নিজের ঘরে ফিরেই সে সরোজার চিরকুট থেকে নম্বরটা অপারেটরকে শুনিয়ে রিসিভার রেখে দিল। কীভাবে কথা বলা যায়? গম্ভীর, আটপৌরে, সামাজিক, নাকি তরল, ফাজিল, পূর্ব সম্পর্কের সুতো ধরে টানাটানি?
ফোন বেজে উঠতেই রিসিভার কানে দিয়ে শুনল ওদিকে রিং হচ্ছে। সরোজ অপেক্ষায় রইল।
”মিসেস রাও?”
”স্পিকিং?”
”সরোজ।”
চার সেকেন্ড লাগল তার নামটি বীণার মগজে ঢুকতে।
”আহহ, রোজা কালই তোমার ওখান থেকে ঘুরে এসেছে। খালি বলছে আঙ্কল কবে আসবে কবে আসবে। ভি এস ঘোষালকে আনতে পারবে তো…, ছেলেটি তো আরও নাম করল কানপুরেও সেঞ্চুরি করে। রোজার বন্ধুরাও ওর সঙ্গে মিট করার জন্য ফোন করছে। তা আনতে পারবে তো? কী গো, রোজা রিডিকিউলড হবে না তো? বড়ো মুখ করে ও আঙ্কলের কথা সবাইকে বলেছে।”
বীণার স্বরে ব্যাকুলতার মধ্যে মাখানো রয়েছে আবেদন, যেটা প্রায় ভিক্ষা চাওয়ার পর্যায়ে চলে গেছে।
”রোজা কোথায়?”
”এখনও ফেরেনি।”
”এত রাত পর্যন্ত বাইরে? দিল্লির মতো জায়গা!”
”ওর বাবার আদর আর আশকারায় যা হয়েছে না, আমার কোনো কথাই শোনে না। বন্ধুর বাড়ি যাবে বলে স্কুটার নিয়ে তো বেরিয়েছে।”
নাটকীয় ভঙ্গি আনার জন্য সরোজ কয়েক সেকেন্ড নীরব থেকে বলল, ”সেই বন্ধুটি হচ্ছে ঘোষাল! আজই আলাপ করিয়ে দিয়েছি আর দুজনের বন্ধুত্বও হয়ে গেছে।”
”যাঃ, সত্যি!”
”ও ফিরলেই জিজ্ঞাসা কোরো।…আমাকে তো বিশ্বাস করো না।” স্বরটা ভারী করে হৃদয়ের গভীর থেকে উঠে এল এমন একটা ভাব শেষ বাক্যটিতে সে ঢেলে দিল।
”তুমি আমার এখানে কবে আসছ?” বীণার স্বর মৃদু হয়ে এসেছে।
”খেলার ফোর্থ ডে-র রাতে, স্টোরি পাঠিয়ে দিয়ে যাব। সেদিন শঙ্কর আর ভবানীও যাবে।”
”তার আগেই এসো, কাল?”
”বলতে পারছি না, তবে সময় যদি পাই যাব। বাড়ি তো চিনি না, রোজাকেই এসে নিয়ে যেতে হবে। ভালো কথা, তোমার শালটা খুব কাজে দিয়েছে। ভাবছি ওটা নিয়েই নেব আর ফেরত দেব না।”
”কেন?”
সরোজ জবাব দেওয়ার আগেই বীণা ব্যস্ত হয়ে বলে উঠল, ”ওই এসে গেছে রোজা। পরে তোমার সঙ্গে কথা বলব, কেমন?”
ফোন রাখার শব্দে অপ্রতিভ হয়ে সরোজ রিসিভারটা কিছুক্ষণ হাতেই রেখে অবশেষে বিরক্তিভরে ক্র্যাডলে শুইয়ে রাখল।
পরের দিন সরোজ দুপুরে এই উদ্দেশ্যে কোটলায় গেল যে, প্র্যাকটিস দেখার আর যদি খবর কিছু থাকে বিশেষ করে কাঞ্জিলাল কিছু যদি দিতে পারে!
