”পেপার, পেপার।”
বাইরের বারান্দায় হকারের হাঁক। সরোজ তাড়াতাড়ি দরজা খুলে লোকটিকে ডেকে দুটি ইংরেজি কাগজ কিনল। বলেও দিল রোজ যেন দিয়ে যায়। প্যান্ট্রি থেকে ট্রে নিয়ে বেয়ারা আসছে দেখে সরোজ দরজাটা খুলে রেখে ঘরে এসে চেয়ারে বসল।
প্রথম কাগজটা খুলেই সে খেলার পাতায় চলে গেল। বৃষ্টির জন্য নেট প্র্যাকটিসে বঞ্চিত ফিরোজ শাহ কোটলায় ড্রেসিংরমে বসে থাকা ভারত দলের কয়েকজনের একটা তিন কলম ছবি। তিনজন তাশ খেলছে, একজন অটোগ্রাফ খাতায় সই দিচ্ছে আর দরজায় দাঁড়িয়ে মাঠের দিকে যে তাকিয়ে আছে তাকে চিনতে সরোজের এক লহমাও লাগল না।
রামিন্দারের প্রতি সরোজের কোনো বিদ্বেষ নেই। অন্য কাগজকে টেক্কা দেবার জন্য ডেস্ক যদি তার রিপোর্ট থেকে কাল্পনিক সংলাপটা তুলে সেটাকে সত্যি সংলাপ হিসাবে আলাদা করে না ছাপাত তাহলে কিছুই ঘটত না। রামিন্দার-আনন্দ কথাবার্তা যে বানানো সেটা জেনেই এই কাজ গুহঠাকুরতা করেছে। রামিন্দার সম্পর্কে তার সহানুভূতি এখনও অটুট, সে মনেপ্রাণেই চায় এই সরল ও সাহসী জাঠ এবং দর্শনীয়-না-হয়ে-প্রয়োজনীয় ব্যাটসম্যানটি ফর্মে ফিরে আসুক।
তবে রামিন্দার তাকে যে কিছু একটা করে দিয়েছে সরোজ তা বুঝতে পারে। প্রতিদ্বন্দ্বিতা কী জিনিস এখন সে জেনেছে আর বদ্ধপরিকর হয়ে উঠেছে অন্য কাগজকে পিছনে ফেলে দিতে। খবরের জন্য, যে-কোনো পন্থা নিতে হয় নেবে, যতদূর যেতে হয় যাবে, যদি মিথ্যা লিখতে হয় তো লিখবে। ‘টোটালি মিসফিট’ বলার সুযোগ আর দেবে না। এখন সে মনে মনে তারিফ করে সেই ব্যক্তিটিকে যে রামিন্দারকে প্রভাত সংবাদ দেখিয়ে তাকে উত্তেজিত করে প্রেসবক্সে পাঠিয়েছিল। কে সেই ব্যক্তি তা সে এখনও জানে না। তরুণ হতে পারে, শঙ্করও হতে পারে এবং কাঞ্জিলালও, যেই হোক, ওইভাবে সে-ও ঘায়েল করবে। মোট কথা, এখন সবাইকে প্রতিদ্বন্দ্বী ধরে নিয়ে সে চলবে।
কানপুরে কাঞ্জিলাল তার ঘরে রাতে এসেছিল ম্যাচ শেষ হবার পর। চায়ের সময় নির্বাচকরা বসেছিল দিল্লি টেস্টের জন্য দল বাছতে। রামিন্দাকে রাখা হবে কি হবে না শুধু সেজন্যই দেড় ঘণ্টা তপ্ত বিতর্ক হয়েছে। কাঞ্জিলাল রাখার পক্ষে একাই প্রায় যুদ্ধ করেছে এবং জিতেছে। সাংবাদিককে ঘুসি মারার প্রসঙ্গ তুলে দুজন নির্বাচক ওকে বাদ দেওয়ার জন্য চাপ দিয়েছিল।
”তখন আমি বলি, সরোজ বিশ্বাসকে আমি চিনি, আমার বন্ধু, এ-ব্যাপারে ওর সঙ্গে কথাও বলেছি। ও বলেছে ‘রামিন্দারের দোষ নেই আমিই মিথ্যে লিখেছি।’…সরোজ, এটা আমাকে বলতেই হল নয়তো ওকে টিমে রাখা যেত না। বলেছি, মিথ্যে লেখার জন্য ক্ষমা চেয়ে রামিন্দারকে চিঠিও দিয়েছে। তা ছাড়া সাংবাদিক নিজে তো ওর বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ আনেনি…সরোজ আমি বাধ্য হয়ে, মানে, আমি তো জানি তুমিও চাও রামিন্দার থাকুক টিমে। তাই তোমাকে ভাঙিয়ে ওকে ডিফেন্ড করলাম।”
