স্যান্ডার্সনকে যে সরিয়ে নেওয়া হবে এটা স্বতঃসিদ্ধ। এবার আসবে রুটিনমাফিকই সিম বোলার ডন লোকাস্ট। চমৎকার লেংথ আর লক্ষ্য, বিপজ্জনক ওর জমি থেকে সরে গিয়ে ঢুকে আসা বলগুলো। ভবানীর কাছ থেকে জনতা আর একবার লঙ্কাকাণ্ড দেখার আশায় আগাম হাততালি দিতে শুরু করেছে।
ভবানীর প্রতিভা সম্পর্কে বাকি সন্দেহটুকু সরোজ কাটিয়ে উঠল পরের ছটি বলকে খেলার ধরন থেকে। প্রত্যেকটিকে সে জমি দিয়ে গড়িয়ে লোকাস্টের কাছে ফিরিয়ে দিল। জনতা এটা অনুমোদন না করলেও হাততালি দিল বোলারকে। সরোজও তালি দিল। ভবানীর জন্য।
আর উইকেট না হারিয়ে লাঞ্চে ভারত ৭৮ রানে পৌঁছল।
সরোজ প্রেসবক্স থেকে নেমে বাইরে রঙিন কাপড়ে ঘেরা একটা জায়গায় এল। কুপনের বিনিময়ে সেখানে কাগজের বাক্সে নিরামিষ খাদ্য বিতরণ হচ্ছে সাংবাদিকদের জন্য-আলুর দম, পুরি আর কালোজাম।
”চমৎকার খেলল।”
স্থানীয় এক সাংবাদিক, সরোজ নামটা মনে করতে পারল না। সে একটু হাসল মাত্র। কী লিখবে সেটা বোধহয় বুঝে নেবার জন্য এটা আলোচনার সূত্রপাত। সরোজ এড়িয়ে গেল। শঙ্করকে দেখতে পাচ্ছে না। নিশ্চয় প্লেয়ার্স ড্রেসিংরুমের কাছাকাছি রয়েছে। তরুণকে দেখেছিল ঊর্ধ্বশ্বাসে টেলেক্স ক্যাম্পের দিকে যেতে। লাঞ্চ পর্যন্ত রিপোর্ট ওকে পাঠাতে হবে ডাক সংস্করণের জন্য।
সরোজ বাক্স হাতে ঘেরা জায়গাটা থেকে বেরিয়ে একান্তে রোদ্দুরে দাঁড়াল। দু’ঘণ্টা খেলা হল। রিপোর্টের শুরুটা মাথায় এসে গেছে। এখন সে কারুর সঙ্গে কথা বলতে চায় না। ভি আই পি, খবরের কাগজ, রেডিয়ো, পি অ্যান্ড টি আর পুলিশ ছাড়া এদিকে আর আছে ক্রিকেট অ্যাসোসিয়েশনের কিছু লোক। খাবারের কোনো স্টল নেই, ফলে ভিড় কম।
১৯৩৮ সিরিজে নটিংহামে প্রথম টেস্টে অস্ট্রেলিয়ার ম্যাককেবের ২৩২ রানের ইনিংসটা সম্পর্কে নেভিল কার্ডাসের লেখার কিছু অংশ সরোজ বছর কুড়ি আগে একটা পত্রিকায় পড়েছিল। আবছা, ভাসাভাসা মনে আছে। আজ যদি ভবানীশঙ্কর তেমন কিছু একটা খেলতে পারে তাহলে কার্ডাসের থেকে যা মনে আছে লেখায় লাগিয়ে দেবে। সে খেতে খেতে চেষ্টা করল কয়েকটা লাইন ধরবার। ‘আজ ম্যাককেব প্রথম টেস্টকে সম্মানিত করল বিশাল ও মহান একটা ইনিংসের দ্বারা।’ সরোজ দুটো শব্দ বদলাল- ‘আজ ভবানীশঙ্কর দ্বিতীয় টেস্টকে…’
