ভবানীর উপর লেখাটা বেয়ারার কাছে রেখে এসেছে, টেলেক্স অপারেটর দুপুরে এলেই যেন হাতে দেয়। রমেন গুহঠাকুরতা যা যা চেয়েছিল তাই সে লিখেছে। ভবানীর সঙ্গে রোজার ছবি যদি লেখাটার সঙ্গে দেওয়া যায় তাহলে খোলতাই হবে। কিন্তু রামকুমারের ফিল্মরোল আজই কলকাতায় পাঠাবার উপায় নেই। এয়ার প্যাকেট ইতিমধ্যেই চলে গেছে। তাহলে লেখাটা ধরে রাখার জন্য গুহঠাকুরতাকে বলতে হয়। ভবানী বড়ো রান করলে এবং মনে হয় করবে কেননা ওর ব্যাটিংয়ের যা ধরন তাতে কোটলা পিচ সহায়কই হবে, তখন লেখা আর ছবি একসঙ্গে বার করলে লেখাটা খুলবে।
সরোজ অফিসে এসেই কলকাতায় গুহঠাকুরতাকে টেলেক্সে তার কথাগুলো জানিয়ে, লিখতে বসল।
”দাদা এই টেস্টে কী হবে মনে হয়, ইন্ডিয়া জিততে পারবে তো?”
দাশরথি নিজের টেবল থেকে উঠে এসে সরোজের সিগারেট প্যাকেট তুলে নিল।
”ব্যাটিং যদি ফেল না করে তাহলে হারব না। জেতার কথা বলতে পারছি না।”
”আমাদের ছেলেটাকে কেমন দেখলেন, ভবানী?”
”ভালোই।”
”রামিন্দার সিংকে রাখাটা উচিত হয়নি, এতবার যে ফেল করেছে! নতুন নতুন ছেলেদের চান্স তো এখনই দেওয়া উচিত!” দাশরথি প্রথম ধোঁয়া ছাড়ল।
”হোম গ্রাউন্ড তাই একটা সুযোগ দিল।”
সরোজ বিরক্ত বোধ করছে। দাশরথি বোধহয় বুঝতে পেরে নিজের টেবলে ফিরে গেল আর কথা না বাড়িয়ে।
লেখার মধ্যেই গুহঠাকুরতার বার্তা এল : ছবির জন্য সে লেখাটা ধরে রাখছে। লেখাটা ভালো হয়েছে, এইরকমই চাই।
নিজের ঘরে এসে সরোজ চা-টোস্ট খেয়ে খবরের কাগজ নিয়ে বিছানায় টান টান হল। পড়ার মধ্যেই বারবার তার মনে উঁকি দিল একটা আশা, বীণা ফোন করবে কিংবা সোজা এসে তাকে নিয়ে যাবে তাদের বাড়িতে। কেন যে মনে হল বুঝতে পারল না।
ঘণ্টাখানেক পর তার ইচ্ছা করল বীণাকে ফোন করতে। রোজা যে আসবে না, এটা সে এখন ধরেই নিয়েছে। ভবানীর সঙ্গে হয়তো এখন হোটেল লবিতে বা অন্য কোথাও সে বসেছে কিংবা কোনো বন্ধুর বাড়িতে ওকে নিয়ে গিয়ে দেখাচ্ছে তার ট্রফিটিকে। নিশ্চয় তাকে আর কোনো দরকার নেই! আর হয়তো দরকার হবে না। যা পাবার তা তো পাওয়া হয়েই গেছে।
কিন্তু বীণার? কাল ওর স্বরে কেমন যেন পুরনো দিনের রেশ ফুটে উঠেছিল। নাকি শুনতে তার ভুল হয়েছে? এত বছর পর একদমই ভুলে যাওয়া সম্পর্কটা ফিরে পাওয়া কি সম্ভব! বীণা খেপে গিয়ে তাকে অভিশাপ দিয়ে সেই যে চলে গেছল তারপর ওকে প্রথম দেখল রাজধানী এক্সপ্রেসে।
অদ্ভুতভাবে প্রায় ভোজবাজির মতোই বীণা কলকাতা থেকে উবে গেছল। প্রথমেই তার মনে হয়েছিল বোধহয় আত্মহত্যা করেছে। বীণা তখন চাকরি করছে, থাকত বহু দূর সম্পর্কের এক আত্মীয়ের বাড়িতে পেয়িং গেস্ট হয়ে। সেখানে খোঁজ নিতে সাহস পায়নি সরোজ। যদি মর্মান্তিক কিছু শুনতে হয়? বীণার বাবা-মা, বোনেরা থাকত জামশেদপুরে। বাবা সেখানেই চাকরি করতেন, অবসর নেবার পর ওখানেই বাড়ি করেন। সরোজের সঙ্গে তাদের একবারই পরিচয় হয়েছিল, যখন জামশেদপুরে খেলতে গেছল। সেখানে খোঁজ নেবার চেষ্টা সে করেনি।