সরোজের কানে, ‘তোমাকে ভাঙিয়ে’ শব্দ দুটো এঁটুলির মতো কামড়ে লেগে রইল। কাঞ্জিলালের কথায় সে একটুও বিব্রত, উত্তেজিত বোধ করেনি। তার মাথায় তখন শুধু একটি জিনিসই কাজ করছিল-এগুলো হচ্ছে ভিতরের খবর। এখন এসবই আমার চাই। কাঞ্জিলাল এবার তোমাকে আমি ভাঙাব।
কাগজে আলভারও একটা ছবি রয়েছে। কানপুরে ১০৪ করে, আউট হয় অষ্টম। ছাপোষা ইনিংস, বিপদের কারণ হবে না বুঝেই জেরি মার্কস ওর দিকে নজরই দেয়নি, চেষ্টাও করেনি ওর উইকেট নেবার। আপাতত আলভা এখন চোখ টেনে রেখেছে। আর একটা খবরে সরোজের চোখ পড়ল, কলকাতা থেকে ঘোষাল আজ এসে পৌঁছয়নি, জানা গেছে কাল সকালের ফ্লাইটে আসছে।
পরের দিন ছিল রেস্ট ডে। সরোজ হোটেলের ঘর থেকে বেরোয়নি। সন্ধ্যায় ভবানীও শঙ্করের সঙ্গে মধুছন্দায় এসেছিল তাকে দেখতে। প্রেসবক্সের ঘটনা নিয়ে কোনো কথা তোলেনি। সরোজ তাতে হাঁফ ছেড়েছিল। তবে শঙ্কর তাকে ডাক্তারের কাছে নিয়ে যাবার প্রস্তাব দিতে সে ‘কিছু হয়নি’ বলে প্রত্যাখ্যান করে।
”আপনার সেই অটোগ্রাফ বুকটায় ইন্ডিয়ান টিমের প্রায় সবারই করেছি। বাকিগুলো আর নিউজিল্যান্ডারদের, ভুবু করে দেবে বলেছে। দিল্লিতে পেয়ে যাবেন।” শঙ্কর ওর দিকে তাকাতে ভবানী সম্মতি জানিয়ে মাথা হেলাল।
”দিল্লিতে কোথায় যেন উঠছ?”
”জায়গাটা ঠিক এখনও জানি না, তবে ইআইএনএস-এর কাছেই। বলেছি তো ফোন করব। আর ভুবু, তুই কিন্তু একদিন সরোজদার…কে হয় আপনার?”
”ফ্রেন্ড।”
”হ্যাঁ ফ্রেন্ডের বাড়িতে যাবি।”
”নিশ্চয়। বলবেন কবে।”
”খেলার দিনগুলোয় তো আর…”
”কেন হবে না! আমি যে-কোনো দিন যেতে পারি।” তাচ্ছিল্য ভরে ঠোঁট মোচড়াল ভবানী।
”ভুবুর রেটিং এখন ভেরি হাই। এসব নিয়ে কথা বলার সাহস এখন কারুর হবে না। দুটো যা সেঞ্চুরি দেখাল!”
শঙ্কর মুগ্ধ চোখে তাকিয়েছিল হাতের আঙুলের নখ পরীক্ষায় মনোযোগী ভবানীর দিকে। তরুণ এসেছিল ওরা চলে যাবার পর। আঘাত ও চিকিৎসা সম্পর্কে প্রথাগত খবর নেওয়া এবং পরামর্শ দেওয়ার পর বলেছিল, ”কলকাতায় একমাত্র শঙ্করের লেখা ছাড়া আর কোথাও আপনার নাম বেরোয়নি। সন্ধেবেলায় টেলিফোন করেছিলাম অফিসে। এমন বিশ্রী একটা লজ্জাকর ব্যাপারে আপনার নাম জড়ানো থাকুক এটা কলকাতার পক্ষেও ভালো দেখায় না, এজেন্সিদেরও রিকোয়েস্ট করেছিলাম আপনার নামটা না দিতে, ওরা দেয়নি, শুধু লেখে ‘এ ডিস্টিংগুইশড ভেটারেন জার্নালিস্ট।’ শঙ্কর যে কেন দিল!”
