পিছনের সারিতে বসা দুজন রামিন্দারকে জাপটে ধরায়, সে আর আঘাত করার সুযোগ পেল না। তুমুল হইচই আর বিশৃঙ্খলার মধ্যে রামিন্দারকে টানতে টানতে বাইরে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা শুরু হল। হিন্দি ও ইংরেজিতে অশ্রাব্য গালি দিতে দিতে সে বেরিয়ে যাবার আগে চিৎকার করে বলল : ‘এই লোকটা চিট, মিথ্যে জিনিস আমার সম্পর্কে বানিয়ে লিখেছে, এ লোকটার ক্যারেক্টার নেই, এর জন্মের ঠিক নেই…’
সরোজ কিছুক্ষণ মাঠটা, চারপাশের লোকজন ঝাপসা দেখল। ভোমরা ডাকার মতো একটা শব্দ ছাড়া আর কিছু শুনতে পাচ্ছিল না। চোয়ালটা অসাড়। তারপর একসময় সবই সে ফিরে পেল-রং, গতিবিধি, আকৃতি, শব্দ এবং যন্ত্রণা তার ইন্দ্রিয় গ্রাহ্য করতে পারল। একসময় তার মস্তিষ্কও সবকিছুকে একসঙ্গে মিলিয়ে বুঝে নিতে সক্ষম হল। সে সোজা মাঠের দিকে তাকিয়ে স্থির হয়ে বসে রইল। কৌতূহল, সহানুভূতি, প্রশ্ন কোনোকিছুই তার মধ্যে প্রতিক্রিয়ার সঞ্চার করল না। সে যেন পাথর হয়ে গেছে।
”রামিন্দার বাংলা জানে না, কেউ ওকে পড়ে শুনিয়েছে, উসকে দিয়েছে।”
”যাই লিখুক কিন্তু তাই বলে এভাবে প্রেসবক্সে এসে জার্নালিস্টকে মারা…বোর্ড সেক্রেটারি তো এখানে আছে, ড্র্যাস্টিক অ্যাকশন নেবার জন্য আমাদের তরফ থেকে কিছু করা দরকার।”
”একটা চিঠি ড্রাফট করো আমরা সবাই সই করব।”
”ডাক্তার দেখাতে হবে।”
কথার বুদবুদ অনেক উঠল কিন্তু সে একবারও পিছনে বা পাশে মুখ ফেরাল না। শঙ্কর চেয়ারে নেই। তরুণ একবার উঠে এসে কতা বলার চেষ্টা করেছিল ইতিমধ্যে দিনের খেলা শেষ হয়ে গেছে। ভারতের ১০২ রান, দুজনকে হারিয়ে।
সরোজ মাথা গুঁজে রিপোর্ট লিখল। টেলেক্স ক্যাম্পের কর্মচারী প্রেসবক্সেই অপেক্ষা করছিল। তার হাতে কপি দিয়ে সে বেরিয়ে এল, কেউ আর তার সঙ্গে কথা বলার চেষ্টা করেনি।
হোটেলে নিজের ঘরে অন্ধকারে খাটে বসে রইল দেয়ালের দিকে তাকিয়ে। একসময় উঠে আলো জ্বালল। আয়নায় নিজের সঙ্গে চোখাচোখি হতেই চোখ সরিয়ে নিল। সোয়েটারটা খোলার সময় চোয়ালটা ব্যথায় টনটন করে উঠল। দাঁত নড়ে গেছে, ভিতরের গাল কেটে রক্ত বেরোচ্ছিল তখন সে গিলে নিয়েছে, আঘাত কাউকে দেখাতে চায়নি।
স্টিলের আলমারিটা খুলে হ্যাঙার বার করার সময় চোখে পড়ল একটা ছোট হুইস্কির বোতল। লেবেলে লাল কালিতে লেখা-‘আপনার জন্য। ইতি রবীন মান্না।’ ক্যাপটা খোলা। আলোর দিকে তুলে দেখল কিছুটা কম, বোধহয় মান্না নিজেই খেয়েছে। হঠাৎ সে বোতলটা মুখে লাগিয়ে ঢকঢক করে মুখে ঢেলে বিকৃত মুখে কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে রইল। তখনও কিছুটা রয়েছে। সেটুকুও এক ঢোঁকে শেষ করে বোতলটা টেবলে রেখে আলো নিভিয়ে সে শুয়ে পড়ল। খিদে বোধ করছে না।
