সরোজ খাতাটা খুলে বাংলায় লিখে রাখতে শুরু করল তার আজকের রিপোর্টের একটা অংশ। সংলাপটায় যাতে পাঠকরা অভিভূত হয় সেইভাবে রিপোর্টে বসাতে হবে।
”সরোজদা রামিন্দার সম্পর্কে কী লিখবেন।”
অভয়ঙ্কর নিজের চেয়ারে বসতে বসতে চেঁচিয়ে বলল।
”কী লেখা যায়?” সরোজ পালটা প্রশ্ন করল।
”ফিনিশড।”
”তাই লিখব।”
সরোজ খাতায় মন দিল।
লাঞ্চের পর ভবানী আর আনন্দ তিনটি ওভার স্বচ্ছন্দে খেলে গেল। মার্কস একসঙ্গে জোড়াবদল ঘাটাল। এল অফ-স্পিনার পিকার্ড আর ন্যটা স্পিনার ওয়ালেস। দুজনে দুটো মেডেন ওভার পাবার পর বিনামেঘে বজ্রপাতের মতো আনন্দ, শান্তনম, রাতুল পারিখ আর সঞ্জীব শর্মা ৩১ বলের মধ্যে ক্রিজে এসেই ফিরে গেল। ভারত সাত উইকেটে ৯১, ভবানী ৪৩ রানে।
গ্যালারিতে হতাশাজনিত আক্ষেপ ধীরে ধীরে নেমে এল বিস্মিত গুঞ্জনে। চোখের সামনে এসব কী ঘটছে! বল কি খুব ঘুরছে! পিচ কি ভেঙে গেছে নয়তো পিকার্ড তিন জনকে শর্ট লেগে ক্যাচ তোলাল কী করে?
তরুণ চেয়ারে বসছে। সরোজ লক্ষই করেনি ও প্রেসবক্সে ছিল না। শঙ্করের চেয়ারটা এখনও খালি। চোখাচোখি হতেই তরুণ হাতের ইশারায় বোঝাল এতক্ষণ সে টেলেক্স ক্যাম্পে ছিল।
”লাইন খুলেছে?” সরোজ গলা চড়িয়ে জানতে চাইল।
”এই খুলল।”
উইকেটকিপার জয়ন্ত রেগে এসেছে ভবানীর জুড়ি হয়ে। ব্যাটসম্যানের মতো দেখায় এমন একটা ভান সে করতে পারে, কিন্তু তার পরের দুজন, মধু ভাণ্ডারকর আর অরুণ পিল্লাই তা-ও পারে না। পরিস্থিতিটা মনে হল ভবানীর কাছে স্বচ্ছ এবং সরল হয়ে গেছে। ইনিংসের পতন যে আসন্ন এটা বুঝেই সে ড্রাইভ আর কাটের উপর ভরসা করে এবং প্রতি ওভারের শেষ বলে এক রান নিয়ে ষাট পেরিয়ে গেল রেগেকে একবারও ব্যাটে বল ছোঁয়াতে না দিয়ে। সকালের সেই প্রচণ্ড একটা ওভারের মতো রোমহর্ষক সাজে নামার ইচ্ছা ভবানীর ব্যাটিংয়ে ধরা দিচ্ছে না। শান্ত, হিসেব কিন্তু সন্ধানী মনোভঙ্গিই ফুটে উঠছে। সরোজের মনে হল ছেলেটি দায়িত্ব নেবার ইচ্ছা রাখে এবং কঠিন সময়ে দিশাহারা হয় না। বড়োজাতের ক্রিকেটার।
রেগে প্রথম যে বলটা ওয়ালেসের কাছ থেকে পেল সেটাকে মিড উইকেট বাউন্ডারির উপর দিয়ে ফেলার বাসনায় লাফ দিয়ে বেরোল, ফসকাল এবং স্টাম্পড হল। ভাণ্ডারকরের আগমনই ভবানীর কাছে ভারতের ইনিংসে শেষের সংকেত। আট উইকেটে ১১৩। সে ৬৭। এবার সংযমের খোলস থেকে বেরিয়ে আসার সময়। ওয়ালেসের বাকি বলগুলো ভাণ্ডারকর দৈব সাহায্যেই খেলেছিল আটজন দ্বারা ঘেরাও অবস্থায়।
