”পান সিগারেট খাইয়েছ?”
”ওসবে আর হয় না, একদিনের জন্য খেলা দেখার পাস চেয়েছে তিনজন।”
”কেমন খেলা দেখলে আজ, রামিন্দার তো সারাদিন মাঠেই নামল না।”
”হ্যাঁ তাই তো দেখলাম।” তরুণ হুঁশিয়ার হয়ে গেল। সন্দিগ্ধ চোখে তাকিয়ে কিছু একটা বোঝার চেষ্টা করছে।
”কাঞ্জি বলল রাতে হোটেলে নাকি আনন্দের সঙ্গে ওর ঝগড়া হয়েছে। ওপেন করার ব্যাপারে।”
”তাই নাকি, তাহলে খবর নিতে হয় তো!” তরুণের স্বরে ব্যস্ততা কিন্তু খবরের জন্য নড়ার কোনো চেষ্টা নেই। সরোজ বুঝে গেল খবর যা নেবার নেওয়া হয়ে গেছে।
”রামিন্দারকে এবার বাদ দেওয়া দরকার, এত ফেল করছে।”
সরোজও হুঁশিয়ার হল। এটা টোপ। সে উলটো মনোভাব পেশ করল। ”আমারও তাই মনে হয়, আর ফিরতে পারবে না।”
বিশ্বাস করল না-ফুটে উঠেই মিলিয়ে যাওয়াটা সরোজের চোখে ধরা পড়ল। তার কালকের রিপোর্ট হয়তো পড়ে নিয়েছে এখানে। বড্ড খোলামেলা ব্যবস্থা। এই লোকগুলো ঠিক বোঝে না কী ধরনের প্রতিদ্বন্দ্বিতা রিপোর্টারদের মধ্যে চলে। শুক্লা সকালে সরল মনে তাকে তরুণের রিপোর্ট পড়তে দিল, দেওয়া উচিত নয়।
”আনন্দের ক্যাপ্টেনসি কেমন বুঝলে?”
”এমন কিছু নয়, সো সো, বড্ড ডিফেন্সিভ।”
”কলকাতার কাগজ এখানে পাওয়া যায়? তোমার কাগজ পেয়েছ?”
”না সরোজদা, এখানে দিল্লি, লখনউয়ের কাগজই তো সকালে পাই। আর আমাদের অল্প কিছুই আসে একদিন পর।”
সরোজ আর কথা বাড়াল না। মান্না আজই রাতে হোটেল ছাড়তে পারে বলেছে। দ্রুত সে পা চালাল মধুছন্দার উদ্দেশে।
রিসেপশনিস্ট তাকে জানাল, রবীন মান্না এখুনি চেক আউট করবে জানিয়েছেন। সব বিল মিটিয়েই যাবেন এবং তারপর থেকে ঘরটা সরোজের নামে হবে। আশ্বস্ত হয়ে সে তিনতলার সিঁড়ি ধরল।
মান্না গোছগাছ সেরে তৈরি।
”এখানকার কাজ শেষ, ট্রেনের টিকিটও পেয়ে গেছি, এখুনি বেরোব, যাক দেখাটা হয়ে গেল। আপনার সঙ্গে ভালো করে জমিয়ে আলাপই করা গেল না, কলকাতায় ফিরুন, একদিন বাড়িতে নিয়ে যাব।”
”নিশ্চয় যাব। কিন্তু এত তাড়াতাড়ি বেরোচ্ছেন? এখনও তো…” সরোজ হাতঘড়ি দেখল।
”ম্যানেজারের বাড়ি হয়ে যাব তাই একটু…বিলটা নীচে গিয়ে মিটিয়ে দিচ্ছি।”
সরোজ পকেট থেকে ব্যাগ বার করতেই মান্না তার হাত চেপে ধরল।
”না না, দিতে হবে না।”
”সে কী, পঁচিশ টাকা করে তো আমার দেবার কথা!”
