তরুণ খুবই বিষণ্ণমুখে তার দিকে তাকিয়েছিল। ও বোঝাতে চাইছিল, সরোজের মান-সম্মান শঙ্কর ডুবিয়েছে এবং সে চেষ্টা করেছে বাঁচাতে। শঙ্করের প্রতি তার বিদ্বেষ, ঘৃণা, রাগ জাগানোর সূক্ষ্ম প্রয়াসটা সরোজ বুঝতে পেরেছিল।
”তবে নিউজ ডে-র সার্কুলেশন এত কম, খুব কম লোকই জানবে।” তরুণ সান্ত্বনা দিয়েছিল।
চতুর্থ দিনেই ভারতীয় ইনিংস অপ্রত্যাশিত ভেঙে পড়ে ম্যাচ শেষ হয়ে যায়। প্রায় সঙ্গে সঙ্গে গ্যালারিতে দু’জায়গায় দাউ দাউ আগুন দেখা দিতেই পুলিশ ও দমকলের লোক আর দর্শকদের ছোটাছুটি শুরু হয়। প্যাভিলিয়নের সামনে উত্তেজিত জনতার থেকে স্লোগান ওঠে ”রবি আনন্দ হায় হায়, রামিন্দার সিং হায় হায়। সিলেকশন কমিটি হায় হায়।”
প্রেসবক্সে যখন সে লিখছিল তখন কামদারের সঙ্গে একবার চোখাচোখি হতেই বৃদ্ধ উঠে আসেন।
”ফিলিং অলরাইট?”
”হ্যাঁ।”
”কিন্তু আমি ফিল করছি না। কীভাবে শেষ হয়ে গেল দেখলে? সাধারণ বোলিং, এত ভালো ব্যাটিং উইকেট, কেন এটা হল?”
”প্যানিক।”
”কেন প্যানিক?”
”রামিন্দার আর ভবানীর কাল উইকেটে থাকতে না পারায় গোটা টিমটারই নার্ভ ফেল করে গেছে।”
”এটাই আপাতদৃষ্টে মনে হয়। কিন্তু তুমি আর একটা ব্যাপার ভাবো, এই টিমটার মরাল বলে কিছু নেই। দুটো দলে ভাগ হয়ে গেছে, নর্থ আর সাউথ, অবিরত খেয়োখেয়ি, আনন্দকে ক্যাপ্টেন করা হয়েছিল রামিন্দারের ক্লেইম বরবাদ করে, ওখানেই টিমের মধ্যে একটা ধারণা এসে যায় ইন্ডিয়ান ক্রিকেটে জাস্টিস বলে কিছু নেই। রামিন্দার পরের পর ফেল করেছে তার একটা কারণ, কাগজে কাগজে লেখা হয়েছে রামিন্দার ক্ষুব্ধ, আনন্দের সঙ্গে কো-অপারেট করবে না, ফলে কথাটা যে মিথ্যা এটা প্রমাণ করার জন্য ও দারুণ খেলবে ঠিক করে নিজেকে প্রেশারের মধ্যে ফেলে দেয় আর তাতেই ও ডুবছে। দেখলে তো রামিন্দার হায় হায় হচ্ছে, যেন আর সবাই মহাত্মা, পাপী শুধু একজনই। এই যে সেদিন দুই সিনিয়র গালাগালি হাতাহাতি করল টিমের বাচ্চচাদের সামনে, তারই প্রতিক্রিয়া ওখানে হল।”
কামদার ডান তর্জনীটা ঘাড়ের পাশ দিয়ে পিছনে মাঠের দিকে নির্দেশ করলেন।
”লড়ে যাবার ইন্সপিরেশন যেখান থেকে আসে”, তর্জনীটা বুকে ঠেকালেন, ”ভেঙে গেছে জায়গাটা। ওরা ধরেই নিয়েছে ম্যাচটা শুধু ওই দুজনের ব্যক্তিগত মর্যাদার ব্যাপার, তাদের কিছু করার নেই।”
”আলভাও অনেকটা দায়ী।” সরোজ বলেছিল। বৃদ্ধ হাসতে শুরু করলেন। ”লিখবে নাকি? লিখো না, সেঞ্চুরি করেছে, সবাই তোমাকে পাগল বলবে। একটা সেলফিশ ইনিংস খেলল।”
”যদি বোলিংয়ের ঘাড় ধরে ঝাঁকুনি দিত, ওর সে ক্ষমতা আছে, অন্তত এই উইকেটে তাই করা উচিত ছিল ফোর্থ উইকেট পড়তেই।”
