সরোজ আর কিছু না ভেবে পা সিটের উপর দিয়ে ঘুরিয়ে চড়ে বসল। আর দুটো হাত পিছনে নিয়ে আঁকড়ে ধরল কেরিয়ারটা। তার বুক বা ঊরু রোজাকে যেন স্পর্শ না করে, আড়ষ্ট হয়ে সেদিকে সজাগ থেকে একসময় সে বলল, ”একটু আস্তে চালাও, ভবানী তো আর পালাচ্ছে না।”
পাশ থেকে সে রোজার গালের পেশি হাসিতে নড়ে উঠতে দেখল।
শঙ্করের দেওয়া নির্দেশমতো ওরা ঠিক জায়গায় পৌঁছল। চারতলা অফিস বাড়িটা একটু পুরনো। ছুটি সবে হয়েছে। অনেকেই ফিরে ফিরে রোজার দিকে অথবা ওর বুকের দিকে তাকিয়ে গেল। দোতলায় খোলা দরজা দিয়ে একটা অফিস দেখা যাচ্ছে। পাশের বন্ধ দরজার কলিংবেলে দু’বার চাপ দিল সরোজ। আধ মিনিটের মধ্যে পাল্লা খুলে শর্টস পরা শঙ্কর বলল, ”হাই সরোজদা, হাই রোজা।”
সাত
সোফার একধারে খয়েরি ট্রাকসুট পরা ভবানী বসে। হাতে একটা গ্লাস। পানীয়ের রং দেখে ওতে যে রাম রয়েছে বুঝতে সরোজের অসুবিধে হল না। ভবানী উঠে দাঁড়িয়ে হাত বাড়াল। প্রথমে সরোজ তারপর রোজা।
”সরোজদা কিছু মনে করছেন না তো।”
ভবানী গ্লাসটা তুলে দেখাল।
”আরে না না, এতে মনে করার কী আছে। আজই পৌঁছলে?”
”হ্যাঁ, আটটায় ল্যান্ড করার কথা করলাম দশটায়। ফগ-এর জন্য ডিলেড। নেটও হল না, কালরাত্রের বৃষ্টিতে আরও ভিজে গেছে। ঢেকে রাখতে পারত প্র্যাকটিস পিচটা, এখানকার ব্যাপারই কীরকম গেঁইয়াদের মতো।”
”ব্যাটিং প্র্যাকটিস না করলে তো আপনার অসুবিধে হবে।” রোজার স্বর উদ্বিগ্ন এবং সিরিয়াস।
ভবানী ওর মুখের দিকে তাকিয়ে দৃষ্টিটা একফুট নামিয়ে আবার তুলল। সরোজ অস্বস্তি বোধ করে মুখ ঘুরিয়ে ঘরের কোণে গ্লাসে রাম ঢালায় মনোযোগী শঙ্করকে লক্ষ করার কাজ নিল।
”অসুবিধে আর কী, নিউজিল্যান্ড বোলিং মোটামুটি জানা হয়ে গেছে, কোনো সারপ্রাইজ নেই। আসাম-অন্ধ্রে এরকম বোলার তো প্রচুর আছে।”
সরোজ এহেন বাগাড়ম্বরে না তাকিয়ে পারল না। তখন ভবানীর অলস চাহনি রোজার দুই ঊরুর মধ্যে নিবদ্ধ এবং রোজা সেটা বুঝতে পারছে কিন্তু অগ্রাহ্য করছে। ঠোঁটেও পাতলা হাসি।
”সরোজদা জল না সোডা, রোজা তোমার?”
