শুক্লা অবাক হয়ে বলল, ”লাইন তো চালুই আছে আবার ডাউনের প্রশ্নই নেই!”
”সে কী! সকালে গড়বড় ছিল না? এই যে একজন…”
”কলকাতায় তো তরুণ লাহিড়ির দুটো রিপোর্ট গেছে। সকালে মাঠে এসেই একটা দিয়েছিলেন আর লাঞ্চে একটা, এই তো কপি রয়েছে দেখুন না।”
শুক্লা টাইপ করা লম্বা দুটো কাগজ এগিয়ে দিল। ছাপা হওয়ার আগে বিনা সম্মতিতে কারুর রিপোর্ট পড়া অনুচিত বলে সরোজ মনে করে। কিন্তু পেশাগত কারণে বিশেষত প্রতিদ্বন্দ্বিতার ক্ষেত্রে কোনো বুদ্ধিমানই এ হেন ঔচিত্য মেনে চলে না। কয়েক সেকেন্ড ইতস্তত করে সে শুক্লার হাত থেকে টেলেক্স কপি নিল কৌতূহল দমন করতে না পেরে। তরুণও রোমানে লেখে। প্রথম বাক্যটি দেখেই জানল স্টোরি রামিন্দারের সম্পর্কে। তার ব্যক্তিগত জীবনে কী ঘটেছে তার উপরেই গল্পের মতো করে লেখা।
লিখল কখন? কাল রাতেই নিশ্চয়। তাই সে তাড়াতাড়ি উঠে গেল। আর আজ মাঠে এসেই টেলেক্সে ধরিয়ে দিয়েছে। অন্যটিতে তরুণ তার অফিসকে জানাচ্ছে-আউট হবার পর রামিন্দারের সঙ্গে কথা বলেছি, সেটা পাঠাব, ওর স্টোরির সঙ্গে যেন এটা জুড়ে দেওয়া হয়।
এসব যা পাঠাচ্ছে সেটা গোপন রাখার জন্যই তরুণ মিথ্যা বলে যাচ্ছে। সরোজের হাসি পেল। পাঠাক যত খুশি স্টোরি, ইন্টারভিউ, সে তো অন্য কোণ থেকে লিখবে! হ্যাঁ রামিন্দারকে নিয়েই।
কোনো ব্যস্ততা না দেখিয়ে ইনিংস শুরু করল নিউজিল্যান্ডের ওপেনাররা। দুটো মেডেন ওভারের পর শর্মার বলে স্কোয়্যার লেগ থেকে এক রান দিল ম্যাকগ্রেগর। সরোজ অতঃপর মাথা নামিয়ে লেখায় মন দিল।
দিনের শেষে নিউজিল্যান্ড ৬৬ বিনা উইকেটে। নিরাপদ ব্যাটিং, নেতিমূলক বোলিং এবং দর্শক জনতার বিরক্তি প্রকাশ ছাড়া শেষ দেড় ঘণ্টায় আর কিছু ছিল না।
”সরোজদা, বলুন তো ভুবুর ফোরস অ্যান্ড সিক্সেস ক’টা, মিনিটস, ক’টা বল ফেল করেছে?”
”শঙ্কু, সারাদিন ছিলে কোথায়?”
”প্লেয়ার্স এনক্লোজারে, ভি আই পি ব্লকে।”
”খাওয়া-দাওয়া?”
”আরে ভুবুর বন্ধুর কি খাওয়ার অভাব হয়? ফ্লাক্সে আনা হুইস্কি-সোডা পর্যন্ত মিলেছে। চারটে ডিনারের ইনভিটেশন চার রাত্রে। অফ ডে’তে লাঞ্চের। মুশকিল শুধু একটাই, সবাই বলে ভুবুকে সঙ্গে আনুন। কিন্তু ওকে জিজ্ঞেস না করে আমি কী করে কথা দেব? এরপর কানপুরে এলে আর হোটেলে উঠতে হবে না।”
”তুমিই তো দেখছি হিরো।”
”ভুবুর সৌজন্যে। দিন দিন।” পুলক চাপতে চাপতে শঙ্কর খাতাটা টেনে নিয়ে চোখ বুলিয়েই বলল, ”বাংলা ভালো পড়তে পারি না, মুখে বলুন।”
”বলছি বলছি। তা ভুবুকে আজ কত অটোগ্রাফ দিতে হল?”
