”আবার শঙ্কর কেন?”
”ভবানী কী বলল-টলল ওর কাছ থেকে একটু জেনে নিতাম।”
”তুমি নিজে গিয়েও তো জেনে নিতে পারো।”
বাংলায় দুজনের কথা হচ্ছে, কামদার শুনতে শুনতে বোঝার চেষ্টা করছিল। হঠাৎ বলল, ”যদি কথা বলতে হয় তো রামিন্দারের সঙ্গে বলো। জিজ্ঞেস করো কী করে তুমি ওই বলে আউট হলে।”
ওর মুখের দিকে একপলক তাকিয়ে তরুণ বলল, ”আমার ইন্টারেস্ট বেঙ্গলের প্লেয়ারের খবরে। বাক্সে কী খাবার দিচ্ছে সরোজদা, খাওয়া যায়, অম্বল হবে না তো?”
”দ্যাখোই না মুখে দিয়ে।”
তরুণ কুপন হাতে ঘেরা জায়গাটার দিকে এগিয়ে গেল।
”কামদারজি, কোন কাগজের হয়ে কভার করছেন?”
”একটা উর্দু ডেইলি, একটা হিন্দি ম্যাগাজিন।” বৃদ্ধ নিজেকে উৎফুল্ল দেখাবার চেষ্টা করল। ”আজ সকালে আমার কাছে এসেছিল লখনউয়ের এক ইংরেজি কাগজের, কী নাম যেন কাগজটার, লোকটা খুব ধরল রোজ হাফ কলাম কমেন্ট যদি দিই। বলল একশো টাকা দেবে। দিনে একশো, বলো আমার মতো লোকের পক্ষে এতে কি রাজি হওয়া যায়?”
”লিখছেন?”
”না।” প্রাক্তন টেস্ট ক্রিকেটার উদ্ধত ভঙ্গিতে চিবুক তুলে মুখ ঘুরিয়ে নিল। বিপত্নীক, ছেলেপুলে নেই, স্বভাবে উড়নচণ্ডী, কোনোদিন পাকা চাকরি করেনি, খুবই অনটনের মধ্যে জীবনের শেষ অধ্যায় কাটাচ্ছে।
”আমাদের খেলার সময়ে প্রেসবক্সে এত লোক হত না, আমাদের সম্পর্কে এতরকম কথাও কাগজে বেরোত না। এখন তো সব কাগজ, ম্যাগাজিনই নিজের লোক পাঠাচ্ছে। বেশিরভাগই ক্রিকেট বোঝে না, বোঝার দরকারও মনে করে না। তারা চায় স্টোরি। ক্রিকেটের উপরে বসিয়েছে প্লেয়ারদের, খারাপ এটা খুব খারাপ,…আচ্ছা।” আচমকা কথা বন্ধ করে বৃদ্ধ ব্যস্ত হয়ে চলে গেল।
সরোজ তাকিয়ে থেকে কামদারকে দেখছিল। হাতের বাক্সটা পায়ের কাছেই নামিয়ে রাখল। দেখতে পেল ফোটোগ্রাফার রামকুমারকে, সে চা খেতে খেতে কথা বলছে দুটি লোকের সঙ্গে। সে প্রেসবক্সে ফিরে এল। লাঞ্চ শেষ হতে, এখনও পনেরো মিনিট।
যদি সেঞ্চুরি করে তাহলে ভবানীকে নিয়ে সব বাংলা কাগজ কাল উচ্ছ্বাসের বন্যা বইয়ে দেবে। সরোজ ঠিক করে ফেলেছে তার লেখায় প্রাধান্য দেবে রামিন্দারকে। বেচারা! বলটা কেমন ছিল সেটা দেখা হয়নি। ও নাকি ওপেন করতে চায়নি। উচিত হয়নি ওকে প্রথমে পাঠানো।
সরোজ হঠাৎ ভিতর থেকে নাড়া খেয়ে সোজা হয়ে বসল। কার্ডাস তো বহু নামী বা অনামী ক্রিকেটারের মানসিক গঠনের বা চরিত্রের নানান দিক, তাদের বাতিক, অভ্যাস, চলন বলনের ভঙ্গি, তাদের স্বগতোক্তি, মাঠে খেলার মধ্যে অন্যদের সঙ্গে তাদের সংলাপ তাঁর রিপোর্টের মধ্যে বসিয়েছেন এবং পরে স্বীকার করেছেন ওগুলো তার কল্পনাপ্রসূত। তবে কাল্পনিক হলেও ওই ক্রিকেটারদের মুখে বসানো এইসব কথা চরিত্রের সঙ্গে মানিয়ে যায়, তাদের পক্ষে এই কথাগুলো বলা খুবই সম্ভব।
