”চা খেতে হবে, তুমি কফি না চা? অমলেট?”
”শুধু কফি, নো শুগার।”
”এখানে পটে চিনি দেয়।…ফিগার ঠিক রাখছ?”
”ফিগারের জন্য নয়, চিনি খাওয়াটাই তো ক্ষতিকর। কেমিক্যালি রিফাইন্ড এই সাদা চিনিতে ভিটামিন, মিনারাল, প্রোটিন, ফ্যাট সবই তো নষ্ট হয়ে গেছে, এর কোনো ফুড ভ্যালুই নেই বরং নানান রোগের কারণ হয়। খাওয়া একদম ছেড়ে দেওয়াই বরং উপকারী।”
বেয়ারা এসেছে। সরোজ তাকে শুধু কফি দিতে বলল। রোজা যে হালকা, চপল, মাথায় ক্রিকেটের খবরে ঠাসা নিছকই ছেলেমানুষ নয় সরোজ তা বুঝতে পারছে।
”চিনিতে দাঁতও নষ্ট হয়।” চিনির বিরুদ্ধে সরোজ এইটুকুই জানে।
”মা খুব মিষ্টি খেত, এক সায়েন্টিস্টের একটা আর্টিকেল একদিন পড়তে দিয়েছিল ব্যস তারপর থেকেই বাড়িতে চিনি আসা টোটালি বন্ধ। সে কী মুশকিলের ব্যাপার, ড্যাডি তো ভীষণ চা খায়, চিনি ছাড়া চা মুখে দেয় আর কাপ নামিয়ে রাখে। পুডিং তৈরি বন্ধ, কেক তৈরি বন্ধ, সফট ড্রিঙ্কস বন্ধ। চিনির বদলে শুরু হল কলকাতা থেকে টিনে করে আনানো গুড় আর পাটালি খাওয়া। এসবে তো আর কেমিক্যালস নেই। উফফ প্রথম প্রথম সে কী কড়াকড়ি। গেস্ট এলে তাকেও চিনি ছাড়া চা বা কফি। আর কেউ আসে না আমাদের বাড়ি। জ্যোতিষমামা তো একদিন পকেটে চিনি নিয়ে এল। শেষে আমি আর ড্যাডি মাকে বুঝিয়ে সুঝিয়ে শুধু গেস্টদের জন্য চিনির ব্যবস্থা করেছি আর ড্যাডির জন্য স্যাকারিন।”
”জ্যোতিষমামা কে?”
”আপনি চেনেন না? মা যে বলল চেনেন!”
”ওহহ হ্যাঁ চিনি, তোমার মায়ের সঙ্গে পড়ত, কলেজ ক্রিকেট টিমের কিপার ছিল।”
”আপনি ছিলেন বেঙ্গল টিমের।”
সরোজ হাসল শুধু।
”তাই ওকে মামা আর আমাকে আঙ্কল বলছ?”
রোজা অপ্রতিভতা সামলাবার জন্য হাসল। সরোজ হাসিটার মধ্যে একটি শিশুকে দেখতে গেল।
”তাহলে আপনাকে কী বলব বলুন তো?”
”কিছু না, যা বলছ তাই বলো।”
কফি রেখে গেল বেয়ারা। সরোজই দুটো কাপে ঢালল। নিজের কাপে চিনি দেবার সময় রোজার দিকে তির্যক চাউনিতে তাকিয়ে বলল, ”এখন তোমার মা দেখলে কী করত?”
”কিছুই না। যদি ড্যাডি হতেন কফির কাপটা নিয়ে বেসিনে ঢেলে দিয়ে আসত।”
”ভাগ্যিস তোমার ড্যাডি নেই।”
কাপে চুমুক দিল দুজনেই। মুখটা নিচু করার সময় রোজার চশমাটা নাক বেয়ে একটু নেমে গেল। আঙুল দিয়ে সে ঠেলে তুলে দিল। সরোজ ওর চিবুক আর ঠোঁট লক্ষ করল, তারই মতো প্রায়।
”তোমার পাওয়ার কত?”
”লেফট আই মাইনাস ফোর পয়েন্ট সেভেন ফাইভ, রাইট আই মাইনাস ফাইভ।”
”আমারও তাই মনে হয়েছিল। বাড়িতে আর কার চশমা আছে?”