আমি হলে আজ ফোর্থ ওভার থেকেই করতাম। কোনো উইকেট পড়ুক বা না পড়ুক, দৃষ্টান্ত দিয়ে অন্যদের দেখিয়ে দিতুম ভয় পাওয়ার কিচ্ছু নেই। তার বদলে আলভা এমনভাবে ব্যাট করল যেন ওল্ড ট্র্যাফোর্ডে স্টিকি উইকেটে ভেরিটিকে খেলছে। আসল কালপ্রিট এই লোকটাই। শুধু নিজের জন্য খেলল। সামনেই ইংল্যান্ড ট্যুর, জায়গা পাকা করে রাখল।…যাই এবার, সন্ধ্যায় এক ফ্রেন্ডের বাড়িতে বসব, ছোট্ট পার্টি, টোস্ট করব জাহান্নমে যাওয়া ইন্ডিয়ান ক্রিকেটের নামে।”
কামদার চলে যাওয়ার পর সরোজ মিনিট দুয়েক ভাবল তারপর লিখে ফেলা দেড়খানা পাতা দলা-পাকিয়ে ফেলে নতুন কাজে নেয়। সারা দুপুর গভীর ঘুমের মধ্যে সরোজ কাটাল। দরজায় খটখট শব্দে ঘুম ভাঙে।
”আরে, এসো এসো।” দরজা খুলে দাশরথিকে দেখে সরোজ অবশ্য অবাক হয়নি। দাশরথি তাদের দিল্লি ব্যুরোর রিপোর্টার, দেড় বছর আগে কলকাতা থেকে এসেছে।
”ঘুমোচ্ছিলেন! এই নিন আপনার প্রেসপাস, পেতে যা ঝামেলা! একবার বলে অমুকের কাছে যান, গেলাম তার কাছে। সে বলল আমি নয় তমুকে দেবে। গিয়ে দেখি সে নেই। দেড় ঘণ্টা অপেক্ষা করে… দিল্লিতে এইভাবেই সব হয়, মজার কথা কী জানেন, প্রথমে যে লোকটা বলেছিল অমুকের কাছে যান সেই-ই শেষপর্যন্ত দিল।…যাক গে, এসব কথা, কানপুরে কী হয়েছিল দাদা? কাল কলকাতা থেকে রমেনদা ফোন করে আপনার খোঁজ নিতে বললেন, কানপুরে আপনার হোটেলের ফোন নম্বর জানেন না, তাই আমাকেই বললেন!”
”কিছুই হয়নি। তিলকে তাল করেছে। সামান্য কথা কাটাকাটি তাই নিয়ে…তুমি আছো কেমন?”
”ভালোই, চলে যাচ্ছে…আপনার খাওয়া-দাওয়া কোথায় করবেন…এদের টাকা দিয়ে বলে দেবেন, নীচের ক্যান্টিন থেকে এনে রেখে দেবে।”
দাশরথি কলকাতার কিছু লোকের খবর নিয়ে, সরোজের প্যাকেট থেকে সিগারেট বার করে ধরিয়ে উঠে পড়ল যাবার জন্য।
”যাক তাহলে আপনার কিছু হয়নি। যাই একবার শরৎ হালদারের বাড়ি, ডেকেছেন, ক্যাবিনেট মিটিংয়ে ফরেন টুরিস্টদের কাছে দার্জিলিং প্রহিবিটেড থাকবে কি না সেটা ওঠার কথা ছিল।”
দাশরথি বেরিয়ে যাবার পরই বারান্দা থেকে ওর গলা শোনা গেল, ”হ্যাঁ হ্যাঁ ওই কোণের ঘরটা… হ্যাঁ আছেন।”
দরজাটা ভেজানো, সামান্য ফাঁক রয়েছে। সরোজ দেখতে পেল রোজাকে। তাড়াতাড়ি সে জামাটা টেনে পরতে শুরু করল।
”আঙ্কল আসব?”
”এসো। তোমার নোট পেয়েছি। বোসো…এসেই ঘুমিয়ে পড়েছিলাম, এত টায়ার্ড লাগছিল।” সরোজ ঘড়ি তুলে সময় দেখল। প্রায় ছ’ঘণ্টা ঘুমিয়েছে দশটা থেকে। ট্রেনে যে পোশাকে রোজাকে দেখেছিল, তাই-ই পরা তবে শার্টের বদলে পোলো গলা উলের গেঞ্জি, যেটা অত্যন্ত আঁটো হওয়ায় স্তনের গড়ন সম্পর্কে স্পষ্ট নিখুঁত ধারণা পেতে অসুবিধে হয় না। সরোজ অস্বাচ্ছন্দ্য বোধ করতে শুরু করল। উঠে গিয়ে বাজারের সুইচ টিপল।