”কথাটথা থাক। কোম্পানির পয়সায় আছি ওটা কোম্পানির ঘাড়েই ফেলে দেব।”
সরোজ আর চাপ দিল না। মান্নার সঙ্গে সে রিসেপশন অফিসে এল। সুটকেস সহ তাকে রিকশায় তুলে দিয়ে সে ভাবল কোথাও গিয়ে খেয়ে নেবে। আর যাবার পথে সঙ্গম হোটেলে ঢুঁ দেবে। যদি শঙ্করকে পাওয়া যায় তাহলে কাঞ্জির অনুরোধটাও জানিয়ে দেবে।
শঙ্কর ঘরে টাইপ করছিল, সরোজকে দেখে বলল, ”এক সেকেন্ড…ততক্ষণ গ্লাসে ঢেলে নিয়ে বসুন।”
টেবলে রামের বোতল আর গ্লাস। সরোজ খাবে কি খাবে না ঠিক করতে পারছিল না। শঙ্কর আড়চোখে দেখে আবদেরে ধমক দিল, ”নিন বলছি।”
”আচ্ছা আচ্ছা।”
মিনিট তিনেক পর শঙ্কর ঘুরে বসল।
”আমার সঙ্গে অনিল কাঞ্জিলালের দেখা হয়েছে। ভুবু আমার লেখা সম্পর্কে অনেক জ্ঞান দিল। আচ্ছা সরোজদা, আজ যে টেস্ট পিছু বারো-চোদ্দো হাজার টাকা একটা প্লেয়ার পায় এটা কি কোনোদিন কল্পনা করতে পেরেছিলেন? পঁচিশ বছর আগে, মনোহরণের কাছেই শুনলাম, দিনে পঞ্চাশ টাকা প্লেয়াররা পেত, তা-ও অনেক ধস্তাধস্তি করে আদায় করতে হত। এই বদলটা, এই যে টাকা পাচ্ছে, আপনি একজন এক্স-রঞ্জি ক্রিকেটার হিসাবে বলুন, এটা আপনি চান কি না?”
”নিশ্চয় চাই। যে-কোনো খেলায় প্লেয়াররা টাকা পাক এটা অবশ্যই চাই।”
”এত টাকা টেস্টম্যাচে আসছে যেহেতু কমার্শিয়াল ইন্টারেস্ট এর মধ্যে এসেছে, দর্শকও বেড়েছে, কোনো টেস্ট সেন্টারেই সিজন টিকিট আনসোল্ড থাকছে না। রেডিয়োয় বল বাই বল কমেন্ট্রি হচ্ছে, টিভি-ও সারাক্ষণ দেখাচ্ছে। ব্যাপারটা তাহলে গুরুত্ব পেয়েছে। টেস্ট প্লেয়াররা এখন ন্যাশনাল লাইম লাইটে এসেছে। তাদের সম্পর্কে ট্রিমেন্ডাস ইন্টারেস্ট পাবলিকের মধ্যে জন্মেছে। তাদের ব্যক্তিগত জীবন, আচার-আচরণ, অভ্যাস, বদভ্যাস সব কিছু সম্পর্কেই জানার জন্য কৌতূহল জন্মেছে। খবরের কাগজ যদি সেই কৌতূহল মেটায় তাহলে তাদের কেন দোষ দেবেন, কেন নিন্দে করবেন? বলুন?”
সরোজ ওর মুখের দিকে শুধু তাকিয়েই রইল। শঙ্কর ঠান্ডা গলায় ক্লাসে ছাত্রদের গ্রামার বোঝাবার মতো ঢঙে বলে গেল।
”আমি যা লিখেছি সেরকম লেখা নাকি ফিল্মি ম্যাগাজিনে বেরোয়। হতে পারে। টেস্ট প্লেয়াররা এখন ফিল্ম স্টারদের থেকে পপুলারিটিতে কম কীসে? উত্তমকুমার প্রথম তিনটে ছবি করে কি এতটা নাম পেয়েছিল যা ভুবু প্রথম তিনটে ইনিংস থেকে পেয়েছে? মাস মিডিয়ায় ক’দিন ধরে অবিরত শুধু ওর নাম, ওর ছবি, ওর মুখের কথা। যে ক্রিকেটের কিছুই জানে না বোঝে না, সে-ও এখন ভুবুর নাম জানে, দেখলে চিনতে পারবে। মাত্র দশ দিনের মধ্যে একটা ছেলে বিখ্যাত হয়ে গেল। …সরোজদা সবই বদলাচ্ছে, রিপোর্টিংয়ের স্টাইলও বদলাচ্ছে, বদলে যেতে বাধ্য। ম্যাচ তো পাঠকরা টিভি-তে দেখে ফেলেছে, যা শোনার রেডিয়োতে শুনে ফেলেছে। এরপর ওদের পড়াতে হলে অন্যভাবে অন্য কিছু আপনাকে লিখতে হবে পড়াবার জন্য! আপনি যদি পুরনো স্টাইলই আঁকড়ে থাকেন, কেউ আর তাহলে আপনার লেখা পড়বে না, আপনার কাগজই তাতে সাফার করবে। তখন বাধ্য হয়েই আপনার ওপরওয়ালা আপনাকে সরিয়ে অন্য লোককে আপনার জায়গায় পাঠাবে। আমি প্রথমে ভাবব আমার কাগজের কথা, কাগজের ইন্টারেস্ট আগে দেখব, তারপর ক্রিকেট-ফ্রিকেট।”