বাকি ছিল অফিস। ডেপুটি জেনারেল ম্যানেজারের নিজস্ব দপ্তরে বীণা বসত, ফোন করেছিল কথা বলতে চেয়ে। সে শুনতে পাচ্ছিল অপারেটার মেয়েটি প্রশ্ন করছে, অ্যাঁ, বীণা সেনগুপ্তর কল রয়েছে… চাকরি ছেড়ে দিয়েছে, কবে? …ও আচ্ছা। হ্যালো, উনি তো চাকরি চেড়ে চলে গেছেন, তিন সপ্তাহ হল। সে জিজ্ঞাসা করেছিল, কোথায় গেছে? আমরা জানি না।
সরোজ আর কোথাও খোঁজ নেয়নি। সুজাতার বিয়ে হয়ে গেছল, স্বামীর সঙ্গে জার্মানি চলে যায়। সুবীর চাকরি নিয়ে নাগপুরে। বীণা প্রসঙ্গ তোলার মতো শুধু এরাই ছিল। এরপর মাস, বছর গড়িয়ে গেছে। ‘আমি প্রেগনান্ট’ বলে বীণা সেই যে উধাও হল আর কোনো খবর সে পায়নি। যে ভয়টা তার হৃৎপিণ্ডকে মুঠোয় নিয়ে কচলাচ্ছিল যতই সময় পেরিয়েছে সেই মুঠো ক্রমশ শিথিল হতে হতে এক সময় খুলে যায়। সরোজ ভুলে গেছল বীণার অস্তিত্বকেই। পরে তার মনে হত, বীণা মিথ্যা কথা বলে, চাপ তৈরি করে তাকে বিয়েতে বাধ্য করার জন্য প্রেগনান্ট হওয়াটা বানিয়েছিল। না হলে জীবনের এতবড়ো ব্যাপারটায় কোনো মেয়ে দু-চারটে কড়া কথা বলে আর অভিশাপ দিয়েই এমন সহজে পুরুষটিকে ছেড়ে দিতে পারে না।
তার এই মনে হওয়াটাকেই সে এক সময় দৃঢ় বিশ্বাসে নিয়ে যায়। রাজধানী এক্সপ্রেসে বীণাকে দেখেই সে আঁতকে উঠেছিল যেমন, তেমনি একটা ঝড় তার মধ্যে বয়ে গিয়ে বুঝিয়ে দেয় এতকাল সে শেকল আঁটা ছিল এখন মুক্ত। বীণা বিয়ে করেছে, একটি মেয়ে রয়েছে-কৌতূহল তৈরি করবেই। কবে, কীভাবে, কার সঙ্গে বিয়ে, বীণার অতীত ওর স্বামী কতটা জানে-এমন সব প্রশ্ন গত কয়েকদিন মাঝে মাঝেই তার মনে উঁকি দিয়েছে।
উত্তর পেতে বীণাকেই জিজ্ঞাসা করতে হবে। ভেবে রেখেছে, ওর সঙ্গে কথা বলতে বলতে তেমন অবস্থা তৈরি হলেই জিজ্ঞাসা করবে।
সরোজ অপেক্ষাই করে গেল, ফোন বাজল না। একসময় তার মনে হল, বীণারও আর তাকে দরকার নেই।
আট
টস করে আনন্দ আর মার্কস মাঠ থেকে যখন ফিরে আসছে তখন সরোজ প্রেসবক্সে পৌঁছল। আইইএনএস থেকে বেরিয়ে ফুটপাথে দাঁড়িয়ে যখন ট্যাক্সি বা অটো রিকশা, যা পাওয়া যায়, খুঁজছিল তখন ওপারে একটা অটো থেকে হাত বাড়িয়ে ‘দাদা আইয়ে’ বলে ডেকে নিয়েছিল এলাহাবাদের হিন্দি কাগজের এক রিপোর্টার। নয়তো পৌঁছতে আরও দেরি হত। টেবলগুলোয় ছোটো ছোটো কাগজ পিন দিয়ে আঁটা, তাতে খবরের কাগজের নাম লেখা। সরোজের টেবল পড়েছে জমি থেকে তিন ধাপ উপরে এবং কিনারে। তার পাশেই লোহার জালের বেড়া। ওপাশে ভি আই পি আর অতিথিরা।’
