”না।”
সরোজ প্যান্ট থেকে লুঙ্গিতে যাওয়ার কাজে ব্যস্ত হল। মান্না সুটকেস থেকে একটা শিশি বার করে, রুমালে সেটা উপুড় করেই রেখে দিল যথাস্থানে।
”খাওয়ার নেমন্তন্ন?”
”হ্যাঁ। মিস্টার দাশগুপ্ত আপনার নাম শুনেছেন বললেন।…কিন্তু আপনার সঙ্গে তো দেখা হয়নি তাই আর বলতে পারেননি।”
মান্না যেন কৈফিয়ত দিচ্ছে বিরাট অপরাধ ঘটে যাওয়ার।
”আরে না না, আমাকে কেন বলবেন…”
খটখট আওয়াজের পর দরজাটা খুলে বেয়ারা উঁকি দল। ”এক সাহেব নীচে অপেক্ষা করছেন।”
”যাচ্ছি, ঘণ্টা দুয়েকের মধ্যেই ফিরে আসব।”
মান্না ব্যস্ত হয়ে বেরিয়ে গেল। খবরের কাগজটা নিয়ে সরোজ বিছানায় গা ঢেলে দিল।
নিউজিল্যান্ড দ্বিতীয় দিনটা কাটিয়ে দিল পাঁচ উইকেটে ৩৭২ রানে পৌঁছে। সাদামাটা উইকেটে নিরুপদ্রবে তারা স্পিনারদের এখানে ওখানে ঠেলে ধীরগতিতে রান তুলেছে। মার্কসের পন্থাটা পরিষ্কার। যতক্ষণ পারো উইকেটে থাকো, থাকলেই রান আসবে। বোলারদের ক্লান্ত করে করে ক্ষইয়ে দাও, ফিল্ডাররা অপেক্ষা করে করে আর বলের পিছনে ছুটে ছুটে ব্যাজার হোক, ঢিলেমিতে পড়ুক। চিত্তাকর্ষক ক্রিকেট, ভারতে পা দিয়েই যেসব গালভরা কথা সে বলেছিল, আপাতত শিকেয় তোলা থাক। ম্যাচ জিততে হবে। প্রথমদিনেই ভারতকে দু’শো রানের মধ্যে নামিয়ে দিয়ে ক্ষীণ আশা যখন দেখা গেছে সেটাকে তখন স্পষ্ট করে তোলার জন্য মার্কস খেলাটাকে বিস্বাদে ভরিয়ে দিতে দ্বিধা করেনি। এই প্রথম সে অধিনায়ক হয়েছে। ম্যাকগ্রেগর হিসাব কষে পরিকল্পনা অনুযায়ী খেলেছে। দ্বিতীয় দিনের শেষে ৪২০ মিনিট ব্যাট করে সে ১২৯ রানে ক্রিজে রয়ে গেছে।
রবি আনন্দের বোলার বদল আর ফিল্ড সাজানো সরোজকে অবাক এবং বিরক্ত করেছে। আনন্দ যেন ধরেই নিয়েছে নিউজিল্যান্ড আড়াই দিন ধরে ব্যাট করবে সুতরাং যত কম রান ওরা তুলতে পারে সেই চেষ্টাই করা ভালো। একটা ম্যাচে এগিয়ে থাকা অধিনায়ক অবশ্য এভাবেই চিন্তা করবে-জেতার সম্ভাবনা না থাকলে হারার সম্ভাবনা থেকে দূরে সরে যাওয়া। কিন্তু জিততে পারব না, এমন মানসিকতাই বা কেন তাকে চালনা করবে?
