-তা অনেকেই করে, ওটা এমন কিছু একটা কথা নয়।
-এক সময় আমি ব্যায়াম করতুম। পাড়ার মস্তান ছিলুম। মেয়েটা আমায় পছন্দ করত। ওর বাবা জানতে পেরে ওকে খুব মেরেছিল। তারপর কোথায় যেন উঠে গেল। মেয়েটা ঠিকানা দিয়েছিল নতুন বাসার। চেষ্টা করেও খুঁজে বার করতেও পারিনি। সে বছরই আই-এ ফেল করলুম।
থেমে থেমে, যেন নাটকের এক দীর্ঘ সংলাপ বলছে অমল। জানলার বাইরে থেকে চোখটাকে মাঝে মাঝে এনে ফেলছে চিনুর মুখে। টেবিলে খানিকটা চিনি পড়েছিল, তাই জড়ো করতে শুরু করল চিনু।
-পরের বছর পাশ করে আর পড়তে ইচ্ছে করেনি, বাবাই জোর করে কলেজে ঢোকাল। এখানে আর একটা মেয়ের সঙ্গে আলাপ হল। দেখতে ভারি ভালো। মনে হত ও হচ্ছে পৃথিবীর শেষ মেয়ে যার মুখ শিশুর মতো নিষ্পাপ। একদিন আমরা দোকানে চা খাচ্ছিলুম। ঝুপঝুপিয়ে বৃষ্টি নামল। ও বলল, বৃষ্টিতে ভিজবে। সেদিনই সদ্য পাট-ভাঙা প্যাণ্ট পরেছি। রাজী হলুম না। তুই হলে কি করতিস?
-বলতে পারি না। অমন অবস্থায় না পড়লে কেউ বলতে পারে না।
-এখন যদি ঐ মেয়েটা বলে চলুন সিনেমায় যাই!
আঙুল তুলে অমল দেখাল চিনুর পিছনে।
-দুটো মেয়েকে তুই এক করে দেখছিস!
-তাই নাকি! আচ্ছা, ভুল হয়ে গেছে। সেদিন আমার মনে মনে ইচ্ছে থাকলেও রাজী হইনি। রাস্তাটায় একটা গর্ত ছিল। লেলাণ্ড কমেটগুলো কাদা ছিটিয়ে যাচ্ছিল। পথচারীদের সে কি সাবধানী ব্যস্ততা! চিনু তুই আমাদের বাসাটা দেখেছিস?
-আগেরটা? না।
-ইঁদুরে কাটা কাগজের মত গন্ধ। একটা ঘরে বাবা মা ছয় ভাই বোন থাকত। আমি শুতুম ঘরের বাইরের রকে। পাশেই নর্দমা। কুৎসিত আমাদের বেঁচে থাকাটা, তবু বেঁচে আছি। খুব সাবধানে বিপদ এড়িয়ে পথচলতি মানুষদের মতই। তবু বড় বড় বাসগুলোর মত এক একটা বিপর্যয় এসে নোংরা ছিটিয়ে চলে যায়। দেখে অন্যরা হাসে। এই হাসিটা আমি সহ্য করতে পারি না। মেয়েটাকে, নিষ্পাপ মুখ সত্ত্বেও, সহ্য করতে পারিনি। কেরানীর ছেলেদের বুদ্ধি অল্পবয়সেই পাকে, বুঝেছিলুম ওকে নিয়ে ঝামেলায় ভুগতে হবে, তাই অন্য একটা ছেলের ঘাড়ে চাপিয়ে দিয়েই সরে পড়লুম। সেদিন ওদের বিয়ে হয়ে গেছে, নেমন্তন্ন করেছিল যাইনি, রজনীগন্ধার ডাঁটা দিতেও তো পয়সা লাগে।
হাসল অমল, চিনুও। চুপ করে রইল ওরা। ঠুকঠুক করে টেবিলে চামচ ঠুকে কে ওয়েটারকে ডাকল। দু তিনটে চেয়ার একসঙ্গে সরাবার শব্দ হল। চোখ বুজে অমল বলল:
-কাউকে ভালবাসলে মনে খচখচ করে, কি যেন অস্বস্তি হয়। কোথায় যেন একটা ভয় ধরে। ভয়টাকে বাধা দেবার মত জোর আমাদের কারুর নেই। পৃথিবীর সব মানুষের মত আমিও রুগ্ন, তাদের মত আমিও একজন; তাই অসহ্য লাগে স্বাস্থ্যবান মোটাদের, ঘেন্না হয় দেখলে। ওরা এ পৃথিবীর যেন কেউ নয়। আসলে খেয়ে পরে বেঁচে থাকাটাই এখন বড় কথা। প্রেম-ফ্রেম পরের ব্যাপার।
