”রামিন্দারকে নিয়ে তুই কীসব উলটোপালটা লিখেছিস। ও নাকি ওপেন করতে চেয়েছিল, আনন্দ নাকি ওকে থ্রিডাউনে পাঠাতে চেয়েছিল…অ্যাঁ একদমই তো উলটো ঘটনা!”
কাঞ্জিলালের মুখে যত বিস্ময় তার থেকেও বেশি ফুটে উঠল সরোজের মুখে!
”তোকে কে বলল? কাগজে তো আজ কলকাতায় বেরিয়েছে। কানপুরে কি আজকের কলকাতার কাগজ এসে গেছে? আমাদের কাগজ তো এখানে বিক্রির জন্য আসে না!”
”আরে আজ সকালে ছোটোভাইপো ট্রাঙ্ককল করেছিল। কে কী লিখেছে জানতে চাইলুম তখন বলল। তাড়াহুড়োয় টেলিফোনে তো লাইন বাই লাইন বলা সম্ভব নয়। বলল সরোজ বিশ্বাসের লেখার ভঙ্গিটা দারুণ। তবে তরুণ নাকি তোর উলটো কথাই লিখেছে। যাক গে ওরা কেউই বাংলা জানে না, হাতে পেলেও কী লেখা হয়েছে তা পড়তে পারবে না। আরে-” কাঞ্জিলাল মাথাটা নামিয়ে ফিসফিস করে বলল, ”এই নিয়েই কালরাতে হাতাহতি হয়ে গেছে রামিন্দার আর আনন্দে। ওকে তো আনন্দ জোর করে ওপেন করিয়েছে। ওয়েস্ট জোন-সাউথ জোন প্যাক্ট হয়েছে, রামিন্দার ফেল করলেই বসিয়ে দিয়ে বোম্বের নিরু খাম্বাটাকে ঢোকাবে। এদিকে নর্থ আর সেন্ট্রাল আমাকে দলে টানার জন্য…পরে বলব সব…শঙ্কর ছেলেটা কোথায় বল তো, ওকে খুঁজতেই এসেছি। কীসব যা-তা লিখেছে, ভাই বলল কলকাতায় ডেফিনিটলি ভুবুকে নিয়ে কথা উঠবে…ওর ঘরের সামনে মেয়েরা নাকি লাইন দিচ্ছে, ও অটোগ্রাফ দিচ্ছে চুমুর বদলে, মেয়েরা ফোন করছে ওর সঙ্গে শোবার জন্য…আচ্ছা এইসব গাঁজা গুলগপ্পোর কোনো মানে হয়? সম্ভব এসব? এতে ভুবুরই ক্ষতি হচ্ছে। তবু রক্ষে বাংলা কাগজে এসব বেরোয়নি।” আবার মাথা ঝুঁকিয়ে কাঞ্জিলাল ফিসফিস করল, ”কাল রাত সাড়ে এগারোটায় ফিরেছে। মনোহরণ আজ সকালে আমাকে আলাদা ডেকে নিয়ে বলল, ভুবুকে নামিয়ে দিয়ে গেল একটা মেয়ে। স্লাইট নাকি টলছিল। কিন্তু কাল যা ব্যাট করল, এখন তো এই সিরিজেই ওকে কিছু বলা যাবে না। কিন্তু ইডলি-দোসা তো জানিসই কীরকম স্ট্রীক্ট। আমাকে বলল, তুমি ওয়ার্ন করো নয়তো রিপোর্টে আমি এগেনস্টে লিখব। সবে টেস্ট কেরিয়ার শুরু করেছে এখনই যদি এরকম উড়তে শুরু করে…ওকি নিজেকে সোবার্স বা কানহাই ভাবছে নাকি? এরপর শঙ্করের ওইসব লেখা যদি চোখে পড়ে…বারণ করতে হবে আর যেন না লেখে, ভুবুকেও যেন বলে দেয় সমঝে চলে। আমার পক্ষে এসব ব্যাপার নিয়ে বাচ্চচাছেলেদের সঙ্গে বলাবলি করাটাও মুশকিল, ফট করে ছোটোবড়ো কী একটা বলে দেবে।…শোন ওকে তো দেখছি না। তুই বরং শঙ্করকে বুঝিয়ে বসিল। বলবি তো?”
