তৃতীয় বলটা এবার শর্ট পিচ হবেই এবং হলও। বেশি উঠল না। রাইফেলের থেকে বুলেটের মতো শব্দে বলটা পয়েন্ট বাউন্ডারিতে পৌঁছল। রামিন্দার অবাক চোখে তাকিয়ে। ধীরে ধীরে চোয়ালটা শক্ত হয়ে এল। বিড়বিড় করে কিছু বলেই দু’হাত মুঠো করে জোরে ঝাঁকাল।
তিন বলে ১২ রান, টাইমিং নিখুঁত। রামিন্দার ফিরে আসছে। পরের দুটো বল লেগস্টাম্পের বাইরে। ব্যাট চালিয়ে ফসকাল। ষষ্ঠ বল গুড লেংথে রামিন্দার পিছিয়ে ফ্লিক করল স্কোয়্যার লেগে। ঢপ করে একটা শব্দ আর একসঙ্গে হাত তুলে বয়েডের সঙ্গে সাতজন ক্লোজ-ইন ফিল্ডার চিৎকার করে উঠল।
সরোজের গলার কাছে হৃৎপিণ্ড উঠে এসেছে। ব্যাপারটা সম্পর্কে তার কোনো সন্দেহ নেই। পৃথিবীর কোনো আম্পায়ারই, যতই পক্ষপাতিত্ব করুক, এল বি ডব্লু না দিয়ে পারবে না।
পটেলের আঙুল উঠেছে। সেই আঙুল বেয়েই রামিন্দারের চোখ আকাশের দিকে উঠে কয়েক সেকেন্ড থমকে থেকে কুঁকড়ে গেল। আম্পায়ারের দিকে সে স্থির চোখে তাকাল। আগুনঝরা চাহনি। বয়েডকে ঘিরে অভিনন্দনের জোয়ার বইছে। ব্যাটটা দু’হাতে তুলে মাটিতে আছড়ে ফেলল রামিন্দার। এক ফিল্ডার সেটা তুলে ওর দিকে এগিয়ে ধরল। কী যেন রামিন্দার বলল, ফিল্ডারও জবাব দিল। আলভা এগিয়ে এসেছে। ব্যাটটা চেয়ে নিয়ে সে রামিন্দারের হাতে ধরিয়ে দিয়ে বাহু ধরে টানল। ঝটকা দিয়ে আলভার হাত সরিয়ে সে দ্রুত পায়ে ফিরতে লাগল। তখন ভবানী ক্রিজের দিকে অর্ধেক পথ পেরিয়ে এসেছে।
”বাঁচানো গেল না। এরপর আর ওকে…”
অভয়শঙ্করের গলা শোনা যাচ্ছে। সরোজ খাতায় কয়েকটা কথা দ্রুত লিখে রাখছে মন থেকে হারিয়ে যাবার আগে। এমন সময় টেলেক্স ক্যাম্পের পিয়ন তার সামনে একটা কাগজ এগিয়ে ধরল।
”আপকা হৈ?”
কলকাতা থেকে স্পোর্টস এডিটর রমেন গুহঠাকুরতা জানাচ্ছে; দু’দিন ভালো রিপোর্ট হয়েছে। রামিন্দার সিংয়ের সঙ্গে ইন্টারভিউয়ে আর একটু বাড়তি যেমন, ওর বউ কি ডিভোর্স করেছে? ওর বর্তমান ফর্মের উপর বিবাহিত জীবনের সমস্যা কতটা প্রভাব ফেলেছে?-এই ধরনের খবর থাকলে ভালো হত। ভবানীশঙ্করের সম্পর্কে ঘরোয়া অন্তরঙ্গ স্টোরি চাই। মেয়েদের চুমু তার ব্যাটিংকে ইনস্পায়ার করে কি; রাত করে হোটেলে ফেরা, গাঁজা আর মদের মধ্যে কোনটা সে পছন্দ করে, গার্ল ফ্রেন্ড আছে কি না? এই ধরনের গল্প থাকা বাঞ্ছনীয়। নিউজ যে দারুণ খবর দিচ্ছে, প্রত্যহ পিছিয়ে নেই।
সরোজ কাগজটা মুঠোর মধ্যে দলা পাকিয়ে ছুড়ে ফেলতে গিয়েও ফেলল না। রামিন্দারের সঙ্গে ইন্টারভিউ? ব্যাপার কী? আজ পর্যন্ত সে তো ওর সঙ্গে একবারও কথাই বলেনি!