২৫ বল পর খ্যাপা গ্রিন পার্কের চিৎকারের মধ্য দিয়ে ভবানী সেঞ্চুরিতে পৌঁছল। তিনদিক থেকে মাঠের মধ্যে ছুটে গেল কয়েকটি কিশোর, পিছনে তাড়াকরা পুলিশ। তরুণের ঠোঁটের কষে ফেনা দেখা গেল। সে চেয়ার থেকে উঠে দু’ধাপ নীচে বসা স্কোরারের টেবলে হুমড়ি দিয়ে পড়ল ভবানীর চারের ও ছয়ের সংখ্যা জানার জন্য। টুকে রাখার মতো অবস্থায় সে গত দশ মিনিট ছিল না। যখন চারটি ১, চারটি ৬ ও তিনটি ৪ স্কোর বইয়ে স্থান নেয়।
ব্যাটসম্যানরা ক্রিজে নিজেদের জায়গায়, বোলার তৈরি বল করার জন্য, ফিল্ডাররা যে যার স্থানে। উচ্ছ্বাস অভিনন্দন থিতিয়ে এল। সরোজ তার চারপাশের মুখগুলোয় জ্বলজ্বলে আভা দেখতে পাচ্ছে। যাকে পেয়েছে তরুণ তারই হাত ধরে ঝাঁকিয়েছে। ভবানীর প্রাপ্য অভিনন্দনগুলো সে যেন কুড়িয়ে তুলে রাখল। একসময় সে সরোজেরও হাত ধরে গলা নামিয়ে বলে, ”প্রাদেশিকতা ভাববেন না সরোজদা… ক্রিকেট প্রেসবক্সে বাংলা একটু অধিকার পেল, লেখার মতো কিছু একটা তো হাতে এল!”
সরোজ ভেবে পাচ্ছে না কী লিখবে ভবানীর এই বিলম্বিত বিস্ফোরণ বিষয়ে। লংঅফে এবং ডিপ স্কোয়্যারলেগে হাত থেকে তার ক্যাচ পড়েছে, ক্রিজ থেকে এক হাত বেরিয়ে গিয়ে বল ফসকে ফিরে এসেছে নিরাপদে। ভাগ্যবান তো বটেই! তবে তার নিজেকে ভালো লাগছে। উত্তেজনা নিজের মধ্যেও অনুভব করছে, হয়তো তার মুখেও জ্বলজ্বলে কিছু একটা ফুটে উঠেছে।
ভবানীর পক্ষে এভাবে বেপরোয়া মেরে যাওয়া বেশিক্ষণ যে সম্ভব হবে না সরোজ তা জানে। তার নিজেরও এই অভিজ্ঞতা আছে। এখন নিজেকে মারের ঝোঁকের বিরুদ্ধে নিয়ে যাওয়া মানে বিপর্যয় ঘটানো।
চায়ের সাত মিনিট আগে ভারতের ইনিংস শেষ হল ১৯৮ রানে। ভবানী রান আউট ১৪৫। পিল্লাই ০, ভাণ্ডারকর নট আউট ৪। স্কোর কার্ডটা অদ্ভুত দেখাচ্ছে। শুধু একটি লোকই দানবের মতো সেখানে দাঁড়িয়ে।
”জীবনের প্রথম দুটো টেস্টে সেঞ্চুরি এর আগে ভারতের কেউ করেনি। এ ব্যাপারে আমি নিশ্চিত।” সরোজ পিছনের সারিতে কান পেতে রইল। রেকর্ডের খবর সে বিশেষ রাখে না। কিন্তু লেখার দরকার হয়। তবে কলকাতায় ডেস্কের কেউ-না-কেউ ইতোমধ্যেই জেনে গেছে। হয়তো রেডিয়ো কমেন্টেটরদের বা অফিসেরই ছোকরা কারুর কাছ থেকে। তা ছাড়া এজেন্সিও পাঠাবে। না উল্লেখ করলেও তার লেখার মধ্যে কিংবা আলাদা বক্স করে বসিয়ে দেবে। রমেন গুহঠাকুরতা এসব ব্যাপারে খুঁতখুঁতে হুঁশিয়ার।
তরুণ আবার উঠে গেছে। এই নিয়ে দ্বিতীয়বার হয়তো টেলেক্স করতেই গেছে। কিন্তু লিখল কখন? সরোজ প্রেসবক্সের বাইরে এল। চায়ের পর থেকেই লেখা শুরু করা দরকার। টেলেক্স ক্যাম্পে গিয়ে মণীশ শুক্লাকে দেখতে পেল। একগোছা সাদা প্রেস ফর্ম চেয়ে নিয়ে জানতে চাইল কলকাতার লাইন আবার ডাউন হবে না তো?
