সরোজ অস্বস্তি বোধ করল শঙ্করের ‘আপনি’ ‘আপনাকে সরিয়ে’ এই শব্দ ক’টিতে। তবে ওর যুক্তি সে মন থেকে মানতে পারছে না। স্টার প্লেয়ারদের ব্যক্তিগত জীবনের কথা লিখুক কিন্তু পর্দা তুলে বিছানাতেও উঁকি দেওয়াটা কুরুচি ছাড়া আর কিছু নয়। বাচ্চচা ছেলেমেয়েরাও তো পড়ে। তাদের কাছে খেলার প্রেরণার, উদ্দীপনার, বীরত্বের দিকটাই তুলে ধরা উচিত।
কিন্তু তর্কে নামতে সরোজের ইচ্ছা করছে না। যে যা বোঝে সেইভাবেই চলুক। রামিন্দার ওপেন করতে চায়নি, ক্যাপ্টেনের সঙ্গে এই নিয়ে মতবিরোধ হয়েছে-এটুকু লেখা উচিত। এরপর লেখক বিশ্লেষণ করুক ক্যাপ্টেনের এই জেদের পিছনে কোনো যুক্তি আছে আছে কি না, ভালো একজন ব্যাটসম্যান ফেল করছে তাকে কীভাবে সাহায্য করা যায়, এসব না করে হাতাহাতির গল্পকেও বড়ো করে দেখানো, এ কেমন আধুনিক রিপোর্টিং! সরোজ আপনমনে মাথা নাড়ল।
”ভুবুর রাতে ফেরার ব্যাপারটা?” শঙ্কর জিজ্ঞাসু চোখে তাকাল।
”হ্যাঁ।”
”তাতে কী হয়েছে?” শঙ্কর টাইপ করা কাগজগুলো ভাঁজ করে পকেটে রেখে জুতোয় পা গলাল। ”ও যদি পারে করুক। কটকে গত বছর রঞ্জি ম্যাচে রাত আড়াইটেয় চুর হয়ে ফিরে পরদিন সকালে সত্তর থেকে শুরু করে একশো তিরিশে পৌঁছেছিল পঞ্চান্ন মিনিটে। ফ্রেশ দেখাচ্ছিল যখন আউট হয়ে এল। আজ ও কীরকম ফিল্ড করল বলুন? মনে হল কি লেট নাইট করেছে? ভেতো বাঙালির শরীরের ক্ষমতা দিয়ে ওকে মাপবেন না, বাঙালি মর্যালিটি দিয়েও নয়! হি ইজ এ ফেনোমেনা, অ্যান এক্সেপশনাল হিউম্যান।”
”হতে পারে!” সরোজ ধীরস্বরে বলল। ”ক্রিকেট টিম গেম, টিমের অন্যদের উপর ওর আচরণের প্রভাব পড়তে পারে, ডিসিপ্লিন নষ্ট হতে পারে। একজনকে লাইসেন্স দিলে অন্যরাও চাইবে।”
”কেউই বাচ্চচা ছেলে নয় সরোজদা, ইনফ্লুয়েন্সড হয় যদি হবে। আর ডিসিপ্লিন? রামিন্দার মা তুলে চিৎকার করে খিস্তি করল ক্যাপ্টেনকে, সেও গিয়ে রামিন্দারের মুখে ঘুসি মারল-দুজনের মুখেই অশ্রাব্য ভাষা, জুনিয়র প্লেয়ার, হোটেলের বেয়ারা, আরও অনেকেই দাঁড়িয়ে দেখেছে।”
শঙ্কর উঠে দাঁড়িয়ে প্যান্টের মধ্যে গেঞ্জিটা গুঁজতে শুরু করল। তারপর আয়নার সামনে আঙুল দিয়ে চুল বিন্যস্ত করতে করতে শিস দিল। ডিসিপ্লিন সম্পর্কে আর একটি কথাও সে বলল না। যা বলার যেন বলা হয়ে গেছে।
”আপনি এখান থেকে তো সোজা দিল্লি যাবেন, আমি একটু এধার-ওধার ঘুরে লখনউ, আগ্রা দেখে যাব। আর দিল্লিতে থাকার একটা ব্যবস্থাও করে ফেলেছি, চলুন বেরোই।”
রাস্তায় এসে গ্রিন পার্কের দিকে শঙ্কর হাঁটতে শুরু করল। সরোজের গন্তব্য অন্য দিকে।