সরোজ মাথা নাড়ল।
”তুইও অমন উলটোপালটা লিখতে গেলি কেন? রামিন্দার তো ইচ্ছে করেই আজ নামল না। তবে আমি ওকে ড্রপ করার বিপক্ষে, লড়তে হবে। শঙ্করকে বলিস।”
কাঞ্জিলাল চলে যাচ্ছে। সরোজ ওর দিকে শূন্যচোখে তাকিয়ে রইল। মাথার মধ্যে এলোমেলো লাগছে। কী বেরিয়েছে, কীভাবে বেরিয়েছে তার লেখাটা? সে তো স্পষ্ট ইঙ্গিতই দিয়েছে রামিন্দারের সঙ্গে আনন্দের কথাগুলো কাল্পনিক।
কাঞ্জিলালকে থামিয়ে অভয়ঙ্কর আর উন্নি কথা বলছে। তরুণ প্রেসবক্সের ধাপগুলোর পাশে সরু প্যাসেজটা দিয়ে ভিড় ঠেলে আসছিল। হাতে কয়েকটা প্রেস ফর্ম। কথা শেষে করে কাঞ্জিলাল ধাপ থেকে প্যাসেজে নামতেই তরুণ হেসে কাঞ্জিলালের সঙ্গে কথা বলতে বলতে বেরিয়ে গেল।
চায়ের পর খেলা শুরু হতেই কাঞ্জিলালের কথাগুলো কিছুক্ষণের জন্য ভুলে গিয়ে সরোজ খেলার দিকে মন দেয়। রিপোর্টের প্রথম ভূমিকা যা থাকবে সেটা লিখে ফেলতে থাকে। দু’তিনবার মাঠের দিকে তাকিয়ে সে বুঝে যায় আর দেখার কিছু নেই। যে-কোনো পাঁচ দিনের খেলার প্রথম দু’দিনের পর ম্যাচটা দুলে ওঠে, হয় ক্যাঁচকোচ শব্দে নয়তো মসৃণভাবে।
লেখার মাঝে বারবার কাঞ্জিলালের কথাগুলো কামড় দিচ্ছিল। রামিন্দার সম্পর্কে ক্ষতিকর কিছু তো সে লেখেনি বরং তাকে বীর হিসাবে দেখাবারই চেষ্টা করেছে। রাতে হাতাহাতির ব্যাপারটা শঙ্করই ভালো জানবে ভুবুর কাছ থেকে। এইসব খবর জানার প্রধান উপায় খেলোয়াড়রাই, তাই অনেক সাংবাদিকই ওদের সঙ্গে দহরম পাতাতে চেষ্টা করে। সফলও হয়, কেননা খেলোয়াড়রাও ব্যক্তিগত স্বার্থসিদ্ধির জন্য খবরের কাগজের আশ্রয় চায়। তরুণও নিশ্চয় লাইন করেছে কারুর সঙ্গে। তবে ইংরেজি কাগজেই সুবিধাটা বেশি।
সরোজ মুহূর্তের জন্য লেখা থামিয়ে ভাবল, আমিও কি লাইন করব? যে ভঙ্গিতে এতকাল চলেছি সেটা কি বদলাব? ‘টোটালি মিস ফিট’! জার্নালিজম এখন যেখানে এসেছে গুহঠাকুরতা সেইখানে পৌঁছতে চায়। কিন্তু সেখানে খেলাটা কোথায়?
রিপোর্ট জমা দেবার সময় তরুণকে গতদিনের মতোই দেখতে পেল টেলেক্স অপারেটরের ঘাড়ের কাছে দাঁড়িয়ে। পাছে অন্য কেউ পড়ে ফেলে তাই হয়তো পাহারা দিচ্ছে। কিংবা অন্যরা কী লিখছে সেটাও পড়ে নেবে এক ফাঁকে। কিন্তু হাতাহাতির খবরটা কি জেনেছে? কাঞ্জি বেরিয়ে যাবার সময় তরুণের সঙ্গে দেখা হয়েছে। দুজনে কথা বলতে বলতে বেরিয়েছে। নিশ্চয় তখন কাঞ্জি ওকে ব্যাপারটা বলেছে।
”কী হে তরুণ, তোমার ডেসপ্যাচ পৌঁছেছে?”
”না, সরোজদা। ওপাশে দুটো নম্বরই এনগেজড।”
”তুমি ওখানে দাঁড়িয়ে থাকলেই কি লাইন ফ্রি হয়ে যাবে?”
তরুণ বেরিয়ে এল।
”দাঁড়িয়ে থেকে না করালে কপি ফেলে রেখে দেবে।”