”ড্যাডির, মাইনাস সিক্স। মা তো আমাকে স্কুটার চালাতে দিতে চায় না, বলে লেন্সের এত পাওয়ার অ্যাকসিডেন্ট করে ফেলবে। ড্যাডির সাপোর্ট আমার দিকে, ফ্লাইং ক্লাবে আমাকে ভর্তি করে দেবে বলে মাকে ভয় দেখায়।”
”তোমার স্কুটার আছে?”
”হ্যাঁ, তাতেই তো এসেছি।”
”তা প্লেন চালানো শিখলেই তো পারো।”
রোজার মুখে গাম্ভীর্য ফুটে উঠল, স্বরেও, ”বড্ড খরচ, ড্যাডিকে ট্যাক্স করা হবে।”
ফোন বেজে উঠল। সম্ভবত দাশরথি বা তিনতলায় তার অফিস থেকে কেউ, এইভেবে সরোজ রিসিভার তুলল।
”আরে তুমি, কবে এলে?…আজ দুপুরে…ভবানীও, কাগজে দেখলুম আজ সকালের ফ্লাইটে দিল্লি পৌঁছবে লিখেছে…অ্যাঁ তোমার ওখানে…আবার আমাকে কেন, আমার ঘরে এখন অত্যন্ত মিষ্টি এক অতিথি এসেছে যে একদমই মিষ্টি খায় না…হ্যাঁ, আরে আমার চুলটুল পেকে গেছে ওসব আর…অটোগ্রাফ বইটা এরই, এদের বাড়িতেই ভবানীকে নিয়ে যাবার জন্য বলেছিলাম…এখনই আলাপ হতে পারে, দাঁড়াও ওকে জিজ্ঞাসা করি, এক মিনিট।” সরোজ রিসিভারের মুখে তালুচাপা দিয়ে মাথা ঘুরিয়ে দেখল রোজা তার দিকেই তাকিয়ে। ”ভবানী এক জায়গায় আড্ডা দিতে এসেছে, যাবে নাকি সেখানে।”
”ওহহ নিশ্চয়।” রোজা স্প্রিংয়ের মতো উঠে দাঁড়াল। ”এজন্যই তো আপনার কাছে এসেছি মনে করিয়ে দিতে আর দেখুন…”
”মেঘ না চাইতেই জল। ওরা কিন্তু ড্রিঙ্ক করছে আমাকে জয়েন করার জন্য ফোনটা করেছে।”
”করুক না ড্রিঙ্ক, আমাদের বাড়িতে তো সবাই খায়।”
”হ্যালো শঙ্কু, ঠিকানাটা বলো…দাঁড়াও লিখে নিই…অ্যাঁ লিখতে হবে না সোজা রাস্তা, বলো…শিবাজি স্টেডিয়ামের…হ্যাঁ ইউনাইটেড টেক্সটাইল সাইনবোর্ড তার পাশে ফলের দোকান, তার পাশে প্রাইভেট রাস্তা, গেট আছে সিমেন্ট বাঁধানো, লিফটের দরকার নেই দোতলায় অফিস আর তার সঙ্গেই ফ্ল্যাট, আলাদা দরজা আছে, বেশ…একেবারে ফাইভ স্টার হোটেলের মতো সাজানো…দশ মিনিটের মধ্যে? আচ্ছা চেষ্টা করছি, রোজার স্কুটার আছে, হ্যাঁ, হ্যাঁ ওর নামই, আচ্ছা, আচ্ছা।”
ফোন রেখে দিয়ে সরোজ একগাল হাসল।
”শুনলে তো, জায়গাটা বুঝতে পারলে? এখন তুমিই সারথি, কী লাক তোমার!”
মিনিট পাঁচেকের মধ্যে দুজনে নীচে নেমে এল। ঘরের চাবিটা জমা দিয়ে পোর্টিকোয় রাখা স্কুটারটা দেখে সরোজ বলল, ”নতুনই দেখছি, কবে কিনেছ?”
”এক বছর প্রায়।”
রোজা স্টার্ট দিয়ে উঠে বসল, সরোজ বিব্রত হল ওর পিছনে কীভাবে বসবে তাই ঠিক করতে গিয়ে। রোজা ছেলে হলে ঘোড়ায় চড়ার মতো দু’পাশে পা ঝুলিয়ে বসে কাঁধে হাত রাখত। কিন্তু ও প্রায় অপরিচিত একটা মেয়ে। শাড়ি পরা মেয়েরা একদিকেই দুটো পা রেখে যেমন বসে সেভাবেই বসবে কি না ভাবছিল। তখন রোজা তাড়া দিল, ”উঠুন।”