ম্যাচ শেষে সাংবাদিকদের কী বলবে, আনন্দ নিশ্চয় সেটা তৈরি করে ফেলেছে-বোলিংয়ে ধার নেই, উইকেটে প্রাণ নেই, ব্যাটসম্যানদের ব্যর্থতা চিন্তা করা যায় না! অর্থাৎ ধারালো বোলিং, সতেজ উইকেট আর ঝুড়ি ভরা রান পেলে তবেই সে অধিনায়কত্ব দেখাতে পারে! ভাণ্ডারকর ৩৬ ওভার বল করে দুটি মাত্র উইকেট পায়। তারপর ওভারের মাঝে হঠাৎ বাম ঊরুর পিছন দিকটা চেপে ধরে খোঁড়াতে শুরু করে বুঝিয়ে দিল হ্যামস্ট্রিং মাসল টেনে ধরেছে। সে মাঠ ছেড়ে চলে আসে। সারাক্ষণ সে জোরের উপর অল্প শর্ট লেংথে বল ফেলে গেছে অফ স্টাম্প বরাবর। আনন্দ তাকে খুশিমতো বল করতে দিয়ে গেছে। সরোজ অবশ্য ভাণ্ডারকরের মাঠ ছেড়ে যাওয়াটাকে ভালো মনে নিতে পারেনি। তার ধারণা, ও পালিয়ে গেল বদনামের ভয়ে। এখনও ওর তিনটি উইকেট দরকার দু’শো ছুঁতে।
একটা ব্যাপারে কেউ বিশেষ গুরুত্ব দিল না অস্বাভাবিক নয় বলেই। রামিন্দার সারাদিন মাঠে নামেনি অসুস্থ বোধ করায়। বুকের এক্স-রে হয়েছে, কিছু পাওয়া যায়নি তবে সামান্য জ্বর। গতকাল অবশ্য ফিল্ড করেছে। রাতেই নাকি বুকে ব্যথা আর জ্বর দেখা দেয়।
আজ আর কার্ডাসকে অনুকরণ করার তো কোনো ইচ্ছা বা প্রেরণা সে বোধ করল না। সোজা বর্ণনা এবং কয়েকটি বহু ব্যবহৃত বিশেষণ ছিটিয়ে বোলিং এবং অধিনায়কত্বের সমালোচনা করল।
শঙ্কর লাঞ্চের পর কিছুক্ষণ প্রেসবক্সে ছিল। তখন সরোজ খেলা দেখার বিরক্তি কাটাতে চেঁচিয়ে ওকে বলে, ”কী হল বাজির? জিতেছি কি?”
”কীসের বাজি?”
”ভুলে গেলে? সেই যে আবার আসবে কি না ভুবুর কাছে!”
”ওহহ… না আপনিই জিতেছেন। আসেনি। ভুবুকেই কাল রাতে গাড়ি পাঠিয়ে নিয়ে গেছল বাড়িতে আর… এত লোকের মধ্যে বলা যায় না, পরে বলব।”
মিনিট পাঁচ পর সরোজ দেখল টেবলের উপর হুমড়ি খেয়ে ঝুঁকে তরুণ কী জিজ্ঞাসা করল শঙ্করকে। ”সে একটা বাজির ব্যাপার,” এই বলে শঙ্কর এড়িয়ে গেল।
রোজার অটোগ্রাফ বইটা আজ সে সঙ্গে এনেছে। দুজন বাদে পুরো নিউজিল্যান্ড টিমটাকেই এখন পাওয়া যাবে। জলপানের জন্য খেলা বন্ধ হতে শঙ্কর উঠল। অনেক বন্ধুবান্ধবী সে সংগ্রহ করে ফেলেছে। এখন তাদের কাছে গিয়ে বসবে। সরোজ ইশারায় তাকে ডাকল।
”একটা রিকোয়েস্ট, রাখতেই হবে। নিউজিল্যান্ডারদের অটোগ্রাফগুলো যদি জোগাড় করে দাও…তুমি ছাড়া তো কেউ আর পারবে না।”
শঙ্কর বিনা বাক্যে বইটা হাত থেকে নিয়ে বলল, ”ইন্ডিয়ানসদেরগুলোও তো চাই?”
”তা তো চাই-ই।”
”ঠিক আছে, এখন আমার কাছে থাক।”
শঙ্কর চলে যাবার জন্য পা বাড়াতেই সরোজ বলল, ”বাজি কিন্তু টেকনিক্যালি আমি জিতেছি।”
শঙ্কর মাথা হেলাল ঠোঁটে হাসি টেনে।
”দিল্লিতে ভুবুকে তাহলে…।”
”নিশ্চয়, বলেছি যখন…।”
চায়ের সময় প্রেসবক্সে লোক কম। তখন অনিল কাঞ্জিলালকে উঁকি দিতে দেখে সরোজ এগিয়ে গেল।
”আরে কাঞ্জি! ব্যাপার কী?”
কাঞ্জিলাল আর সরোজ একসঙ্গে রঞ্জিতে খেলেছে। ব্যাট ভালোই করত…টেকনিক্যালি সাউন্ড। দুটো দলীপ ম্যাচও খেলেছে, সরোজ খেলেনি। দলীপ ট্রফি শুরু হবার আগেই সে বাংলা দল থেকে বাদ পড়েছিল। টেস্ট খেলেনি অথচ পূর্বাঞ্চল থেকে ওকে জাতীয় নির্বাচক করায় অনেকেই কাঞ্জিলালের বিরুদ্ধে লেখে। সরোজ ওর পক্ষ নিয়ে লিখেছিল-বহু বিখ্যাত টেস্ট খেলোয়াড়ের থেকে কাঞ্জিলালের ক্রিকেট-জ্ঞান গভীর।