যদি রামিন্দার বলে, সরোজ মনে মনে তৈরি করতে শুরু করল, নিয়তি আমাকে তাড়া করছে নয়তো অমন একটা সহজ বল কেন উইকেটকিপারের হাতে পাঠাব! ‘তুমি কি ভাগ্যে বিশ্বাস করো?’ এর উত্তরে ও বলবে, ‘করতাম না, এখন করি। বলটা খেলব না ভেবেছিলাম কিন্তু শেষ মুহূর্তে কে যেন বলল- প্লে। আমি অন্ধের মতো ব্যাট নিয়ে ঝুঁকলাম।’
কিন্তু রামিন্দার কি এভাবে কথা বলে? হয়তো বলে না কিন্তু তাতে কী? যাকে বউ ছেড়ে গেছে, যাকে হত্যার চেষ্টা হয়েছে, যে অন্য রাজ্যে চলে যেতে চায় সে অদৃষ্টবাদী হতেই পারে। কিন্তু ও কি ইনিংস ওপেন করতে সত্যিই চায়নি? টস হয়ে যাবার পর ড্রেসিংরুমে যদি এমন একটা সংলাপ হয়!
‘রাম, ব্যাটিং অর্ডারটা একটু বদলেছি, দেখে নাও।’
আনন্দ কাগজটা তুলে দিল রামিন্দারের হাতে। চোখ বুলিয়েই তার ভ্রূ কুঁচকে উঠল। ‘এ কী! আমি থ্রি ডাউন?’
‘হ্যাঁ। আমি বুঝতে পারছি তোমার অসুবিধে হচ্ছে নতুন বলে, আগের মতো তোমার রিফ্লেক্স কাজ করছে না, তা ছাড়া মিডল অর্ডারে জোর বাড়াতে তোমার মতো অভিজ্ঞ একজনকে এখন দরকার। মাদ্রাজে সঞ্জীব আর রাতু দুটো ইনিংসেই যেভাবে ফেল করল…’
‘তাই বলে আমাকে তুমি নামিয়ে দেবে পাঁচ নম্বরে!’
‘তোমার ভালোর জন্যই করেছি।’
‘আমাকে সবাই জানে ফাস্ট বোলিংয়ের সামনে শের ব্যাটসম্যান। দুনিয়া জানে আমার সাহস, কীভাবে আমি ছিঁড়ে ছিঁড়ে ওয়েস্ট ইন্ডিয়ানদের খেয়েছি। আর আমি এখন এই নিউজিল্যান্ডারদের বোলিংয়ে নীচে নেমে গেলে লোকে বলবে রামিন্দারটা ভয় পেয়েছে…শের থেকে বিল্লি বনে গেছে, আমাকে দেখে বাচ্চচারাও হাসবে… অসম্ভব।’
‘একটা ইনিংস অন্তত খেলে দ্যাখো।’
‘একটাও না। চিরকাল ওপেন করেছি, আজও করব, ওপেনার থেকেই খেলা শেষ করব। প্লিজ রবি আমার এই অহংকারটুকু তুমি কেড়ে নিয়ো না।’
এই বলে ব্যাটটা তুলে নিয়ে রামিন্দার ড্রেসিংরুম থেকে বেরিয়ে আলভাকে ইশারায় ডাকল মাঠে নামার জন্য।
এরপর মাঠে রামিন্দার তার অহংকার পুনরুদ্ধারের খেলা শুরু করবে। বুকে বল লাগার পর সে যেন সত্যি বাঘ-আহত বাঘ-হয়ে উঠল।
কিন্তু সত্যিই তো তা হয়নি! সরোজ মনে করতে পারছে তখন রামিন্দারের ফ্যাকাশে মুখটা। মৃত্যু যেন হাত বুলিয়ে দিয়ে গেছে।… কিন্তু সে একসময় তো সত্যিই বাঘের মতোই ব্যাট করেছে। লোকে ওইভাবেই তাকে জেনেছে, ওইভাবেই তাকে দেখতে চায়।
