ভোরের দিল্লি সরোজের মনোরম লাগল। অটোওলা যদি ঘোরাতে চায় তো ঘোরাক। জলকণা ভরা ঠান্ডা বাতাস মুখে জাপটা দিচ্ছে। বছরের দশ মাস ভ্যাপসা দরদরে গরমে কাটানো কলকাতাবাসীর কাছে শীতের জায়গা আরামেরই হয়। দোকানের বন্ধ শাটার ঘেঁষে ফুটপাথে অনেক লোক এখনও ঘুমোচ্ছে। শীত ঠেকাতে এমন মুড়ি দিয়েছে যেজন্য তাদের এক-একটা পুঁটলির মতো দেখাচ্ছে। মন্থর গতির কিছু পদচারী, সাইকেল আরোহী, হলুদ ট্র্যাফিক সংকেতের দপদপানি, চওড়া নির্জন রাস্তায় ট্রাকের টায়ারের চড়চড় শব্দ, দু’পাশে গাছের ডালপালায় হালকা কুয়াশার মতো ভোরের আলো। সরোজ মুখে বাতাস লাগিয়ে শরীরের ভিতরে শীত পাঠিয়ে দেবার কাজে মগ্ন রইল।
ইন্ডিয়ান ইস্টার্ন নিউজপেপার সোসাইটি অর্থাৎ আইইএনএস কথাটাই সরোজের কাছে একটা হেঁয়ালির মতো। ইস্টার্ন হলে তো পূর্ব ভারতের কাগজের জন্যই সোসাইটি, তা হলে দক্ষিণ আর পশ্চিম ভারতের কাগজগুলো এর সদস্য কেন?
রফি মার্গে সোসাইটির পাঁচতলা বাড়ির সর্বোচ্চচ তলায় আছে কয়েকটি গেস্ট রুম। একতলায় অফিস, বোর্ডরুম আর একটা ক্যান্টিন যেটার কন্ট্রাকক্ট দেওয়া বাইরের লোককে। সদস্যদের কর্মীরা ভাড়া দিয়ে গেস্টরুমে থাকতে পারে হোটেলের মতো। টেস্টম্যাচের সময় ঘর পাওয়া দায় যদি না আগাম বুক করা থাকে। মাঝের তিনটি তলায় দেশের নানান জায়গার খবরের কাগজ, পত্রপত্রিকার নিউজ ব্যুরো, আর নিজস্ব টেলেক্স, টেলিপ্রিন্টার নিয়ে অফিস।
অটো রিকশাটা আইফ্যাক্স বাড়িটা ঘুরে ডানদিকে মভলঙ্কর অডেটোরিয়ম আর এম পি-দের কোয়ার্টার ছাড়াতেই সরোজ ঝুঁকে মুখ বাড়িয়ে বাঁদিকে একটা কাঠের গেট দিয়ে রিকশাটাকে ঢোকাতে বলল। পোর্টিকোয় রিকশাটা থামতে সে দরজা দিয়ে ভিতরে তাকাল। অন্ধকার প্রায়। ডানদিকে রিসেপশন কাউন্টারে লোক নেই। ভাড়া দেবার সময় তার মনে হল সোজা পথেই তাকে আনা হয়েছে, লোকটা সৎ। মনটা প্রফুল্ল হয়ে উঠল, সত্তর পয়সা ফেরত নিল না।
কাউন্টারের পিছনের ঘরে টেলিফোনের পি বি বক্স। সেখান থেকে মাঝবয়সি একটি লোক বেরিয়ে এল। চোখ দেখে মনে হচ্ছে একটু আগেই ঘুম ভেঙেছে।
হোটেলের মতোই প্রাথমিক কাজগুলো। সরোজের জন্য ঘর বুক করাই ছিল। রেজিস্টারের ঘরগুলো ভরতি করে, ঘরের চাবি নিয়ে লিফটের দিকে এগোতে যাবে, তখন লোকটি ডাকল। একটি খাম তার হাতে।
সরোজ অবাক হল। পা দেওয়া মাত্রই চিঠি? আত্মীয় কি বন্ধুদের চিঠি আসে এখানকার অফিসের ঠিকানায়। রিসেপশনিস্টের কাছে পৌঁছবে না। কলকাতা অফিস থেকে আসবে এয়ার প্যাকেট। ডাকে আসা চিঠি নয়। খামটা ছিঁড়ে সে একটা ছোট্ট চিরকুট বার করল।
ইংরেজিতে লেখা : ”ডিয়ার আঙ্কল, আমাদের ফোন নম্বর দিলাম। এসেই ফোন করবে। আমি আবার খোঁজ নেব। সরোজা।” নামটা পড়েই সরোজের ভ্রূ কুঁচকে উঠল। সরোজা থেকে রোজা। কিন্তু তার নামের সঙ্গে এত মিল কেন! তারিখ দেওয়া নেই। বড়ো অক্ষরে ফোন নম্বর লিখে সেটার চারধারে মোটা লাইন টেনে চৌকো ঘর করে দেওয়া।
”কবে এসেছে?”
”কাল সন্ধ্যায়।”
”একটি মেয়ে দিয়ে গেল?”