অন্যত্র তাকাবার সুযোগ পেয়ে সরোজ তাড়াতাড়ি মুখ ফেরাল।
”জল।”
”আমি সোডা। রোজা ভবানীর মুখের দিকে তাকিয়ে থেকে বলল। সরোজ অস্বস্তি বোধ করল। এতটুকু মেয়ে! ভিন্ন কালচারে মানুষ, কলকাতার মধ্যবিত্ত বাঙালির পক্ষে এদের বুঝে ওঠা শক্ত।
হঠাৎ-ই তার মনে পড়ল বহু বছর আগে রেস্টুরেন্টের ঘটনাটা। সুবীর বলেছিল, একবার ঘুরে আয় না ওদের কলেজ থেকে। সরোজ আগাম বলে রেখে একদুপুরে কথামতো গিয়ে বসেছিল হেদুয়ার উত্তরে পেঙ্গুইন রেস্টুরেন্টে, অপেক্ষা করতে করতে দু’কাপ চা শেষ করে। তারপর সুবীরের বোন সুজাতা, বীণা, আরও দুটি মেয়ের সঙ্গে এসেছিল একটি তরুণ। ওরা বসল পাশের টেবলে অপরিচিতের মতো। কথা বলছিল ক্রিকেট নিয়ে। শুনতে শুনতে সরোজ জেনেছিল তরুণটির নাম জ্যোতিষ, কলেজ টিমে উইকেটকিপার, বাড়ি জামশেদপুরে এবং বিহার টিমে নাকি বাংলার বিরুদ্ধে রঞ্জি খেলেছে। গত বছর। সরোজ আড়চোখে জ্যোতিষের মুখটা দেখে নিয়েই জেনে গেল মিথ্যেবাদী।
”বাংলার কে যেন উইকেটকিপার?” সুজাতা তখন বলেছিল।
”সরোজ বিশ্বাস।”
”কেমন খেলে?” বীণা প্রশ্ন করে জ্যোতিষকে।
মুখটা তাচ্ছিল্যে বেঁকিয়ে জ্যোতিষ বলেছিল, ”ব্যাক স্টপার। লেগ ব্রেকে একেবারেই খেই পায় না। গ্যাদারিংও ক্লামজি।”
”আপনার সঙ্গে নিশ্চয় আলাপ আছে।” সুজাতা বলে।
”তা আছে। সরোজকে একবার তো দেখিয়েই দিয়েছিলাম পায়ে কীভাবে ভর রেখে বসলে লেগসাইড বল নিতে সুবিধে হয়।”
সরোজ তখন মেয়েদের উত্তেজিত মুখের দিকে তাকিয়ে বুঝতে পারে কেন তাকে আসতে বলা হয়েছে। এবার মিথ্যাবাদী জ্যোতিষকে ওরা উলঙ্গ করে দেবে। প্রত্যেকের মুখে চাপা উল্লাস নিষ্ঠুর আমোদের একটা যেন শিকার-খেলা চলছে। খেলিয়ে খেলিয়ে ওরা জালের দিকে নিয়ে যাচ্ছে জ্যোতিষকে। বেচারা জানে না কী ভয়ংকর একটা ব্যাপার তার জন্য অপেক্ষা করছে। সরোজ আর সহ্য করতে না পেরে প্রায় ছুটে রেস্টুরেন্ট থেকে বেরিয়ে গেছল। মেয়েরা অবাক এবং হতাশ হয়েছিল। জ্যোতিষকে ওরা কয়েকদিন পর বলে দেয় কী ঘটতে যাচ্ছিল সেদিন।
”কেন তোমরা বলতে গেলে? বেচারা বরং নাই জানত। কী লজ্জায় পড়ল বলো তো?” সরোজ একবার বীণাকে অনুযোগ করে বলেছিল।
”ওদের কোনো লজ্জাটজ্জা থাকে না। খালি আমার পেছনে ছুঁক ছুঁক, সিনেমা চলো, কোথাও খেতে চলো। হাসাহাসি শুরু হয়ে গেছল ওকে আর সেই সঙ্গে আমাকে নিয়ে। সুজাতারই প্ল্যান ছিল ওকে এক্সপোজ করার।”
”সরোজদা কী ভাবছেন?”
”সরোজদা কিছু ভাবছেন যেন গভীরভাবে।” শঙ্কর পাশে বসে গ্লাসটা তার দিকে এগিয়ে ধরে।
”ভবানীর উপর একটা লিখতে হবে। বলেছিলে ওর সম্পর্কে সব খবর দেবে, মনে আছে?”
”নিশ্চয়, পাঁচ বছর ধরে ওকে চিনি, অনেক কিছু জানি।”
”তাহলে এখনই দাও, রাতে লিখে কালই পাঠিয়ে দেব।”
”এখানে বসে হবে না, পাশের ঘরে চলুন। কাগজ কলম লাগবে তো! আর অটোগ্রাফ বুকটা…”
সরোজ উঠে দাঁড়িয়েছে। শঙ্কর পর্দা সরিয়ে ঘরে ঢুকল। ভবানী চেঁচিয়ে বলল, ”শঙ্কু সব কথা সরোজদাকে বলিসনি যেন।”
সরোজ ঘরে ঢোকার সময় রোজাকে বলতে শুনল, ”কী বলবে না, গার্লফ্রেন্ডদের কথা?”