চা-এ ভারত এক উইকেটে ৪২। আলভা জমাট বেঁধে গেছে ১১ রানে, ভবানীর ১৭ রান তার ধৈর্য পরীক্ষার ফল।
খেলা শেষের তিন ওভার আগে ভবানী প্রথমবার হাঁকাতে গেল ওয়ালেসকে। স্ক্রিনের সামনে ক্যাচটা লুফল লোকাস্ট। ভারতের ঠিক তখন ১০০ রান, ভবানীর ৬২। সে পঞ্চাশ পেরোতেই প্রেসবক্সে রেকর্ড খোঁজা শুরু হয়েছিল, প্রথম দুটো টেস্টে তিনটি সেঞ্চুরি করেছে এমন কেউ আছে কি না। পাওয়া গেল না। জীবনের প্রথম দুই টেস্টে দুটো সেঞ্চুরি পাওয়া গেল, অস্ট্রেলিয়ার ওয়াল্টার্স আর ওয়েস্ট ইন্ডিজের কালিচরণ, লরেন্স রো-র জীবনের প্রথম টেস্টেই দুটি সেঞ্চুরিকে এই রেকর্ডের মধ্যে গণ্য করা হবে কি না তাই নিয়ে দু-তিনজন তর্ক করার চেষ্টাও করল। ভবানীকে নিয়ে চারজনই জীবনের প্রথম দুটি টেস্টে দুটি সেঞ্চুরির রেকর্ড করেছে নিউজিল্যান্ডের বিরুদ্ধে-এটাও রেকর্ড হিসাবে গণ্য হওয়া উচিত, এমন একটা সিদ্ধান্তে পৌঁছতেই ভবানী আউট হল।
হা-হুতাশ ধ্বনি একটু বেশি সময়ই রইল কেননা ভবানীর ব্যাটিংই দর্শকরা দেখতে চায়। ঠিক সেই সময়ই প্রেসবক্সে আসার পথটায় একজনের চড়া স্বরের কথাগুলো ডুবে যায় সারা মাঠের শব্দের মাঝে।
”হয়্যার ইজ হি?”
লাফ দিয়ে ধাপের উপর উঠে রামিন্দার প্রেসবক্সের সবার মুখের দিকে তাকাচ্ছে।
কে একজন আঙুল দিয়ে সরোজকে দেখিয়ে দিল। কাত হয়ে চেয়ারগুলোর পিছনের চিলতে জায়গা দিয়ে শরীরটাকে হিঁচড়ে হিঁচড়ে সে সরোজের পাশের লোকের পিছনে দাঁড়াল। ওর হাতে প্রভাত সংবাদের কপি দু’ভাঁজ করা, তাতে দেখা যাচ্ছে লাল পেনসিলে আঁকা বৃত্তের মধ্যে একটি খবর।
”আপনি এটা লিখেছেন?”
কপিটা সরোজ হাতে নিল। তার প্রথম দিনের রিপোর্টের মধ্য থেকে রামিন্দারের সঙ্গে ড্রেসিংরুমে রবি আনন্দের কাল্পনিক সংলাপ অংশটুকু আলাদা করে নিয়ে এবং ‘আমি শের-ই থাকতে চাই-রামিন্দার সিং’ এই শিরোনাম দিয়ে চারপাশে লাইন টেনে খবরটা বক্স করে ছাপা হয়েছে। এর সঙ্গে এমন কিছু বাক্য জোড়া হয়েছে যাতে পাঠকরা বোঝেন ওই খবরের লেখকের উপস্থিতিতেই দুজনের মধ্যে কথা হচ্ছিল।
সরোজ হতবাক। এভাবে জিনিসটা যে বেরোবে, তা সে কল্পনাও করতে পারেনি।
”আপনার লেখা?”
রামিন্দারের গলার স্বরে সারা প্রেসবক্সই নয় দু’পাশের গ্যালারি থেকেও বহু লোক উৎসুক চোখে তাকিয়ে।
”হ্যাঁ আমারই কিন্তু ঠিক এভাবে তো…”
”বাস্টার্ড, মিথ্যে কথা লিখে আমার ক্ষতি করার ফল এবার…”
বাঁ হাতে সে সোয়েটারের কলার মুঠোয় ধরে টান দিতে সরোজ চেয়ার থেকে উঠে দাঁড়ানো মাত্র রামিন্দার পাশ থেকে ডান হাতে ঘুসি মারল তার ডান চোয়ালে। সরোজ টেবলে মুখ থুবড়ে পড়ল।