ফিরোজ শাহ কোটলা ছোটো মাঠ। পাঁচিলে ঘেরার বাইরে সংলগ্ন খোলা জায়গায় নেট প্র্যাকটিস চলছে ভারতীয়দের। মাঠের মধ্যে ক্যাচ ধরার মহড়ায় ব্যস্ত নিউজিল্যান্ডাররা। উইলিংডন প্যাভিলিয়নের দিকের স্ক্রিনের পাশে প্রেস এলাকা। হুবহু কানপুরেরই মতো ব্যাপার। সেই জমি থেকে কয়েকটা ধাপ, তাতে একটি করে ছোটো ফোল্ডিং টেবল ও চেয়ার, উভয়ই নড়বড়ে। জমিতেও কিছু টেবল-চেয়ার। মাথার উপর আচ্ছাদন নেই। পাশে এবং পিছনে ভি আই পি এবং অতিথিদের জন্য ভাড়া করা চেয়ার যাতে ধুলো, কাদা এবং শুকনো পক্ষী পুরীষ লেগে রয়েছে।
সরোজ মাঠের কিনারে দাঁড়িয়েছিল। মাঠ ভিজে, প্লেয়ারদের দৌড়ের সঙ্গে মাটি উঠছে। পিচ ঢাকা দেওয়া পলিথিন চাদরে। যেহেতু আকাশ মেঘলা যে-কোনো সময় বৃষ্টি হতে পারে। অপর প্রান্তে স্ক্রিনের পিছনে আম্বেদকর স্টেডিয়ামে সুব্রত কাপ ফুটবলের খেলা চলছে। মাঝে মাঝে হইহই রব ভেসে আসছে। কিছু লোক কোটলা মাঠের স্ট্যান্ড থেকে ফুটবল মাঠের দিকে মুখ করে দাঁড়িয়ে। শ’খানেক ছেলে ছড়িয়ে রয়েছে প্যাভিলিয়নের কাছাকাছি।
বগলে প্যাড এবং হাতে ব্যাট নিয়ে ভবানী নেটে যাবার জন্য ড্রেসিংরুম থেকে বেরিয়ে সিঁড়ি দিয়ে নেমে আসছে। কিছু ছেলে তার দিকে এগিয়ে গেল, অনেকের হাতে অটোগ্রাফ বই। সরোজ অবাক হল রোজাকে দেখে। ভবানীর আশে পাশে হাঁটছে। সেই বিবর্ণ জিনস, হলুদ হাফ শার্ট, নীল কেডস। চুল পিঠে ছড়ানো। এতক্ষণ কোথায় ছিল রোজা? প্যাভিলিয়নে!
কাঁধে ব্যাগ, হাতে ক্যামেরা, রামকুমার আসছিল নেটের দিক থেকে। হাত নেড়ে সরোজ তাকে ডাকল।
”কোথায় উঠেছ?”
”চিত্তরঞ্জন পার্কে মাসিমার বাড়িতে।”
”একটা ছবি দরকার, এই যে মেয়েটা যাচ্ছে ওকে আর ভবানীকে একসঙ্গে।”
”দাঁড় করিয়ে পাশাপাশি নেব?”
”না না, একদম ওদের জানতে দেবে না।”
রামকুমার দ্রুত দুজনের পিছু নিল। রোজাকে এই সময় এখানে যে দেখতে পাবে, সরোজের তা চিন্তার বাইরে। হঠাৎ একটা বিমর্ষতা সরোজকে আচ্ছন্ন করল। রোজার তাকে আর দরকার নেই।
”হ্যালো দাদা, একা চুপচাপ যে, কবে এলেন?”
এখানকার হিন্দি কাগজের রিপোর্টার। সরোজ যথাযোগ্য জবাব দিল। দু-চার কথার পর লোকটি চলে গেল। আর তার ভালো লাগছে না। বেরোবার জন্য গ্যালারির কয়েকটা ধাপ উঠতেই দেখল তরুণ নেমে আসছে।
”টিকিট একদমই বিক্রি হচ্ছিল না। যেই কানপুরে ইন্ডিয়া হারল অমনি হুড়হুড় করে সব শেষ। এখন টিকিট টিকিট হাহাকার। …নেট দেখে এলেন নাকি? …রামিন্দারকে বোধহয় থ্রি ডাউন নামাবে, শান্তনমকে নতুন বলে প্র্যাকটিস করিয়েছে।”
তরুণ উত্তরের জন্য অপেক্ষা না করে পা বাড়াল। সরোজও উত্তর দেবার চেষ্টা করল না। অফিসে গিয়ে একটা কিছু লিখে ফেলতে হবে। শান্তনম রঞ্জিতে কর্ণাটকের হয়ে কয়েকটা ম্যাচ ওপেন করেছে কিন্তু কাদের বলে? টেস্ট খেলার টেনশন আর কেরল বা অন্ধ্রের সঙ্গে খেলার প্রেশার কি এক? সদ্য টেস্ট হেরে সারা টিমটাই এখন টেনশনে রয়েছে। সাউন্ড স্টার্ট দরকার, শান্তনমকে দিয়ে তা সম্ভব নয়, হয়তো ভবানী পারে।
