেতে যেতে বড় মাঠটায় রাখা শ’খানেক মোটরের মধ্যে সরোজ নীল কামিজ আর মেরুন শাড়ি দূর থেকে চিনতে পারল। একটা কালো অ্যাম্বাসাডরে শঙ্কর, রোজা আর বীণা উঠছে। আজ দু’বার শঙ্করের সঙ্গে মুখোমুখি হয়েছে, হেসেছে দুজনে কিন্তু শঙ্কর আগের মতো দাঁড়িয়ে গিয়ে কথা বলেনি।