”শঙ্কু এক মিনিট, কোথায় থাকবে সেটা জানিয়ো।”
”নিশ্চয়। একটা কনস্ট্রাকশন কোম্পানির গেস্ট হাউসে, কনট প্লেসের কাছেই।”
পাঁচ
তৃতীয় দিন সকালে প্রথম এক ঘণ্টাতেই চারটে উইকেট পড়ে গেল মাত্র ৩৩ রান তুলে। ভাণ্ডারকরের বলে প্রথম ওভারেই স্টাম্পড হল ম্যাকগ্রেগর। তারপর রান আউট আর দুটো এল বি ডব্লু। আবার চিৎকার, মাঠের মধ্যে কমলালেবু, কলা ছুড়ে দেওয়া, বিউগল বাজানো শুরু হয়ে গেল। নিউজিল্যান্ড ৪০৫ নয় উইকেট।
এরপর, প্রায়ই প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটে যা ঘটতে দেখা যায়, ব্যাট করতে পারে না বলে যাদের ধরে নেওয়া হয়, সেই শেষ উইকেট জুড়ির হঠাৎ দাঁড়িয়ে যাওয়া। লুইস আর মেনার্ড পাঁচটা ওভার প্রতি বলে ব্যাট চালিয়ে তিনটে ক্যাচ ফেলা, ওভার থ্রো, রান আউট ইত্যাদির সুযোগ থেকে পঁয়তাল্লিশ রান তুলে এবং ফিল্ডিংকে ছত্রখান করে হঠাৎ ডিফেন্সে মনোযোগ দিয়ে ওপেনারদের মতো সতর্ক ব্যাটির শুরু করল। ৪০৫ থেকে ওরা ৪৭৫-এ ইনিংসটা নিয়ে যেতেই দিশেহারা আনন্দ ভবানীশঙ্করকে লং অন থেকে ডেকে এনে হাতে বল তুলে দিল।
স্লো মিডিয়াম পেসে দুটো লংহপ ও একটি ফুলটস দিয়ে এবং আটটি রান বাড়িয়ে ভবানী চতুর্থ বলে মেনার্ডকে বোল্ড করল। ২৮৫ রানে এগিয়ে থেকে নিউজিল্যান্ড প্রথম ইনিংস শেষ করল।
খেলার আড়াই দিন এখনও বাকি। উইকেটে এমন কিছু ঘটেনি যা বোলারদের আশান্বিত করতে পারে। বরং প্রথম দিনের থেকে যেন মন্থরই হয়েছে। ধৈর্য ও সতর্কতা, এই দুটি জিনিস নিয়ে যে-কোনো প্রথম শ্রেণির ব্যাটসম্যান আড়াইটে দিন কাটিয়ে দিতে পারে যদি না ক্লান্ত হয়ে মনোনিবেশ হারায়।
দ্বিতীয় ইনিংস শুরু করতে এল আলভা এবং সরোজকে আশান্বিত করে রামিন্দার। তার মনে হচ্ছে এবার রামিন্দার রান পাবে। উইকেট মন্থর হয়েছে, বাউন্সও আর প্রথম দিনের মতো নেই। ওরা ব্যস্ত হবে না রানের জন্য, সেটাই স্বাভাবিক।
প্রথম তিন ওভার মেডেন নিল। চতুর্থ ওভারে রামিন্দার চমৎকার কভার ড্রাইভে বয়েডের বল বাউন্ডারিতে পাঠাল। মাঠের উচ্ছ্বাস গুঞ্জনে থিতিয়ে আসতে-না-আসতেই আবার সে একইভাবে চার রান নিল। এবারের উচ্ছ্বাস আরও তুমুল।
পাশের লোকটির দুরবিন সরোজ তুলে নিল। রামিন্দার তার মানসিক বাধাগুলো কাটিয়ে গুঁড়িয়ে পথ তৈরি করে বেরোবার চেষ্টা করছে। বেপরোয়া পন্থা। ফাটকায় টাকা খাটাবার মতো। যদি কিছুদূর এভাবে এগোতে পারে তাহলে নিজের উপর ভরসা আসবে। রামিন্দারের কপালে বিজবিজে ঘাম। ঠোঁট চাটছে ঘনঘন। চোখে অনিশ্চয়তা। বিস্ময় আর উন্মাদের মতো অর্থহীন বোধশূন্য চাহনি পরপর ভেসে উঠল।