বাক্যটিকে সে সম্পূর্ণ করল না। বাড়াবাড়ি হয়ে যাবে না কি? ৩০০ রানের মধ্যে ম্যাককেবেরই ২৩২। মারতে শুরু করে ছ’টা উইকেট পড়ে যাবার পর, তার আগে ইংল্যান্ড সাড়ে ছ’শো রানের একটা ইনিংস বসিয়ে দিয়েছে অস্ট্রেলিয়ার সামনে। কোনো মিলই নেই পরিস্থিতির সঙ্গে। সিরিজে ১-০ এগিয়ে, এটা দ্বিতীয় টেস্ট প্রথম ইনিংস, আর ছ’টা উইকেটও পড়েনি। বলা উচিত হবে কি, ভবানীশঙ্কর নিউজিল্যান্ড আক্রমণকে চূর্ণ করল অভিজাত বিনয়, সুরুচি এবং সংযম সহকারে?…তার স্পর্শের নিখুঁত সূক্ষ্মতা নান্দনিক বোধকে দোলা দেয়…প্রকাশ সৌষ্ঠবে, শক্তিতে উদভাসিত এই হচ্ছে ক্রিকেট যাতে নেই কোনো লালসা, বীর্যবত্তা কিন্তু নেই কোনো বীভৎসতা, সুযোগ গ্রহণ-কিন্তু নেই কোনো নীচতা, সম্মুখ-সংগ্রাম কিন্তু নেই কোনো চোরাগোপ্তা, চোখ-ধাঁধানো আলংকারিক ক্রিকেট। আর একটি কথাও প্যারাগ্রাফের শেষে ছিল- সব কিছুই হল নিবে আসার প্রহরে।
প্রথম দিনে ভবানীকে নেবার কোনো প্রশ্নই ওঠে না, উঠবে বা হয়তো উঠেছে, রামিন্দারের জন্য তার ব্যর্থতাকে ঘিরে। যদি কার্ডাসকে নকল করতে হয় তাহলে রামিন্দারই ভালো বিষয়।
”হ্যালো বিসওয়াস সাব, একা একা?”
সরোজ ঘুরে গিয়ে দেখল কামদার। মোটা কাচের ওধারে বড় দুটো মণি, কলপ ফিকে হয়ে পিঙ্গল একরাশ চুল, গরমকোটের কলারের ভাঁজ ফাটা এবং জুতোর চামড়ায় অজস্র বলিরেখা-সব কিছুই কামদারের অবস্থার সঙ্গে মানিয়ে।
”কী লিখবে ভাবছ?”
”হ্যাঁ।”
”স্যান্ডার্সনের লাইন অফ অ্যাটাক একদমই ভুল ছিল। আমি হলে লেগ স্টাম্পে পিচ করাতাম, ফার্স্ট ওভারেই তুলে নিতাম ছোকরাকে ব্যাকোয়ার্ড শর্ট লেগে। তুমি তো ইডেনে আমার বল দেখেছ, পারতাম না? কী হে বলো না?”
হেলাফেলা ভঙ্গিতে কামদার বলল কিন্তু তাকিয়ে রইল উৎকণ্ঠিত চোখে। সরোজ দুঃখ পাচ্ছে বৃদ্ধের জন্য। দু’দিক থেকে ভালো কাট করাত, কিছু নামী ব্যাটসম্যান ওর ঝুলিতে আছে। কিন্তু সেই গল্প প্রতিবার তাকে শুনতে হয়েছে, অন্যদেরও একই অভিজ্ঞতা।
”ঘোষাল তো তোমার ছেলে, বলে দিয়ো পা বাড়িয়ে যেন স্যান্ডার্সনকে খেলে।”
”বলব। আর রামিন্দারকে কী বলব?”
কামদার প্রথমে বুঝতে সময় নিল সেকেন্ড দশেক তারপর দৃঢ়ভাবে মাথা নেড়ে বলল, ”ভুল করবে, ওকে বাদ দিলে ভুল করবে। বর্ন ফাইটার, দেখবে ও ঠিক ফিরে আসবে। ভারতে এখন ওর থেকে টেকনিক্যালি পারফেক্ট ব্যাটসম্যান কেউ নেই। তোমার ঘোষাল ইনস্টিংটিভ, ভালো উইকেটে ভালো, ব্যাটে বলে হয়ে গেলে ভালো, রিল্যাক্সড সিচুয়েশনে ভালো।”
সরোজের হাতে খাবারের বাক্স। দুটো পুরি খেয়েছে আর খাবার ইচ্ছে নেই। বাক্সটা ফেলার জন্য এধার-ওধার তাকাতেই দেখল তরুণ আসছে। কামদারের হাত থেকে উদ্ধার পাবার জন্য সে চেঁচিয়ে বলল, ”স্টোরি পাঠালে?”
”ক্যালকাটা লাইনে কী গড়বড় হয়েছে এখন বন্ধ, একটার আগে ঠিক হবে না। শঙ্কর কোথায়?”