ঘণ্টা দুয়েক পর বাথরুমে যাবার জন্য উঠে আলো জ্বেলেই আয়নায় নিজেকে দেখতে পেল। এবার আর সরে গেল না। আস্তে আস্তে এগিয়ে এসে আয়নার কাচে কপাল ঠেকাল।
আমি কি বদলে গেলাম! সরোজ তীক্ষ্ন চোখে তাকাবার চেষ্টা করল। ওটা কি সরোজ বিশ্বাস? মুখটা দু’পাশে ঘুরিয়ে ফিরিয়ে সে দেখতে লাগল।
তার মনে হচ্ছে আয়নার লোকটাকে সে এই প্রথমবার দেখছে। এই লোকটা ধূর্ত, ব্যক্তিত্বহীন, চাটুকার, বিবেকহীন। এ সরোজ বিশ্বাসের মতো চেহারাটা পেয়েছে মাত্র। দৃষ্টি মাঝে মাঝে ঝাপসা লাগছে চোখের পাতা ঝুলে আসছে। সে প্রাণপণে চোখ খুলে রাখার চেষ্টা করতে করতে ফিসফিসিয়ে প্রশ্ন করল, ”কে তুমি?” তারপর মাথা নেড়ে বলল, ”চিট, ক্যারেক্টার নেই, জন্মের ঠিক নেই।”
হঠাৎ তার মাথার মধ্যে ক্ষীণভাবে একটা স্বর জেগে উঠল। কে যেন, কে যেন তাকে একসময় বলেছিল, ‘বিট্রেয়ার…ভুল করেছি মেরুদণ্ডহীনকে ভালোবেসে…চিরকাল বুকে হাঁটবে…’ কে বলেছিল?
পেটের মধ্যে গুলিয়ে উঠল সরোজের। বমি করার জন্য সে বাথরুমে ঢুকল। বেরিয়ে এসে দেয়াল, টেবল, চেয়ার ধরে ধরে বিছানায় পৌঁছেই গড়িয়ে পড়ল।
”আহ, ঠিকই বলেছ বীণা।”
চিত হয়ে কথাগুলো বলে সে চোখ বন্ধ করল এবং কয়েক মিনিটের মধ্যেই ঘুমিয়ে পড়ল। আলোটা আর নেভানো হয়নি।
ছয়
কানপুরে ভারত চতুর্থ দিনে চায়ের পরই ইনিংস ও ১৭ রানে হেরে যাবার তিন দিন পর পুরনো দিল্লি স্টেশনে সরোজ ট্রেন থেকে যখন নামল ভোর হতে তখনও ঘণ্টাখানেক বাকি। স্টেশনের ভিতরে গিজগিজে ভিড়। বাইরের রাস্তা হালকা ভিজে, রাতে বৃষ্টি হয়েছিল। ভিতরে একটু গুমোট কিন্তু আরামদায়ক। স্টেশন থেকে বেরোবার গেটে অটো রিকশা আর ট্যাক্সিওয়ালারা, যারাই লটবহর নিয়ে বেরোচ্ছে তাদের পিছু নিচ্ছে। ঠিক কানপুরেরই মতো। এমন অন্ধকারেই আইএনএস-এর রিসেপশনিস্টকে ঘুম ভাঙিয়ে তোলাটা কি মানবিক হবে?
সরোজ স্টল থেকে চা কিনল। মিষ্টি গরম জল কিন্তু এখন ভালো লাগছে। সিগারেট ধরাল। একটা বেঞ্চে কোনোরকমে বসার জায়গা করে, নানাবিধ রেল বিজ্ঞপ্তি আর বিজ্ঞাপন পড়তে পড়তে সে ভোরের জন্য অপেক্ষা করতে লাগল।
আকাশে পুব থেকে আলোর আভা ছড়িয়ে যেতেই সে স্টেশন থেকে বেরোল। দুজন অটো রিকশাওলা গন্তব্য শুনে তাকে প্রত্যাখ্যান করল, একজন জানাল রফি মার্গ চেনে না, এক ট্যাক্সিওলা অসম্ভব ভাড়া হেঁকে বসল এবং অবশেষে এক অটো রিকশাওলা তাকে তুলে নিল। দিল্লির অটো চালকদের সম্পর্কে সারা ভারতে বদনাম আছে, ওরা সওয়ারিকে নতুন বা অনভিজ্ঞ বুঝলেই মিটারে ভাড়া বাড়িয়ে তোলার জন্য পাঁচ মিনিটের পথকে পঁচিশ মিনিট করে দেয় নানা পথ ঘুরিয়ে। নতুন দিল্লির রাস্তা এমনই যে নবাগতের কাছে একইরকম ঠেকে। চেনা জায়গায় যেতে হলে সরোজ এখনও বুঝে উঠতে পারে না কোন রাস্তা দিয়ে যেতে হবে।
