শঙ্কর পর্দা সরিয়ে বাঁধানো ছোট্ট বইটা রোজাকে ছুড়ে দেবার আগে বলল, ”ক্যাচ।” তার একটা চোখ টিপে, ”দুজনকেই।”
ঘরে দুটো খাট। দামি বেডকভার, এয়ার কুলার, পাকা ও হিটার, ওয়ার্ড-রোব, ড্রেসিং টেবল, বন্ধ জানলায় সাদা লেসের পর্দা, বাথরুমের দাজা, পুরু কার্পেট, দুই খাটের মাঝে টেবল ল্যাম্প, টেলিফোন, একধারে প্রশস্ত খালি জায়গায় দুটি গদির চেয়ার এবং নিচু ব্রেকফাস্ট টেবল। চোখ বোলানো শেষ করে সরোজ চেয়ারে বসল। শঙ্কর একটা সাদা কাগজ আর ডটপেন দিল।
মিনিট কুড়ি পর ঘর থেকে বেরোবার সময় সরোজ আবার একটা ঝাঁকুনি খেয়ে থমকে দাঁড়াল। রোজা জায়গা বদলে ভবানীর পাশে বসে। ভবানীর বাঁ হাত ওর ডান ঊরুর উপর আলতো রাখা। তিনভাগ খাওয়া একটা সিগারেট ভবানী এগিয়ে ধরে। রোজা সেটা তুলে নিয়ে পরপর দুটো টান দিয়ে ফিরিয়ে দিল। সরোজ যখন ওদের সামনে বসছে তখন রোজা নাক দিয়ে ধীরে ধীরে ধোঁয়া ছাড়ছে।
”আমাদের কলেজে একবার নোটিস দিয়েছিল ক্লাসে কী কী করা বারণ। তাতে একটা ছিল স্মোকিং স্ট্রিক্টলি প্রহিবিটেড।”
”সে কী, মেয়েরা ক্লাসেই গাঁজা টানে নাকি!” ভবানী অবাক হয়ে গেল।
রোজা মাথা কাত করল।
”তুমিও টেনেছ নাকি?” শঙ্কর অনিশ্চিতভাবে প্রশ্ন করল।
”একবারই, সামান্য একটু।”
রোজা আবার মাথা কাত করল মুখে হাসি টেনে। ভবানী ও শঙ্করের মধ্যে চোখাচোখি হল।
”তাহলে ভেজাল। আসল হলে আর ক্লাসে বসে খাওয়া যেত না। এমনকী কলেজেও নয়।” ভবানী বলল।
”না না, রিয়্যাল গ্রাস।”
একটু আগে শঙ্কর যে কথাটা বলেছে সরোজের মাথার মধ্যে সেটা দপ করে উঠল: ”ভুবু একবার বাজি ধরে পাইপে গাঁজা ভরে টেনেছিল, সামলাতে পারেনি, ডাক্তার ডাকতে হয়েছিল। দু’দিন ভালো করে হাঁটতে পারেনি।”
”শঙ্কু আমি এবার উঠব রে, দুটো লোকের আসার কথা আছে। রোজা আমাকে লিফট দেবে হোটেল পর্যন্ত, সরোজদা চলি।”
”আঙ্কল, মাকে কী বলব, কবে আসছেন আমাদের বাড়ি?”
”যাব’খন, ভবানী কবে যাচ্ছে?”