চোখ খুলল অমল। ও যেন চোখ বুজলেই একটা অদৃশ্য বাইরের খোলা পাতা দেখতে পায়। আর গড়গড় করে তার থেকে পড়তে শুরু করে দেয়। আড্ডায় ও কম কথা বলে। আজ শুধুমাত্র দু’জন। তাই কথা ছুটিয়েছে।
পিছন থেকে হেসে উঠল মেয়েটি। চিনু ঘাড় ফিরিয়ে দেখল। তখনও হাসছে। দাঁতগুলো দেখা যাচ্ছে।
-প্রেমে পড়লেই অনেক ভাবনা আসে।
চিনু বলল। বলার পিছনে কোন কিছুর তাগিদ নেই। চিনিগুলো টেবিল থেকে ফেলে দিয়েছে। হাতে এখন কোন কাজ নেই। পাশের খালি চেয়ারটায় পা তুলে দিল।
-হ্যাঁ, সে কোন মেয়েকেই হোক বা বৃদ্ধ, শিশু, গাছপালা, পিঁপড়ে যাই হোক। প্রেমের সঙ্গে কতকগুলো দায়িত্ব আসে, বোধ হয় বিবেক থেকে। এই বিবেকটিকেই এড়িয়ে চলা বুদ্ধিমানের। ঝামেলা পোয়াতে যদি ভালবাসতুম তাহলে আরো আগে থেকেই চাকরির চেষ্টা করতুম। আমার মেজ বোনটাকে দেখেছিস তো, দেখলে কি মনে হয় ওর বয়স উনিশ। অপুষ্টির জন্যই অমন দশা। ফ্রক পরতে চায় না, ও আমার খুব প্রিয়, ইচ্ছে করে কাপড় কিনে দি। কিন্তু সঙ্গে সঙ্গে যেন একটা দায়িত্বও ঘাড়ের ওপর এসে পড়তে চায়। তখনই এই ভালবাসা, দয়া বা এই ধরনের জিনিসগুলোকে খারাপ লাগতে শুরু করে। পাড়ার একটা ছোকরা ওকে ভালবেসেছে, আমাদের বাসায় আসে, আমার বয়সী, আমাকে দাদা বলে। একদিন দেখি বোনটার সঙ্গে খুব মেলামেশা করছে। ভাবলুম চড় কসাই, কসাতে পারিনি কেন বলতো? ওরা কি অন্যায় করছিল!
-আর ভাল লাগছে না অমল। এবার ওঠ, একটু বাইরে বেরোই।
-বোস না, সিগারেট আছে?
-আছে।
-ক্যাপষ্টান?
-না। কাঁচি।
-দরকার নেই। দুটো আলোর রঙ লক্ষ্য কর। এই ঘরের মধ্যে আর বাইরের আলো দেখে কিছুটা আঁচ করা যায়, কিন্তু ভেতরের আলো সেই একরকমই রয়ে গেছে। কোনদিন বিকেলেই সূর্যাস্ত দেখা হল না। এতে কিন্তু কোন ক্ষতি হয়েছে বলে মনে হয় না, কোনদিন আপসোসও করিনি। মনে হয়নি জীবন ব্যর্থ। এই ঘর থেকে বাইরের দিকে তাকালে নিজেকে মস্ত মনে হয়। আবার ওই স্কাইলাইটগুলোকে দেখতেও ভাল লাগে। বিকেলের আলোর একটা আলাদা রঙ আছে। ওই কাচগুলোর দিকে তাকালে তা ধরা পড়ে। এই ঘর থেকেই রঙটা দেখা যায়। অস্ত যাবার সময় সূর্যের আলো শুধু ওপর দিকেই পড়ে। আমার মনে হয় এ সময় সকলেরই ওপর দিকে তাকানো উচিত। কিন্তু কে দেখছে বল, কলকাতার মানুষ যন্ত্র হয়ে গেছে। যে যার নিজের তালে ঘুরছে। বলেছি তো খাওয়া-পরার তাগিদটাই সব থেকে বড় জিনিস।