”বলতে পারব না, আমি ডিউটিতে ছিলাম না।”
এখনই ফোন করা কি উচিত? হয়তো ওদের ঘুম ভাঙেনি। লিফটে ঢুকে সে চার নম্বর বোতাম টিপল। লম্বা বারান্দার একধারে ঘরগুলো, দরজার উপরে নম্বর লেখা। লিফট থেকে বেরিয়ে বাঁদিকে গিয়ে কোণের ঘর। চাবি দিয়ে দরজা খুলে ঘরের যাবতীয় আসবাবে চোখ বুলিয়ে, কাঠের আলমারিতে হ্যান্ডগ্রিপটা ঢুকিয়ে বেলবাজানোর সুইচটা টিপল। লিফট থেকে বেরিয়ে বারান্দার ডান প্রান্তে প্যান্ট্রি। সরোজ কান খাড়া করে সেখান থেকে ক্ষীণ শব্দ পেল বাজারের। অমলেট, টোস্ট, চা-কফি ছাড়া আর কিছু এখানে পাওয়া যায় না। নীচের ক্যান্টিন সন্ধ্যায় বন্ধ হয়ে যায়।
আপাতত খিদেটা মিটিয়ে সে ঘুমোবে। তার আগে বাথরুম যাওয়া। আর…টেবলে চিরকুটটায় চোখ পড়ল। সরোজের ভ্রূ আবার কুঁচকে উঠল। ফোন করাটা কি খুবই জরুরি? ক্রিকেটারদের সই জোগাড় করা আর ভবানীকে ওদের বাড়িতে নিয়ে যাওয়া-এই সব আবদার তার না রাখলেই কি নয়। তার থেকে ঘুমটা অনেক জরুরি। উত্তরপ্রদেশ ক্রিকেট সংস্থার লোকেরা ট্রেনে রিজার্ভেশন পাইয়ে দিয়েছিল তাই শুয়ে আসতে পেরেছে কিন্তু বন্ধ কামরার মধ্যে ঠান্ডাটা ক্রমশ জমাট বেঁধে তাকে এমন চেপে ধরেছিল যে সারারাত কুঁকড়ে থেকে সে শুধু প্রার্থনা করে গেছে একটি কম্বলের জন্য।
দরজায় টোকা পড়তেই সরোজ গোলাকার নবটা ঘুরিয়ে দরজা খুলল। পাজামা আর সোয়েটার পরা লোকটি মুখচেনা। আগের বারও একে দেখেছে। গাড়োয়ালি, নামটা মনে পড়ছে না।
”গুড মার্নিং সাব…কলকাতা থেকে এলেন?”
”না, কানপুর।”
”ক্রিকেটের জন্য?”
সরোজ মাথা নাড়ল।
”আরও তিনজন সাব কাল রাতে এসেছেন, পাঁচ, চার আর দু’নম্বর কামরায় আছেন।”
লোকটিকে খাবার আনতে বলে সে শেভিং ক্রিম, ব্রাশ, সেফটি রেজার, টুথব্রাশ, পেস্ট ইত্যাদি বার করে বাথরুমে যাবার জন্য তৈরি হতে লাগল। তখন চিরকুটটায় আবার চোখ পড়তেই তার মেজাজ সামান্য রুক্ষ হয়ে উঠল। ওদের দরকার যখন ওরাই ফোন করবে। এতকাল কোনো যোগাযোগ যখন ছিল না তখন ভবিষ্যতেও না থাকলে কিছু ক্ষতি বা লাভ হবে না। বীণার প্রতি তার আর আগ্রহ নেই, খুঁচিয়ে পুরনো সম্পর্ক আর এই বয়সে কবর থেকে তুলে আনা যায় না, সম্ভবও নয়। যে যার ছাঁচে ঢুকে গেছে, মনের উপর কঠিন আবরণ পড়েছে। শরীর অবশ্য নিজস্ব নিয়মেই সক্রিয় রয়েছে যাবতীয় চাহিদা নিয়ে। ট্রেনে পাশে বসে কথা বলার সময় বীণা পায়ের উপর পা তুলতেই হালকা সিল্কের শাড়ির নীচে ওর ঊরুর গড়ন ভালোমতোই আভাস দিয়েছিল। তখন তার মনোনিবেশ কিছুটা টাল খেয়েছিল এবং সারাক্ষণই সে বীণার শরীরের নানান জায়গার স্মৃতি হাতড়ে ছবি সংগ্রহ করে তখন আর এখনের মধ্যে যে তুলনার চেষ্টা করে গেছল, সেটা এই মুহূর্তে নিজের কাছে সরোজ কবুল করল। ”এক তিলও বদলাওনি।” কথাটা বলার জন্য তখন উত্তেজিত স্মৃতি তাকে কি উসকে দেয়নি? কথাবার্তায় সে আদিরসের ছোঁয়া দিয়েছিল হালকা রসিকতার ছলে। বীণা তা গ্রহণ করে ”বদমাইশ” বলেছিল। সরোজের হাসি পেল বদমাইশ শব্দটিতে। শালটা দিয়ে যাওয়ার মধ্যে কি বুঝিয়ে গেছে এখনও দুর্বলতা রয়েছে! ওটা ফেরত দিতে হবে।