”অফিসিয়ালদের ও বলে দিয়েছিল অটোগ্রাফ বুকগুলো আমার কাছে জমা দিতে। গোটা কুড়ি আমাকে ওরা দিয়ে গেছল। টি-এর সময় ভুবু সই করে দেয়। এইসব সেক্রেটারিয়াল কাজ করতে করতেই সময় চলে গেল খেলা আর দেখা হল না।… তবে লাভের মধ্যে দুটো মেয়ের সঙ্গে আলাপ হল, ভুবুকে বলতে হবে।”
সরোজ আলোচনা আর এগোতে দিল না। শঙ্কর যা জানতে চায় জানিয়ে দিল।
”এখন হোটেলে যাব। ঘরে বসে টাইপ করে দিয়ে যাব। আটটা পর্যন্ত তো খোলা থাকবে।”
শঙ্কর চলে গেল। তার হোটেল পাঁচ মিনিটের পথ। সরোজও একবার ভেবেছিল নিজের হোটেলে গিয়ে নিরিবিলিতে লিখবে। পরে মনে হয়, যদি কিছু জানার দরকার হয়, এখানে অনেকেই বসে লিখছে, জেনে নেওয়া যাবে। তা ছাড়া প্রেসবক্স তো এখন প্রায় ফাঁকাই।
তরুণ উপরের দিকে একটা ফাঁকা টেবলে গভীর মনোযোগে লিখে যাচ্ছে। আর মাঝে মাঝে মাঠের দিকে শূন্যচোখে তাকিয়ে থাকছে। কয়েকটি অল্পবয়সি ছেলে কৌতূহল ভরে সাংবাদিকরা কী লিখছে জানার চেষ্টায় চেয়ারের পিছনে গিয়ে দাঁড়াচ্ছে। বাইরে দোকানপাটের জায়গায় ঝাড়ু শুরু হয়েছে, ধুলো উড়ছে। অদ্ভুত এক শান্ত পরিবেশ। মনেই হয় না কিছুক্ষণ আগে হাজার চল্লিশ লোক এখানে ছিল।
সরোজ তার লেখা জমা দিয়ে বেরিয়ে এসে শ্রান্ত বোধ করল। প্রায় সাড়ে ন’ঘণ্টা শুধু চেয়ারেই। শরীর টনটন করছে, মাথার মধ্যে সাড়া দেবার ব্যবস্থাটা ঢিলে হয়ে রয়েছে। একেবারে রাতের খাওয়া সেরেই হোটেলে ফিরবে ঠিক করল। শঙ্করকে আজ আর পাওয়া যাবে না, তা ছাড়া একসঙ্গে কোথাও গিয়ে খাওয়া সম্পর্কে কিছু বললও না। হয়তো কোথাও নিমন্ত্রণ পেয়েছে। তরুণকে এড়িয়ে যাওয়াই ভালো। টেলেক্স অপারেটরের ঘাড়ের কাছে ওকে ঝুঁকে থাকতে দেখল। পুরো রিপোর্ট অফিসে না পৌঁছনো পর্যন্ত ও নড়বে না। কখন যে রামিন্দারের সঙ্গে কথা বলে এল!
সরোজ রিকশায় মল রোডে এক পাঞ্জাবি রেস্টুরেন্টে এসে রুটি-মাংস খেয়ে আবার রিকশায় হোটেলে ফিরল।
রবীন মান্না বেরোবার জন্য তৈরি। সরোজ ঘরে ঢুকতেই একগাল হেসে বলল, ”দারুণ খেলল ছেলেটা… না হলে ইন্ডিয়া পঞ্চাশের মধ্যেই তো অল আউট হয়ে যেত, কী বলেন?”
”পঞ্চাশের মধ্যে কেন?”
”ওর রানটা বাদ দিলে তাহলে থাকে আর কত?”
”ত বটে।” সরোজ হাসি চাপল। ”আপনার কাজ চলছে কেমন?”
”কালকেই মনে হচ্ছে শেষ করা যাবে, তাহলে কাল রাতেই রাজধানীতে কলকাতা ফিরে যাব। টিকিটের জন্য বলেছি, বোধহয় পেয়ে যাব।”
”এখন কোথায় বেরোচ্ছেন?”
”ডিপো ম্যানেজারের বাড়িতে।” মান্না হাতঘড়ি দেখাল। ”সাড়ে আটটায় আসার কথা অথচ…বাইরে কি খুব শীত মনে হল?”