”এখানে অদ্ভুত কাণ্ড, চারদিন খেলার পর রেস্ট ডে। আমি ফোর্থ ডে খেলার পরই যাব। রোজা হোটেল থেকে তুলে নিয়ে যেয়ো।”
”অদ্ভুত কেন! দু’দিন খেলার পর, এমনকী একদিন খেলার পরও তো রেস্ট ডে দেওয়া হয়েছে। দু’পক্ষ রাজি হলেই হল। তাহলে আমিও ওইদিন যাব।”
ভবানী ও রোজা সিঁড়ির দিকে এগোল। সরোজ তাদের পিছনে।
”পুলোভারটা পরে নিয়ে আসছি। সিগারেট কিনতে হবে।” শঙ্কর ঘর থেকে চেঁচাল।
”সরি আঙ্কল, পৌঁছে দিতে পারলাম না।” রোজা স্টার্ট দিয়ে স্কুটারে উঠে আন্তরিক স্বরে বলল।
”তাতে কী, এইটুকু তো। হাঁটা তো প্রায় ভুলেই গেছি।”
রোজার পিছনে ভবানী। ওর বসাটা সরোজের অনুমোদন পেল না। বড্ড বেশি এগিয়ে, দুই ঊরুর মধ্যে রোজাকে প্রায় ভরে ফেলেছে।
”সাবধানে যেয়ো।”
রোজা ঘাড় কাত করে স্কুটার ছেড়ে দিল। ভবানী হাত তুলে বিদায় জানাল। স্কুটার মোড় ঘোরার সময় সরোজ দেখল ভবানী দু’হাতে রোজার কোমর জড়িয়ে ধরল।
বিশ্রী লাগছে সরোজের। এত তাড়াতাড়ি এভাবে যে ওরা ঘনিষ্ঠ হবে সেটা ধারণার বাইরে। তাকে অবাক করছে। শঙ্করের কাছে যা শুনল তাতে অবশ্য অশিক্ষিত ভবানীর পক্ষে মেয়েদের সঙ্গে এ হেন আচরণ স্বাভাবিকই। কিন্তু রোজার মতো মেয়ে কেন ওকে এত এগোতে দেবে! গদগদ হয়ে যাবার মতো কাজ কি ভবানী করেছে! ওর ব্যাটিংয়ে যেমন নার্ভ নেই, সবসময় কেতাব মতো খেলে না, মেয়েদের ক্ষেত্রেও তাই। শোভনতা, সাবলীলতার পরোয়া নেই আর তাতেই বোধহয় ও সফল হয়। ওর অমার্জিত, বন্য, অবাস্তব কাজগুলো মেয়েদের বিশেষ করে গুণমুগ্ধা, বীরপূজারিণীদের অবরুদ্ধ ইচ্ছাগুলোকে উত্তেজিত করে দেয়। মনেরও অগোচরে সরোজ ঈর্ষান্বিত হল।
”চলুন, অনেকক্ষণ দাঁড় করিয়ে রাখলাম।”
”চলো। যতটা পড়বে ভেবেছিলাম ততটা ঠান্ডা পড়েনি।”
”নাহ।” কয়েক মিটার চলার পর শঙ্কর বলল, ”দরজা খুলেই আমি ভেবেছিলাম আপনার মেয়ে বোধহয়। মুখের মধ্যে এত মিল!”
”আমিও প্রথম রোজাকে দেখে একটু অবাক হয়েছিলাম।”
”খুব স্মার্ট। ওকে ভুবুর খুব ভালো লেগেছে।”
”তোমাকে বলল?”
”বলবে কী, দেখেই বুঝতে পেরেছি। আপনারা আসার আগে ও জিজ্ঞাসা করেছিল, সরোজদার কেউ হয়টয় না তো?”
”হলে কী হত?” সরোজ কৌতূহল চাপতে পারল না।
জবাব না দিয়ে শঙ্কর হাসিটা টিপে রাখল। সিগারেটের দোকান দেখে এগিয়ে গেল।
”কোথাও খেতে যাবে?”
”না সরোজদা না, বেলা করে খেয়েছি, রাতে খিছু খাব না।”
কনট প্লেসে এক নিরামিষ খাবারের জায়গায় সরোজ ত্রিশ টাকার থালি নিয়ে আহার সেরে, সংসদ মার্গ ধরে হেঁটে ফেরার সময় ভবানীর ‘কেউ হয়টয় না তো’ কথাটাকে মাথায় নাড়াচাড়া করল। যদি তার মেয়ে হত, ভবানী তাহলে অন্যরকম ব্যবহার করত। কিন্তু যে শিক্ষা, রুচি, বা যে কালচারের মধ্যে রোজা বেড়ে উঠেছে তাতে এইসব গায়ে হাত দেওয়া, সিগারেট টানার মতো ব্যাপারগুলো মেনে নেয় কী করে? বাহাদুরি দেখানো! কিংবা হয়তো ওরা এমনভাবেই অভ্যস্ত হয়ে বেড়েছে যেটা তার অভিজ্ঞতার বাইরে। সরোজ রেগে উঠে হাত ঝাঁকাল, আমার মেয়ে হলে এরকম অন্তত হত না। বীণা এভাবে কেন মানুষ করেছে? ও তো সাধারণই ছিল।
বীণাকে বহুক্ষণ পরে তার মনে পড়ল এবং সঙ্গে সঙ্গে মনে হল, সে-ও যেন অনেকটা মেয়ের মতো এইরকমই ছিল আর সে নিজে ভবানীর মতো না হলেও তফাতটা শুধু একজন কয়েক মিনিটে যতটা এগিয়েছে, অন্যজনের সেজন্য কয়েক সপ্তাহ সময় লেগেছিল। সরোজ হেসে ফেলল। তারা দুজন কি একই জাতের!
